সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
দেশের লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের মধ্যে একটি হচ্ছে বায়োস্কোপ। কাঠের বাক্সে করে আর্ট কাগজের মাধ্যমে লোকজীবন চিত্র প্রদর্শণ ও বিনোদনের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম এটি। ইতিহাস ঐতিহ্যের পাতায় গ্রামীণ এই বায়োস্কোপের বেশ প্রশংসা থাকলেও কালের বিবর্তনে শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকতার অভাব থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ বিনোদনের অন্যতম এই মাধ্যম।
বাংলাদেশ লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতি বছর মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব করে থাকে লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্যকে পুণরুদ্ধার, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শণের জন্য। কিন্তু পৃষ্ঠপোশকতার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে লোকজ ঐতিহ্য বায়োস্কোপ।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশনে গত ১৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। সেখানে গিয়ে দেখা যায় উঠতি বয়সি শিশু কিশোর কিশোরিরা দুই হাত দুই চোখের পাশে ধরে বায়োস্কোপ লেখা কাঠের বাক্সের ভেতর কি যেন দেখছে।
এক হাতে চড়কা ঘুরাচ্ছেন আর হাতে ডুগডুগি বাজিয়ে ছন্দের তালে তালে বায়োস্কোপের মালিক ভাঙা ভাঙা গলায় গাইছেন এইবারেতে দেখেন ভালো, দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ এলো, ভীষন যুদ্ধ বাইদ্ধা গেছে, দেখতে কতো বাহার আছে। শেখ মুজিবর হুঙ্কার দিছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হইছে। এইবারেতে দেখেন ভালো, শেখ হাসিনা সামনে আছে, ইন্দিরা গান্ধী পাশে আছে। কানের দুল দুলতে আছে, দেখতে কতো বাহার আছে।
ডুগডুগির তাল আর সুরের এমন শব্দে নারী পুরুষরা আকৃষ্ট হয়ে দাড়িয়ে আনন্দেই শুনতে থাকেন বায়োস্কোপের এই ছন্দ। শুধু এসবই না খুব অল্প সময়ে আমেরিকার একশ’ তলা ভবন, টুইন টাওয়ার ধ্বংস, দার্জিলিংয়ের পাহাড়, সোনারগাঁয়ের পানাম নগর, ঈসাখাঁর জমিদার বাড়ি, যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু নিয়ে চমৎকার ছন্দে তাল মেলাচ্ছেন তিনি। লোকজ উৎসবে আগত বায়োস্কোপের মালিক আঃ জলিল মন্ডলের সাথে কথা হলে তিনি জানান, তার বাড়ি রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার চাইসারা গ্রামে।
দাদার আমল থেকে ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ প্রদর্শন করছেন তারা। সমসাময়িক বিষয়াদি নিয়ে তৈরি করা হয় বায়োস্কোপ প্রদর্শণের চিত্র। বিনোদনের মাধ্যমে আয় করে প্রায় ৪০ বছর যাবত সংসার চালাচ্ছেন তিনি। স্ত্রী দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। আগে সব বয়সের মানুষ দেখতো বায়োস্কোপ। এখন আর আগের মতো দেখেনা। এখন শুধু বাচ্চারা একটু দেখে। আগের মতো চলেনা বিধায় তার চাচারা বায়োস্কোপ বন্ধ করে দিয়েছেন।
শুধুমাত্র বাপ দাদার স্মৃতির জন্যই ঐতিহ্যবাহী এই বায়োস্কোপ ধরে রেখেছেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মেলায় বায়োস্কোপ দেখান তিনি। জন প্রতি ১৫-২০ টাকা করে মেলায় সারাদিন দেখিয়ে গড় হিসেবে ৫-৬শ’ টাকা রোজগার হয়। তা থেকেই খাওয়া থাকা ইত্যাদি খরচ বহন করতে হয়। হতাশা কন্ঠে তিনি বলেন, এই লোকজ উৎসবে আমাকে ডাকা হয়না। খোঁজ খবর নিয়ে আমিই স্যারদের ফোন করি আসার জন্য। বায়োস্কোপ প্রদর্শণীর জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কোন সম্মানী দেয়া হয়না।
ঐতিহ্যবাহী এই বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর জন্য যদি লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশন পৃষ্ঠপোষকতা না করে তাহলে হয়তো আর কেউ আসবে না এই পেশায়। সাংষ্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব লেখক সাহিত্যিক ফারজানা আহসান জয়া জানান, গ্রামীণ লোকজ বিনোদনের আকর্ষণীয় মাধ্যমগুলোর মধ্যে বায়োস্কোপও একটি ঐতিহ্য। এই বায়োস্কোপের মাধ্যমেই এক সময় মানুষ বিনোদনের পাশাপাশি অনেক অজানা তথ্য জেনেছে এবং এর বেশ সুনামও রয়েছে সংষ্কৃতি অঙ্গনে। তবে অন্যান্য শিল্পের তুলনায় বায়োস্কোপটি একেবারেই বিলুপ্তির পথে। ঐতিহ্য সম্পর্কে ভালো ধারনা পেতে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক এ কে এম আজাদ সরকার জানান, বায়োস্কোপ আমাদেরই লোকজ ঐতিহ্য। এই বছর বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর জন্য শিল্পি সম্মানী দেয়া না গেলেও ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তাকে যাতায়াত বাবদ কিছু সম্মানী দেয়া হবে এবং আগামী বছর থেকে তাকে শিল্পি সম্মানী দেয়া হবে। লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য বায়োস্কোপ টিকিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।





