রেজাউল করিম হীরা:
টানা চতুর্থবারের মতো দল ক্ষমতায়। আছে বাবা, ভাই, চাচার ক্ষমতার প্রভাব। সেই সুবাদে প্রশাসনেও রয়েছে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। নেতাকর্মীরাও আছে পকেটে। এমন সুযোগ হারাতে চান না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরা। ফলে দলের নির্দেশনা উপেক্ষা করে উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তারা। এ অবস্থায় দলীয় নির্দেশ অমান্যকারীদের বহিষ্কার করা হতে পারে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব থাকে। প্রশাসনেও তারা সেই প্রভাব বিস্তার করেন। সেই সুযোগে অনেক মন্ত্রী-এমপি তাদের আত্মীয়-স্বজন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সেই তালিকায় সন্তান, আপন ভাই, চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, খালাতো ভাই, চাচা, শ্যালকসহ নানা ধরনের আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। চার দফা উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে মন্ত্রী-এমপিদের ১৩ স্বজন নির্বাচন করছেন।
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখতে আওয়ামী লীগ প্রধান এই নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপির স্বজনদের প্রার্থী না হওয়ার নির্দেশ দেন। তার এই নির্দেশনার চিঠি সংশ্লিষ্ট এমপিদের কাছে পাঠিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পরও উপজেলা নির্বাচনের মাঠ থেকে সরতে রাজি নন স্থানীয় মন্ত্রী-এমপির স্বজনরা। নানা কৌশলে ভোটের মাঠে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। সংশ্লিষ্ট এমপি-মন্ত্রীরাও তাদের পক্ষে সামনে আনছেন নানা ‘যুক্তি ও অজুহাত’। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এবারের উপজেলা নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। মন্ত্রী-এমপিদের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অনেকটা অসহায়। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আগামী ২৫ এপ্রিল বৈঠকে বসবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নির্বাচন থেকে স্বজনদের সরিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কয়েকজন এমপি বলেছেন, দলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে নির্বাচনের শুরুতে দলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলে স্বজনদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব হতো। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চার দিন আগে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর ফলে প্রার্থীরা সরে যাওয়ার সময় পাননি। কেননা তারা এর আগেই নির্বাচনের সব প্রস্তুতিসম্পন্ন করে ফেলেছেন। এ ছাড়া নিকটাত্মীয় বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।
আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘনিষ্ঠ স্বজনরা ভোট করছেন এমন সংসদ সদস্যদের সবাইকে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে একাধিকবার ফোন করে স্বজনদের বসিয়ে দিতে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা গড়িমসি করছেন। নানা অজুহাত ও সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করা ছাড়া তাদের হাতে কোনো বিকল্প নেই। আগামী ৩০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের বৈঠক রয়েছে। ওই বৈঠকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার হাতে মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের স্বজনদের তালিকা তুলে দেওয়া হবে। তখন হয়তো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। কেননা বিগত সময়ের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাবের কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তারই অংশ হিসেবে উপজেলা নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজনের অংশগ্রহণ না করতে বা অংশগ্রহণের প্রক্রিয়ায় থাকলে সেখান থেকে সরে দাঁড়াতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও নির্দেশনা মানা হলেও অনেক জায়গায় অমান্য করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কৌশলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, নিজের কাছের অনুসারীদের এবারের নির্বাচনে এমপিরাই প্রার্থী করেছেন।
জানতে চাইলে দলের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেন, দলের নির্দেশনা থাকার পরও দলের সংশ্লিষ্ট এমপিদের কেউই কথা রাখেননি।
রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, আগামী ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাজহারুল ইসলাম সুজন এমপির দুই চাচা মোহাম্মদ আলী ও সফিকুল ইসলাম এবং ভাতিজা আলী আফসার রানা, নীলফামারীর ডিমলায় আফতাব উদ্দিন সরকার এমপির চাচাতো ভাই আনোয়ারুল হক সরকার ও ভাতিজা ফেরদৌস পারভেজ, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে সাহাদারা মান্নান এমপির ছেলে সাখাওয়াত হোসেন সজল, সোনাতলায় এমপির ভাই মিনহাদুজ্জামান লিটন, পাবনার বেড়ায় ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর ভাই আবদুল বাতেন, ভাতিজা আবুল কালাম সবুজ, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় আলী আজগর টগর এমপির ভাই আলী মুনসুর বাবু, পিরোজপুরের নাজিরপুরে অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম এমপির ভাই এসএম নূর ই আলম সিদ্দিকী, কুষ্টিয়া সদরে মাহবুবউল-আলম হানিফ এমপির চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতা, মাদারীপুর সদরে শাজাহান খান এমপির ছেলে আসিবুর রহমান খান, ভাই পাভেলুর রহমান শফিক খান, নরসিংদীর পলাশে ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ এমপির শ্যালক শরীফুল হক, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপির খালাতো ভাই হারুনার রশীদ হিরা, মামাতো ভাই খন্দকার মঞ্জুরুল ইসলাম তপন, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় শাহাব উদ্দিন এমপির ভাগনে সোয়েব আহমদ, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একরামুল করিম চৌধুরী এমপির ছেলে আতাহার ইশরাক সাবাব চৌধুরী, হাতিয়ায় মোহাম্মদ আলী এমপির ছেলে আশিক আলী এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে আশেক উল্লাহ রফিক এমপির ভাতিজা হাবিব উল্লাহ।
এ ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন বরিশালের বাকেরগঞ্জে মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ মল্লিক এমপির ভাই সালাম মল্লিক, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ভাতিজা আমিরুল ইসলাম ও লাকসামে তাজুল ইসলামের শ্যালক মহব্বত আলী।
চার ধাপে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে চার ধাপের তপসিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের মনোনয়ন দাখিল কার্যক্রম শেষ হয়েছে। গতকাল চতুর্থ ধাপের তপসিল ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের মনোনয়ন প্রত্যাহার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এই ধাপের ভোট হবে ৮ মে। দ্বিতীয় ধাপের মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন হলো ৩০ এপ্রিল। ভোট হবে ২১ মে। আর তৃতীয় ধাপের ভোট হবে ২৯ মে। চতুর্থ ধাপে ৫৫টি উপজেলায় ৫ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই ধাপে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ৯ মে।





