স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চিকিৎসক নার্স মশকনিধন কর্মী

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চিকিৎসক নার্স মশকনিধন কর্মী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৯ অগাস্ট, ২০১৯

মশকনিধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অন্যতম দায়িত্বটি হলো ওষুধ ছিটানো। কীটনাশক দেওয়া থেকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে কাজ করেন মশকনিধন কর্মীরা। আর মশার কামড়ে ডেঙ্গুসহ নানা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে সরাসরি সংস্পর্শে আসেন ডাক্তার, নার্সসহ হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা। এসব পেশাজীবী মশকনিধন ও আক্রান্তদের চিকিৎসায় ব্যস্ত সময় পার করলেও সারা বছর খোদ নিজেরাই থাকেন ঝুঁকিতে।

জানা গেছে, ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনে প্রেষণে কাজ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মশক নিবারণ অধিদপ্তর থেকে আসা মশকনিধন কর্মীরা। তবে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মশকনিধন কর্মী রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরও (ডিএসসিসি)।

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা উত্তরে মোট মশকনিধন কর্মী আছেন ৯১৩ জন। এদের মধ্যে মশক নিবারণ অধিদপ্তর থেকে কাজ করছেন ২৮০ জন। আর দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছেন ৬৩৩ জন। এই কর্মীদের দেখভালে আছেন ১৩ জন সুপারভাইজার। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে কাজ করছেন ৩৭২ জন কর্মী। তবে অ্যাডহক ভিত্তিতে আরো কয়েক শ কর্মী আছে ডিএসসিসির।

আর এসব কর্মীই আছেন স্বাস্থ্যহানি ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে। মাঠপর্যায়ে কর্মীদের কাজের ধরন দেখে জানা যায়, মশার ওষুধ ছিটানোর মেশিনে ওষুধ দেওয়ার আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ মিশিয়ে থাকেন মশকনিধন কর্মীরা। একই সঙ্গে ফগার মেশিনের জ্বালানিও ভরেন তারা। এ সময় হাতে গ্লাভস, মাথায় হেয়ার নেট পরার বিধান থাকলেও অনেক কর্মীই এসব পরেন না।

আবার বিভিন্ন মশক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাওয়ার সময় পায়ে বড় বুটজুতা পরার কথা থাকলে, সেটিও পরেন না কর্মীরা। সিটি করপোরেশন বা মন্ত্রণালয় থেকে এসব উপকরণ দেওয়া হয় না বা দেওয়া হলেও সেগুলোর নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন অনেক মশকনিধন কর্মী।

মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন মশকনিধন কর্মী এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি-সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ এবং দাবিদাওয়া সিটি করপোরেশনের কাছে দিলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ঝুঁকি আছে জেনেও একরকম বাধ্য হয়েই পেটের দায়ে কাজ করছেন তারা।

ডিএনসিসির জোন-১-এর মশকনিধন কর্মীদের সুপারভাইজার মীর নজরুল ইসলাম বলেন, বড় স্যারেরা জানেন কীভাবে মশা মারতে হবে। তবে মশা মারার কাজটা আমরা মাঠে থেকে করি। অথচ আমাদের সমস্যা দেখার যেন কেউ নেই। আমাদের উন্নত মানের গ্লাভস নেই, মাস্ক নেই, হেয়ার নেট নেই। আমরা যে ওষুধ ব্যবহার করি সেগুলোতে আমরা নিজেরাও আক্রান্ত হই। একটা গ্লাভস দেয় ওয়ান টাইম, একবার খুলে ফেললে আর ব্যবহার করা যায় না। তখন খালি হাতেই ওষুধের মিশ্রণ তৈরি করতে হয়, মেশিনে অকটেন বা পেট্রোল ভরতে হয়। এ সময় ওষুধ হাতে লাগলে হাতে ঘা হয়। কোনো কারণে মাথায় লাগলে চুল পড়ে যায়। আর যে মাস্ক আমাদের দেয় সেই মাস্কও ভালো না। ওষুধ আমাদের নাকেই ঢোকে। কোনোভাবে রোগে আক্রান্ত হলেও ছুটি পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন এই সুপারভাইজার।

তার অভিযোগ, ‘আমি নিজে আজ চার-পাঁচ দিন ধরে অসুস্থ, জ্বর। ছুটি চেয়েছিলাম পাইনি। এই জ্বরের শরীর নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় হেঁটে হেঁটে কাজ করতে হয়, অন্যের কাজ দেখতে হয়। ছুটি চাইতে গেলে স্যাররা উল্টো আরো ধমক দেন।’

অন্যদিকে রোগে আক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে কোনো রকম সাহায্য পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন এক মশকনিধন কর্মী। চাকরি হারানোর ভয়ে কর্মস্থল এবং পরিচয় গোপনের শর্তে ওই মশকনিধন কর্মী বলেন, যেনতেন করে আমরা কাজ করি। কিন্তু আমরা রোগে আক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশন থেকে কোনো সাহায্য পাই না। বিশেষ করে চিকিৎসা পাই না। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে এলেও কাজ করি তো সিটি করপোরেশনের।

তিনি বলেন, আমাদের দেখভালের দায়িত্ব করপোরেশনের। প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে ডাক্তার থাকলেও তাদের ধমকাধমকিতে ভালো করে রোগের কথা বলতেও পারি না। তাই বাইরে অন্য ডাক্তার দেখাই।

অসুস্থ হয়ে অনেক কর্মীই আগে চাকরি ছেড়ে দেন বলে জানান ওই কর্মী। তিনি বলেন, আমি কাজ করছি আজ ৯ বছর। ১৫ বছর কাজ করেই অনেকে আর কাজ করতে পারেন না। শরীর ছেড়ে (অসুস্থ হয়ে পড়ে) দেয়। আমার মতো ৯ বছরও কাজ করতে পারে না অনেকে।

মশকনিধন কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঝুঁকি মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শরীফ আহমেদ।

তবে ঝুঁকি মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোমিনুর রহমান মামুন।

তিনি বলেন, মশকনিধন কর্মীদের এই ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের কিছু প্রস্তাবনা আছে। তাদের খাবারের ব্যাপারে, ঝুঁকি ভাতার ব্যাপারে। মেয়র মহোদয়েরও নির্দেশ আছে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করার। তবে কর্মীরা যখন কাজ করেন তখন কিছুটা ঝুঁকি থাকে। সত্যি কথা বলতে, মশা থেকে বাঁঁচতে কর্মীদের জন্য তো আর কোনো ধরনের পোশাক বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু মশকনিধন কর্মীরাই নয় বরং হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে যারা সেবাধর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত সবারই ঝুঁকি আছে। আসলে সবাই ঝুঁকির মধ্যে থাকবে, যেটাকে এড়ানোর কোনো উপায় নেই। আমাদের কর্মীরা এরপরও দারুণভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ডিএনসিসিতে কোনো মশকনিধন কর্মীর মৃত্যু হয়নি বলে জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, আমার এলাকায় এখন পর্যন্ত এমন কোনো কেস নেই। আর কোনো কর্মী রোগে আক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তার চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads