ফিচার

২৩তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াড

সোশ্যাল রোবটসে বাংলাদেশের সাফল্য

  • অরণ্য সৌরভ
  • প্রকাশিত ৩ জানুয়ারি, ২০২২

২৩তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতার থিম নির্ধারণ করা হয়েছিল ‘সোশ্যাল রোবটস’। এবারের আসরে চারটি স্বর্ণ, দুটি রৌপ্য, পাঁচটি ব্রোঞ্জ ও চারটি টেকনিক্যাল পদক জিতেছেন ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড দল। সেই গল্প শোনাচ্ছেন —অরণ্য সৌরভ

 

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ২৩তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতা এবার অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়, যা দক্ষিণ কোরিয়ার দ্যেগু শহর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ২০২১ সালের ১৫ থেকে ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর বিসিএস ইনোভেশন সেন্টার থেকে আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ দল। এ বছরের অলিম্পিয়াডের থিম নির্ধারিত ছিল ‘সোশ্যাল রোবটস’।

এবারের আসরে চারটি স্বর্ণ, দুটি রৌপ্য, পাঁচটি ব্রোঞ্জ ও চারটি টেকনিক্যাল পদক জিতেছে ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড দল। রোবট ইন মুভি ক্যাটাগরিতে জুনিয়র গ্রুপে রোবো স্পার্কার্স দলের মিসবাহ উদ্দিন ইনান ও জাইমা যাহিন ওয়ারা, একই ক্যাটাগরিতে চ্যালেঞ্জ গ্রুপে রোবোটাইগার্স দলের নাশীতাত যাইনাহ রহমান ও কাজী মোস্তাহিদ লাবিব এবং ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে জুনিয়র গ্রুপে রোবাস্টাস দলের যারিয়া মুসাররাত ও চ্যালেঞ্জ গ্রুপে রোবো স্কোয়াড দলের রাফিহাত সালেহ, তাফসীর তাহরীম ও মাহির তাজওয়ার চৌধুরী অর্জন করেন স্বর্ণপদক।

ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে জুনিয়র গ্রুপে আউশ দলের মাহরুজ মোহাম্মাদ আয়মান এবং ফিজিকাল কম্পিউটিং ক্যাটাগরিতে চ্যালেঞ্জ গ্রুপে উই দলের মীর উমাইমা হক ও প্রপা হালদার রৌপ্যপদক জিতেছেন।

রোবট ইন মুভি প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জপদক পেয়েছেন চ্যালেঞ্জ গ্রুপে রোবো স্কোয়াড দলের রাফিহাত সালেহ ও তাফসীর তাহরীম এবং টিম-এক্স৫৬ দলের মাহির তাজওয়ার চৌধুরী। পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে জুনিয়র গ্রুপে রোবো স্পার্কার্স দলের মিসবাহ উদ্দিন ইনান ও জাইমা যাহিন ওয়ারা এবং চ্যালেঞ্জ গ্রুপে রোবোটাইগার্স দলের নাশীতাত যাইনাহ রহমান ও কাজী মোস্তাহিদ লাবিব এবং টাইগার৭১ দলের রাগিব ইয়াসার রহমান ও আরেফিন আনোয়ার পেয়েছেন ব্রোঞ্জপদক।

রোবট ইন মুভি প্রতিযোগিতায় কারিগরি পদক অর্জন করেছে জুনিয়র গ্রুপে রোবাস্টাস দলের যারিয়া মুসাররাত এবং চ্যালেঞ্জ গ্রুপে মীর উমাইমা হক ও প্রপা হালদার। মেকারো দলের যাহরা মাহযারীন পূর্বালী ও জাইবা মাহজাবীন পেয়েছেন টেকনিকাল পদক। ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে চ্যালেঞ্জ গ্রুপে মেকারো দলের যাহরা মাহযারীন পূর্বালী ও জাইবা মাহজাবীন পেয়েছেন টেকনিকাল পদক।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের আয়োজনে এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের বাস্তবায়ন সহযোগিতায় এ বছর চতুর্থ বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড ২০২১ আয়োজন করা হয়। জাতীয় পর্বে দেশের ৬৪টি জেলা থেকে ১ হাজার ১২৪ জন শিক্ষার্থী এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় পর্বের বিজয়ীদের মধ্য থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে আন্তর্জাতিক রোবট দল নির্বাচনী ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। এ ক্যাম্পে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ দল নির্বাচন করা হয়।

 

 

নানুকে দেখে এই রোবটের ধারণা এসেছিল

আমি মিমো নামে একটি সামাজিক রোবট তৈরি করেছি, যা কোভিড পরিস্থিতিতে বৃদ্ধ ব্যক্তিদের সঙ্গী হিসেবে কাজ করবে। এই রোবটের ধারণা আমার নানু দেখে এসেছিলেন। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সময় আমার স্বর্ণপদক জেতার কোনো ভাবনা ছিল না। ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে তিনজন পর্যন্ত একসাথে দল গঠন করা যায়। কিন্তু আমার দলে আমি একা থাকায় ভয়ে ছিলাম যে, হয়তো রোবটটা পুরোপুরি শেষ করতে পারব না। যখন জানলাম স্বর্ণপদক পেয়েছি তখন বেশ অবাক হয়েছি। এই বছরের অলিম্পিয়াডে কাজ করা দুর্দান্ত এক অভিজ্ঞতা ছিল। একা কাজ করে অনেক কিছু শেখার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকেও অনেক শিখেছি। প্রতিযোগিতার সময় ভয় লাগলেও এতে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। আমি আমার মেন্টর, পিতামাতা ও বোনদের সহায়তায় এই পদক পেয়েছি।

যারিয়া মুসাররাত পারিজাত, স্বর্ণপদক, ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরি, জুনিয়র গ্রুপ

 

দেশের প্রতিনিধিত্ব করে স্বর্ণপদক জয়ে আনন্দিত

মিশাল ভাইয়া ফোনে বলেন, ‘ইনান একটা দুঃসংবাদ আছে। মন খারাপ করিও না’। হুট করে ভাইয়া বলল, ‘তুমি রোবট ইন মুভিতে গোল্ড এবং ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে ব্রোঞ্জ মেডেল পেয়েছ!’ সংবাদটা শুনে লাফিয়ে উঠলাম খুশিতে। গোল্ড মেডেল! তাও রোবট ইন মুভিতে! কারণ বাংলাদেশ এবার প্রথম রোবট ইন মুভি জুনিয়রে গোল্ড পেয়েছে। মেন্টরদের সঠিক দিকনির্দেশনা, মা-বাবার সাপোর্ট, টিমওয়ার্ক—এসবের কারণে ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল এবারের আসর। অলিম্পিয়াডের ফলাফলে আমার অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো নয়। আমি খুশি নই, মহাখুশি। এই অর্জন আমার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করবে সবসময়। দেশের প্রতিনিধিত্ব করে স্বর্ণপদক জয় করতে পেরে গর্বিত ও আনন্দিত। আমার বর্তমান ভাবাবেগ বোঝাতেই হয়তো কবি বলেছেন, ‘আজ আমার মনের মাঝে ধাই ধপাধপ তবলা বাজে।’

মিসবাহ উদ্দিন ইনান, স্বর্ণপদক জয়ী, রোবট ইন মুভি ক্যাটাগরি, জুনিয়র গ্রুপ

 

আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস লাল-সবুজ পতাকার গর্ব

আমরা তিনজন মিলে রোবো স্কোয়াড দল গঠন করি। তারপর বাস্তবতার নিরিখে আমাদের একজন সদস্যের নিকট আত্মীয়ের অটিজম সমস্যা সমাধান নিয়ে একটি রোবট তৈরির পরিকল্পনা করি। যে রোবটটি একজন অটিজম আক্রান্তকে স্বাভাবিকভাবে চলতে ও দৈনন্দিন বিশেষ কিছু কাজে সহায়তা করবে। রোবটটিতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছি যাতে বিশেষ শিশুদের পরমুখাপেক্ষী না হতে হয়। বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াডে রোবটটি উপস্থাপন করে রৌপ্যপদক অর্জন করায় আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সংযোজন করে ইন্টারন্যাশনাল রোবট অলিম্পিয়াডে ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণ করি। ফলাফলে আমরা আনন্দে আত্মহারা। আমাদের রোবটি স্বর্ণপদক অর্জন করেছে। মনে হচ্ছে আমরা যেন দেশের জন্য আরেকটি বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস লাল-সবুজ পতাকার গর্ব।

তাফসীর তাহরীম, স্বর্ণপদক জয়ী, ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরি, চ্যালেঞ্জ গ্রুপ

 

আমরা চেষ্টা করলেই সব করতে পারি

সত্যি কথা বলতে এবারের জয়ের অনুভূতিটা বিগত বছরগুলোর মতোই অতি আনন্দের ছিল। বিগত তিন বছর ধরে আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের হয়ে নানা পদক অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। কৃতজ্ঞ যে, এ বছরও তা করতে সক্ষম হয়েছি। অনেক মাস ধরে কঠোর পরিশ্রমের পর যখন এই সফলতার কথা জানতে পারি তখন বেশ আনন্দ হয়েছিল। এই ফলাফল শুনে প্রথমে বিশ্বাসী করতে পারিনি। সবার ফলাফল দেখার পর খুব অবাক হয়েছিলাম। আমাদের দেশ যে সাউথ কোরিয়া, রাশিয়া এসব উন্নত দেশের থেকেও ভালো ফলাফল করতে পেরেছে সেটা দেখে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করলেই সব করতে পারি। আমাদের দেশকে এভাবে আমরা গর্বিত করতে পারছি দেখে আমার খুব আনন্দ লাগছে।

কাজী মোস্তাহিদ লাবিব, স্বর্ণপদক জয়ী, রোবট ইন মুভি ক্যাটাগরি, চ্যালেঞ্জ গ্রুপ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads