দেশে করোনা চিকিৎসা, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে শুরু থেকে বার বার সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে আবারো সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামীকাল শনিবার থেকে সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে সপ্তাহব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি পরিবর্তন করে এখন একদিনের জন্য এই কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রথমে বলা হয়েছিল, যারা বয়স্ক তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিবন্ধন ছাড়াই টিকাকেন্দ্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলে টিকা দিতে পারবেন। পাশাপাশি ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই তাদের টিকা নিতে সমস্যা হবে না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বিশৃঙ্খলা এড়াতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও নিবন্ধন ছাড়া কাউকে টিকা দেওয়া হবে না। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭ আগস্ট শুধু পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক নারী ও পুরুষের পাশাপাশি শারীরিক প্রতিবন্ধীরা টিকা নিতে পারবেন। কিন্তু এর আগে ওই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদেরও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়াও জনপ্রশাসনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আরো অনেকে। গত ৩ আগস্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ঘোষণা দেন, ‘আগামী ১১ আগস্টের পর থেকে টিকা ছাড়া ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে কেউ বাইরে বের হতে পারবেন না।’ তার বক্তব্যের পর বিতর্ক সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে ৪ আগস্ট তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন।
এভাবে করোনা মহামারির শুরু থেকেই করোনা মহামারিকে ঘিরে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরবর্তীতে বাতিল করে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আবারো সেই আগের সিদ্ধান্তে ফিরে আসার নজির সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক এবং জাতীয় টিকা কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার বে-নজির আহমেদ সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘নেতৃত্ব যদি স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে থাকত তাহলে এগুলো অ্যাড্রেস করা সহজ হতো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়াও কখনো জনপ্রশাসনমন্ত্রী, কখনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কখনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। টিকার ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যতটা সক্রিয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সেভাবে দেখি না। এর ফলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা অনেক সময় জানি না কী ঘটতে যাচ্ছে, কত টিকা পেতে যাচ্ছি।’
আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জোট ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস্ অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন-গ্যাভি’র সদস্য এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজামউদ্দিনের মতে, জাতীয় কারিগরি কমিটিতে জনস্বাস্থ্যবিদসহ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞদের যুক্ত করা হলে আরো লাভবান হওয়া যেত। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘জাতীয় কমিটি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কাজটা বাস্তবায়ন করবে মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এখানে একটা সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে। বিভিন্নজন বিভিন্ন সময় একেক কথা বলছেন। কিন্তু এখানে একজন মুখপাত্র থাকা দরকার এবং সেটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ই হওয়া উচিত। কারণ বাস্তবায়নটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ই করবে। তাহলে সমন্বয়টা আরো ভালো হবে এবং এতে আগামী দিনের প্রোগ্রামগুলো অনেক ভালো হবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্গেট ঠিক না করেই টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা ঠিক হয়নি। তারা মনে করছেন, ইপিআইতে যেভাবে টার্গেট নির্ধারণ করে টিকা প্রদান করা হয় করোনার টিকার বেলায়ও সেটি অনুসরণ করা যেত। ডাক্তার বে-নজির আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বয়স্কদের এখন আগে টিকা দেওয়া হবে, এটি আগেভাগে তালিকা থাকলে সেই অনুযায়ী টিকা দেওয়া হলে একটা হিসেব থাকত। পাশাপাশি কারা বাদ পড়েছে এবং কারা টিকা গ্রহণ করেছে সেটার একটি সুনির্দিষ্ট হিসেব থাকত। এইখানে একটি ঘাটতি রয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে যদি তালিকা করা হতো তাহলে আমরা সহজেই টার্গেটেড পিপলকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারতাম। আর তালিকাভুক্ত করাটা খুব কঠিন ছিল না। কারণ আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকের চারদিকে ১২০০ থেকে ১৮০০ খানা রয়েছে। এদের মাধ্যমে তালিকা করলে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিনেই তা সম্ভব ছিল।’
এদিকে গত ১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে ১৮ বছরের বেশি শিক্ষার্থীদের টিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন নির্দেশনার ফলে শিক্ষার্থীরা ৭ আগস্ট টিকা নিতে পারবেন না। এ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ তারা টিকা নিতে গেলে বয়স্করা বাদ পড়তে পারেন।
পাশাপাশি একটা কেন্দ্রে ২০০ জনকে টিকা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দিহান স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সাধারণত তাদের একদিনে এতজনকে টিকা দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। সুতরাং এটা বাড়তি চাপ। তাই এ ব্যাপারে প্রস্তুতিটা আরো ভালো করে নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তারপর টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে হবে। নইলে টিকা দিতে গিয়ে যদি অনিয়ম ধরা পড়ে তাহলে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।





