সিনেমা কিংবা বাস্তবে অনেক আশ্চর্য ঘটনা দেখা যায়। অনেক সময় সিনেমা কিংবা নাটকে দেখা যায় প্রিয়জনের জন্য নিজের কিডনি দান করার ঘটনা। যা ভালবাসার কারণে করা হয়ে থাকে। কারণ ভালোবাসা অমর। সিনেমা নয় বাস্তবে প্রমাণ করা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় এক গৃহবধু তার স্বামীকে কিডনি দিয়ে। মৃত্যুপথ যাত্রী প্রবাসী স্বামী ইসমাইল হোসেনকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দিয়ে জীবন বাঁচালেন সাইমা আক্তার। হাসপাতালের বিছানায় এভাবেই স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করলেন দুই সন্তানের এই জননী। বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচব, মরলে একসঙ্গে মরবো, এমন প্রত্যয়ে স্বামীকে একটি কিডনি দেন স্ত্রী সাইমা আক্তার।
বিয়ের পর স্বামীকে ভালোবেসে কথা দিয়েছিলেন বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচব, মরলে একসঙ্গে মরব। তার প্রমাণ দিয়েছেন গৃহবধু সাইমা আক্তার তার মৃত্যুপথ যাত্রী স্বামীকে একটি কিডনি দিয়ে। বর্তমানে তারা দুজনেই ঢাকার শ্যামলীতে সিকেডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তারা দুজনই ভালো আছেন। বুধবার রাতে ওই হাসপাতালে তাদের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এতে প্রায় ৬ ঘন্টা সময় লাগে। ইসমাইল হোসেন উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুর গ্রামের মো.ধন মিয়ার ছেলে।
জানা গেছে, আজ থেকে ১২ বছর আগে ইসমাইল হোসেন পৌর শহরের দুর্গাপুর এলাকার মৃত জমিরউদ্দিনের মেয়ে সাইমা আক্তারের সাথে পারিবারিক ভাবে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগ থেকেই ইসমাইল প্রবাসে ছিলেন। প্রবাস থেকে এসে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হয় । গত ৩ বছর ধরে ইসমাইল শারীরিকভাবে অসুস্থ। চিকিৎসা সেবা নেওয়ায় কিছু সময় ভালো থাকলেও প্রায় সময় প্রবাসে (সৌদি আরবে) অসুস্থ থাকেন। এক পর্যায়ে তার কিডনি সমস্যা ধরা পরে। সেখানে থেকে গত ৩ মাস পূর্বে চিকিৎসার জন্য তিনি দেশে আসেন।
এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার শ্যামলীতে সিকেডি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখানে ডাক্তার বিভিন্ন রকমের পরীক্ষানিরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক জানান, তাঁর দুটি কিডনি বিকল হয়ে গেছে। রোগীকে বাঁচাতে হলে দ্রুত তার কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে।
কিন্তু কিডনি কিনে প্রতিস্থাপন করা তাদের পক্ষে খুবই কঠিন হওয়ায় এতে হতাশায় পড়ে পরিবারটি। এদিকে স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রী কিডনি দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে স্বামী ইসমাইলের সঙ্গে তার স্ত্রীর কিডনি মিলে যায়। ভালোবাসার এই মানুষটিকে বাঁচাতে তিনি মানষিক ভাবে প্রস্তুত হন। বুধবার রাজধানীর শ্যামলী ৩ নং সড়কের সিকেডি কিডনি হাসপাতালে তাদের অস্ত্রোপচার করা হয়। ওই দিন বিকাল ৪ টার দিকে তাদের অস্ত্রোপচার শুরু হয়। প্রায় ৬ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে স্বামী ও স্ত্রী দুইজনই সুস্থ আছেন।
সাইমা আক্তার বলেন আমার স্বামী যদি কিডনির কারণে মারা যায়, তাহলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? স্বামী তো আমার সব কিছু, আশা ভরসা। তাই স্বামীকে কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানায়। দুইজন একটি করে কিডনিতে, যতদিন আল্লাহ বাঁচায় রাখেন, ততদিন বেঁচে থাকব। তিনি আরও বলেন, পরিবারিক ভাবে তাদের বিয়ে হয়েছে। এরপর থেকেই স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমাদের ভালোবাসা আর দুটি সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে আমি স্বামীকে কিডনি দিয়েছি। আমার স্বামী কখনো বলেনি তাঁকে কিডনি দিতে । আমি নিজের ইচ্ছায় দিয়েছি। স্বামীকে নিজের কিডনি দিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে বলে জানায়। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমরা যেন সুস্থ থাকি ভালো থাকি।
ইসমাইলের বড় ভাই এর স্ত্রী রোহেলা বেগম বলেন, আমার ভাইকে তার স্ত্রী কিডনি দিয়ে নতুন জীবন দান করেছে। আমরা তার কাছে চির কৃতজ্ঞ। স্বামীর প্রতি স্ত্রী’র এতো ভালোবাসা রয়েছে তা বাস্তবে দেখলাম। বর্তমানে দুজন ভালো আছে বলে জানায়।
সাইমা আক্তারে মা আছিয়া বেগম বলেন, জামাইকে বাঁচাতে আমার মেয়ে সাইমা কিডনি দিতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এই কাজটি করাতে খুব ভালো লাগছে। এ রকম বিপদে সময় আমার মেয়ের মতো প্রত্যেক স্ত্রী তাঁর স্বামীর পাশে থাকা উচিত।
উপজেলা মোগড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মতিন বলেন, আসলে এটি একটি বিরল ঘটনা। এ রকম স্বামীভক্ত নারী সহসায় দেখা যায় না। দোয়া করি, আল্লাহ তাঁদের উভয়কে সুস্থতা দান করুন। স্ত্রীর কিডনি দিয়ে স্বামীর প্রাণ বাঁচানোয় এলাকায় ওই গৃহবধূর প্রশংসা করে আলোচনা করছেন।





