খুব বড় স্বপ্ন নিয়ে বড় হইনি, আবার খুব ছোট স্বপ্নও ছিল না। একটা গ্রাম্য ছেলের স্বপ্ন যেমন থাকে, তেমন। শৈশবে উপজেলা শহরে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। অনেক দিন প্রতীক্ষা করতাম; কিন্তু কোনোদিনই যাওয়া হতো না। একবার এলো সার্কাস উপজেলা শহরে। ‘দ্য লায়ন’ সার্কাস। গ্রামকে গ্রাম হুমড়ি খেয়ে সার্কাসে চলতে লাগল। আমরা যেহেতু সার্কাস সম্পর্কে জানি না, এক বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, সার্কাস কী ভাই? তিনি বললেন, ‘ঝাকানাকা ড্যান্স, জাদু, হাতি-ঘোড়া, পুতুল নাচ।’ তখনো ড্যান্স কি জানি না। জানি না বলতে সত্যিই জানি না। জানব কী করে? খাঁটি গ্রাম তখন। টেলিভিশন নেই, পেপার-পত্রিকা নেই। মোবাইল-টেলিফোন নেই। আব্বার পকেট থেকে পাঁচ টাকা চুরি করে সার্কাসে গেলাম। বুক দুরুদুরু। আজ বড় শাস্তি হবে। আবার কৌতূহলও। এতকিছু, সার্কাস! বাপরে বাপ! কিন্তু সার্কাস দেখা হলো না। আগের দিন রাতে ঝামেলা হয়ে সার্কাস ভেঙে গেছে। কী ঝামেলা সেইটা জানার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছি সেই বড় ভাইয়ের সাথে। কিন্তু সব গল্পের মতো যে যেমন পারছে, একটা কাহিনী বানাচ্ছে। তারপর একান থেকে ওকান। অনেক গল্প তৈরি হয়েছে সার্কাস ভাঙা নিয়ে। বাড়ি ফিরলাম। আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কই গেছিস? বাউদিয়া হয়া যাচ্ছিত। কার সাথে ঘুরিস।’ বললাম, ‘ছক্কু ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি জোর করে নিয়ে গেল। আব্বার এবার মেজাজ একটু ফেরত এলো। আম্মা জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাওয়াইছে?’ বললাম, ‘ডিগির মাছ, কালাকচু আর সিঁদল ভরতা।’ বাড়িতে এবারের মতো রক্ষে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সার্কাস দেখার তুমুল ইচ্ছে। এরপর অনেকদিন গেছে। কাউরে বলতে পারিনি। প্রাইমারি শেষ। হাইস্কুলে ভর্তি হলাম। তিন মাস পর প্রথম সাময়িক। প্রায় ৭/৮টা প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। পরীক্ষায় পাস করলাম তিনজন। আমি তৃতীয়। তারপর স্যারদের সাথে বেশ ভাব হলো। একদিন বিএসসি স্যারের কাছে গেছি, একটা কি যেন দরকারে। স্যার ইসলামের স্যাররে বলছেন, ‘কি যে সার্কাস শুরু হলো। হাস্যকর।’ তুমুল কৌতূহল থাকা সত্ত্বেও স্যাররে বলতে পারলাম না, স্যার আমার সার্কাস দেখার খুবই ইচ্ছে। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে বারবার মনে হলো, এ সার্কাস আবার কেমন, হাস্যকর! মিলছে না। ছক্কু ভাইয়ের সেই সার্কাস? বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হরেক রকম কাহিনী জন্মের সেই সার্কাস। মিল কই। সেই মিল পাইনি। পাওয়ার কথাও না।
বহুদিন পর আজ টিএসসিতে বসে আছি। একটা ক্যাম্পাস রেখে এসেছি। টিএসসিতে বসেছি মূলত মাসির কাছে মায়ের আদর পূরণের বাসনায়। আড্ডা দিচ্ছি। গুড়ের মালাই চায়ের অর্ডার দিলাম। লোকজন অন্য সময়ের মতো নেই। ক্যাম্পাস বন্ধ। তার ওপর শীতকাল। আর নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তুমুল উত্তেজনা। এক রিকশাওয়ালা, আর এক রিকশাওয়ালারে ‘হলিউড’ (সিগারেট) ফুঁকতে ফুঁকতে বলছেন, ‘কী যে সার্কাস শুরু হলো।’ এবার, এতদিন পরে এসে এই সার্কাসের মর্ম বুঝতে পারছি। কী পরিমাণ সার্কাসের আয়োজন হলে, ভাঁড়ে ভর্তি হয়ে গেলে, একজন রিকশাওয়ালাও সার্কাস বোঝে, ভাবেন! এখানে রিকশাওয়ালারে ছোট বা হেয় করার জন্য নয়। বরং বলছি, তারা ব্রাত্য, তাদের স্বপ্ন কম। অল্পেতে খুশি। দেশ, সমাজ, সভ্যতা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা কমই থাকে।
যাহোক বাজে কথায় চলে গেছিলাম, আসল কথা হলো খুব বড় স্বপ্ন নিয়ে বড় হইনি আবার খুব ছোট স্বপ্নও ছিল না। একটা কথা অনেকজনের কাছে শুনলে, প্রথমে তার ওপর সংশয়সহকারে ঈমান আনি। তারপর যাচাইবাছাই করি। সোর্স বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বইপত্র। অত্যন্ত দুর্লভ হলে, সেই বিষয়ের পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞের কাছে। কিন্তু আজকাল তেমন একটা বিশেষজ্ঞও নেই আর অই ধরনের বইপত্র হাতে-গোনা দু-একটা দোকানে পাওয়া যায়। কাজেই একটু অসুবিধে হয়। অনেক দিন ধরে শুনছি, মানুষ আসলে কেমন আছে, বুঝতে পারছে না। একা হয়ে যাচ্ছে নাকি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে—বুঝতে পারছে না। চুরি হচ্ছে। ডাকাতি হচ্ছে। শুনছি, মানুষ মরছে বিভিন্ন জায়গায়— সড়কে, বেডরুমে। নারীদের নাকি নিরাপত্তা নেই। ব্যাংকের টাকা নাকি ছয়নয় হচ্ছে। বিদেশে নাকি কেউ কেউ বাড়ি গড়ছেন। কারো কারো নাকি টাকার পাহাড় আছে। সত্যি কথা বলতে কি এসব বিষয়ের ওপর এখনো সংশয়সহও ঈমান আনতে পারি নাই। সোর্স নেই। বইপত্র নেই।
ছফার মতো একজনও নেই। যিনি বলবেন, সমস্যা এই, করতে হবে এই। কেউ নেই। সবাই সমস্যা দেখাচ্ছেন। আর যে দু-একজন সমাধানের কথা বলছেন, তা এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তুমুল গোলাগুলি চলছে তখন আপনি যদি গর্তের ভেতর না লুকিয়ে চিৎকার করেন, এই গোলাগুলির ইন্ধনদাতা কে, তদন্ত করো, কারা অস্ত্র পাঠাল, কারা অর্থ সহায়তা দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি তখন আপনাকে গুলি খেয়ে মরতে হবে। অতএব সময় পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী একটা সমাধান দরকার। আমরা সেই সমাধান জানি না, যারা জানেন, দয়া করে বলুন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমারও, আপনারও।
আবারো বাজে কথায় চলে গেছিলাম, আসল কথা হলো খুব বড় স্বপ্ন নিয়ে বড় হইনি আবার খুব ছোট স্বপ্নও ছিল না। স্বপ্ন হলো, দেশটা এমনভাবে দাঁড়াক; যে দাঁড়ানো পারফেক্ট দাঁড়ানো। ভঙ্গিটা কোনো দলের নয়, সম্প্রদায়ের নয়, কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশার নয়। সবার। আমারও, আপনারও।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক





