সুস্থ পৃথিবী, সুস্থ মানুষ

সুস্থ পৃথিবী, সুস্থ মানুষ

প্রতীকী ছবি

ফিচার

সুস্থ পৃথিবী, সুস্থ মানুষ

  • পারভেজ বাবুল
  • প্রকাশিত ৫ এপ্রিল, ২০১৯

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতানুসারে, বাংলাদেশের মানুষের শ্বাসযন্ত্রে সমস্যার একটি প্রধান কারণ, বাংলাদেশের শহুরে পরিবহনজনিত বায়ুদূষণ। আনুমানিক ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি ফুসফুস, শ্বাসযন্ত্র ও নিউরোলজিক্যাল অসুস্থতার জন্য প্রবল বায়ুদূষণ দায়ী। ঢাকায় হাজার হাজার মানুষ বায়ুদূষণের কারণে অকালে মারা যাচ্ছে। তা ছাড়া বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ অকারণে মারা যাচ্ছে এবং বায়ুদূষণের কারণে অসহায়ভাবে বসবাস করছে, যা প্রতিরোধযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সুতরাং আমাদের নিজেদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জীবন বাঁচাতে বায়ুদূষণ রোধে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। জাতিসংঘ স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বায়ুদূষণকারীদের হ্রাস করে সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশের দিকে জোর দিচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক ‘ষষ্ঠ গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক-২০১৯’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম নগরীকরণের দেশগুলোর মধ্যে একটি। এবং দেশটির রাজধানী ঢাকার বায়ু সবচেয়ে দূষিত হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনটি চিহ্নিত করেছে বায়ুদূষণের কারণে বছরে ছয় থেকে সাত মিলিয়ন মানুষের দ্রুত মৃত্যু ঘটছে। পরিবেশ অধিবেশনে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক ‘ষষ্ঠ গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক-২০১৯’ স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্যান্য পরিবেশবিষয়ক লক্ষ্য, যেমন প্যারিস চুক্তির কারণে পরিবেশগত সমস্যাগুলো মোকাবেলার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণ পরিবেশগত রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রধান নিয়ামক, যার ফলে ছয় মিলিয়ন থেকে সাত মিলিয়ন মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে এবং বছরে প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। বায়ুদূষণে বিশ্বব্যাপী অপরিমেয় ক্ষতি হচ্ছে। সূক্ষ্ম বস্তুকণা, দ্রুত নগরায়ণ প্রবণতাসহ বেশকিছু কারণে বায়ু দূষিত হচ্ছে। প্রায় তিন বিলিয়ন মানুষ যারা কাঠ, কয়লা, ফসলের অবশিষ্টাংশ, গোবর এবং কেরোসিন দিয়ে রান্না করে, তাদের জন্য দূষণের প্রভাব সর্বোচ্চ। বয়স্ক, অসুস্থ ও দরিদ্রদের জন্য বায়ুদূষণের প্রভাব বেশি সংবেদনশীল। ষষ্ঠ গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক ‘সুস্থ পৃথিবী, সুস্থ মানুষ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পরিবেশগত নীতিমালা প্রণয়ন, সমাজের সবাইকে স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ এবং বহুপক্ষীয় পরিবেশগত চুক্তিগুলোর বিষয়ে নজর দেয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিবেচনা অপরিহার্য। একটি সুস্থ পরিবেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুস্থতার সর্বোত্তম ভিত্তি। পরিবেশগত অবনতি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এমন তথ্য প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সুতরাং আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা আঞ্চলিক পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ার  সুপারিশ করছে। আসলে সহযোগিতা ও পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে আমাদের স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রদর্শন করতে সক্ষম হতে হবে যে, বায়ুদূষণ প্রতিরোধ প্রকল্পগুলো সফল হচ্ছে কি-না, নাকি এতে কিছু কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা, প্রায় তিন বিলিয়ন মানুষ খোলা আগুন বা ঐতিহ্যগত চুলাগুলোয় কঠিন জ্বালানি (যেমন কাঠ, কয়লা, গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ) ব্যবহার করে রান্না করে। এগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বায়ুদূষণ করে। এ থেকে উৎপাদিত ধোঁয়ায় রয়েছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর দূষণকারী সূক্ষ্ম কণা এবং কার্বন মনোক্সাইড। এর ক্ষতিকর প্রভাব নারী ও শিশুদের মধ্যে প্রবল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, উন্নয়নশীল দেশে বছরে ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ ঘরের বায়ুদূষণের প্রাদুর্ভাব থেকে মারা যায়। বিশ্বব্যাপী কঠিন জ্বালানির ওপর নির্ভরতা জনস্বাস্থ্যের দশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকির মধ্যে একটি। অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ ঘনঘন নারী ও শিশুদের প্রভাবিত করে।

যাহোক, বিশ্বব্যাপী এটি স্বীকৃত যে, বিশেষত অনাবাসিক বায়ুদূষণের কারণে নারীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। বায়ুদূষণের কারণে নারীদের দুর্বলতার বিষয়ে আইসিআইএমডি-নেপালের জেন্ডার অ্যান্ড এনার্জি বিশ্লেষক অনাতা কার্কি বলেন, ‘সমাজের দরিদ্রতার কারণে পরিবারের রান্নার জন্য কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। নির্মল বায়ু ও উন্নত স্বাস্থ্যের জন্য রান্নার উন্নত চুলাগুলোর উপকারিতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্র পরিবারগুলো রান্নার চুলা উন্নত করতে পারছে না এবং এ বিষয়ে পরিবারে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি নারী মানবাধিকার বিষয়ও বটে।’

বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা এবং বায়ুর মান উন্নতিকরণে গণমাধ্যম ও জনগণের অংশগ্রহণ সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের যৌথভাবে কাজ করা উচিত এবং জনগণের উচিত বায়ুর মান উন্নয়নে ও দূষণ হ্রাসকরণে সম্পৃক্ত থাকা। সময়সীমা অনুযায়ী পরিকল্পনা ও প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সহনশীলভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। কৃষিজ বর্জ্য, নির্মাণ বর্জ্য ও যানবাহনজনিত দূষণ মোকাবেলায় ক্ষুদ্র ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ স্টেশন স্থাপন করা উচিত এবং দূষণ পরীক্ষার কার্যপ্রণালি শক্তিশালী করা আবশ্যক। বায়ুদূষণ এবং মানব প্ররোচিত জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ গৃহমধ্যস্থ ও অনাবাসিক উভয় বায়ুদূষণের প্রভাবাধীন। অনাবাসিক বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়।

যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়ায় যাতে বায়ুদূষণ না ঘটে, তার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থাকা আবশ্যক। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা, শিল্প এলাকায় গাছপালা লাগানো এবং শোধনাগারের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার করা আবশ্যক। শিল্প এবং আবাসিক এলাকার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। কারখানায় ব্যবহূত চিমনি আকারে লম্বা হতে হবে, যাতে নির্গত ধোঁয়া পরিবেশে মিশতে না পারে। কারখানায় ফিল্টার এবং অধঃক্ষেপ্ত চিমনি ব্যবহার করা আবশ্যক। অতএব আইসিআইএমডিডির মতে, জনসাধারণ, নীতিনির্ধারক, গবেষক, পরিবেশকর্মী এবং বিশ্বের সব মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয়, জীবন সংরক্ষণের তথ্য প্রচারের মাধ্যমে বায়ুদূষণ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রণ, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের স্বাস্থ্যকর এবং উন্নত জীবনযাপন করতে বায়ুদূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

 

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

অনুবাদ : মোহাম্মদ অংকন, প্রাবন্ধিক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads