স্বামীর লাশের পাশে রুদ্ধশ্বাস ১২ ঘণ্টা

সংগৃহীত ছবি

অপরাধ

স্বামীর লাশের পাশে রুদ্ধশ্বাস ১২ ঘণ্টা

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ২ জুন, ২০২১

নির্মম নৃশংসভাবে হত্যার পর স্বামীর লাশের পাশে বসে কাটিয়ে দেন ১২ ঘণ্টা। এরপর ঠাণ্ডা মাথার খুনিদের মতো স্বামীর টুকরো টুকরো করা লাশগুলো শপিং ব্যাগে মুড়িয়ে ফেলে দেন তিন থানার বিভিন্ন স্থানে। পুলিশ যেন টুকরো টুকরো করা লাশের পরিচয় না পায় এ কারণে পেশাদার খুনিদের মতোই তিনি ছড়িয়ে দেন। শ্বাসরুদ্ধকর ও লোহমর্ষক এ ঘটনার বর্ণনা দেন গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম -কমিশনার হারুনুর রশিদ। 

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১ টায় ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে নিহত নাম ময়না মিয়ার স্ত্রী ফাতেমাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, প্রথম স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও মর্যাদা না পাওয়া ও দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে স্বামীকে হত্যার পর ছয় টুকরো করে ফাতেমা। রাজধানীর তেজগাঁও, বনানী ও শিল্পাঞ্চল থানায় ময়নার দেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার হলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। নৃশংস এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ফাতেমাকে।

গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ জানান, ময়না মিয়া পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। পারিবারিক কলহের কারণেই ঘটে লোহমর্ষক ওই হত্যাকাণ্ড। তদন্তে নেমে ডিবি নিহতের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। নিহত অটোরিকশাচালক ময়না মিয়া দুটি বিয়ে করেছিলেন। ময়না মিয়ার সঙ্গে ফাতেমার মনোমালিন্যের কারণে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। তাই ময়না মিয়া বেশিরভাগ সময় দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছেই থাকতেন। কিন্তু বিভিন্ন সময় প্রথম স্ত্রী ফাতেমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। এমনকি ফাতেমার আয়ের টাকাও নিয়ে যেতেন। সেই টাকা দিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীসহ অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি আনন্দ ফুর্তি করতেন। এ কারণেই ময়না মিয়াকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন ফাতেমা।

এদিকে ময়না মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী কয়েকদিন ধরে স্বামীকে না পেয়ে অভিযোগ করেন গুলশান থানায়। অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে বনানী থানার ৪ নম্বর রোডের একটি অফিস থেকে ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করে। এরপরই বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের রহস্য। আর হত্যার পর লাশের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলার বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশের এ কর্মকর্তার বিবরণে উঠে আসে।

যেভাবে হত্যা করা হয় ময়না মিয়াকে : পারিবারিক কলহ এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব এই হত্যার কারণ বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। গত মে মাসের ২০ তারিখ থেকে ফাতেমা খাতুন স্বামী ময়না মিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। ২৩ মে প্রথম বার ময়না মিয়াকে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন ফাতেমা। এরপর গত শুক্রবার রাতে ময়না মিয়াকে জুসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেন। ঘুমের ওষুধের প্রভাবে সারাদিন-সারারাত অচেতন থাকেন ময়না মিয়া। পরদিন শনিবার বিকালের দিকে তার ঘুম ভাঙ্গে। এ সময় তিনি স্ত্রীকে গালাগালি এবং মারতে উদ্যত হন। কিন্তু ওষুধের প্রভাবে বিছানায় ঢলে পড়ে যান ময়না মিয়া। এসময় তিনি পানি পানি করে আর্তনাদ করলে স্ত্রী ফাতেমা আবারো পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে ফেলেন ময়না মিয়াকে।

শনিবার ময়না মিয়া অচেতন হয়ে গেলে ওড়না দিয়ে প্রথমে তার দুই হাত শরীরে সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর মুখে স্কচটেপ পেঁচিয়ে ফেলেন ফাতেমা। তারপর ময়না মিয়ার বুকের ওপর উঠে ধারালো চাকু দিয়ে তার গলা কেটে ফেলেন। এ সময় ধস্তাধস্তি হয়। ফাতেমার হাতে খামচি ও কামড় দেন ময়না মিয়া। ধস্তাধস্তিতে খাট থেকে দুজনেই নিচে পড়ে যান। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যান ফাতেমা। চাকু দিয়ে তিনি শরীর থেকে ময়না মিয়ার মাথা আলাদা করে ফেলেন।

যেভাবে টুকরো টুকরো করা হয় ময়নার লাশ : রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা ময়না মিয়াকে হত্যার পর সারা রাত কেটে যায় স্ত্রী ফাতেমার। পরের দিন রবিবার অফিসে না গিয়ে বাসায় বসে স্বামীর দেহের বিভিন্ন অংশ একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় কেটে আলাদা করেন। প্রথমে দুই হাত কাটেন চাকু দিয়ে। পরে হাড় কাটার জন্য ব্যবহার করেন ধারালো দা। এভাবে শরীরকে ছয় টুকরো করা হয়। এই ছয় টুকরোকে আবার তিন ভাগে ভাগ করে আলাদা ব্যাগে ভরা হয়। এর মধ্যে একটি লাল রঙের শপিং ব্যাগে মাথা, একটি নীল ড্রামে শরীর মূল অংশ এবং হাত-পাগুলোকে একটি বড় কাপড়ের ব্যাগে ঢুকানো হয়। এভাবেই আলাদা আলাদা সময়ে সেগুলোকে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন ফাতেমা। শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টা স্বামীর লাশের সঙ্গেই ছিলেন তিনি। ব্যাগে ভরার জন্য দেহ থেকে বিভিন্ন অংশ ধারালো দিয়ে কুপিয়ে ঠিকমতো ব্যাগে ভরেন তিনি।

যেভাবে ফেলা হয় লাশের টুকরোগুলো : হত্যার পর দেহের মূল অংশ ফেলা হয় গুলশান থানার আমতলা এলাকায়, হাত-পা ফেলা হয় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এবং সর্বশেষ লালব্যাগে করে মাথাটি ফেলা হয় বনানী লেকে। লাশগুলো ছড়িয়ে ফেলার কারণ হিসেবে ফাতেমা গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন, এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাশ ফেললে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, শনাক্ত করাও সম্ভব হবে না। চিরতরে গুম হয়ে যাবেন ময়না মিয়া। একসঙ্গে তিন ব্যাগ না নিতে পারায় এক এক করে দেহের বিভিন্ন অংশ ফেলে দেন বলেও জানান ফাতেমা।  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads