দেশে স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এরই মধ্যে অধিকাংশ জেলা-উপজেলাতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। ঢাকায় ও আশপাশের জেলায় এ সমস্যা না থাকলেও উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলায় অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শয্যা সংখ্যাও নেই। এর মধ্যে করোনা মহামারিতে চিকিৎসা এবং জরুরি সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো।
এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি ও করোনাভাইরাসের আক্রান্ত রোগীদের শয্যা সংখ্যা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)। এ জন্য দ্রুত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশের সব বিভাগ ও জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবরোধে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি করণীয় ও চলমান কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে ভিডিও কনফারেন্সে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন হলে দ্রুত স্বাস্থ্য সেবায় আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের ওপর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সঠিক নিয়ন্ত্রণ নেই। কেনাকাটা থেকে সর্বস্তরে হয় অনিয়ম দুর্নীতি। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে স্বাস্থ্য খাতে কোন উদ্যোগই সফল হবে না।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সারা বাংলাদেশে সরকারিভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভাব না থাকলেও দেশের প্রত্যন্ত জেলা উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। চিকিৎসকদের নিয়োগ দেয়া হলেও প্রত্যন্ত জেলা উপজেলায় তাদের অনেকই থাকছে না। ঢাকা থেকে দূরের জেলা উপজেলাতেই চিকিৎসকদের এই সংকট সবচেয়ে বেশি। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একযোগে ১ হাজার ২৩৯ চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে বদলি আদেশ জারি করে। কিন্তু জটিলতার অভিযোগে আদেশ জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসকদের বদলি আদেশ স্থগিত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে মন্ত্রণালয়ের নানা ব্যর্থতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালচনার ঝড় ওঠে।
এদিকে অতিরিক্ত বেড বাড়িয়েও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সংকট দেখা দিয়েছে অনেক হাসপাতালে। এ অবস্থার কারণ দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে করোনা সংক্রমণ রোগী ও মৃত্যু ছাড়িয়েছে দুইশ’র অধিক। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ হাসপতালগুলোতে এরই মধ্যে অক্সিজেন ব্যবস্থা বৃদ্ধিসহ শয্যা সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোডিভ রোগীরদের জন্য নির্ধারিত ১৩০ শয্যার মধ্যে ৭৭টি শয্যায় রয়েছে কেন্দ্রীয় অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি রোগীদের ভরসা সিলিন্ডালের অক্সিজেনের ওপর।
হাসপাতালের ফোকালপারসন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলেও বর্তমানে এই হাসপাতালে অক্সিজেনের কোনো সংকট নেই। হাসপাতালটিতে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে ৫৩টি। হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. কাজী আবু রাশেদ জানান, জেনারেল হাসপাতালের ৭০ শয্যা বিশিষ্ট করোনা ইউনিটকে রোববার দুপুর ২টা থেকে ৮০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আপাতত অক্সিজেনের সংকট নেই।
খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. প্রকাশচন্দ্র দেবনাথ জানান, এখানে অক্সিজেনের এখন কোনো সংকট নেই। এ হাসপাতালে নিজস্ব সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা আছে। লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্টও আছে। তাছাড়া সরকারিভাবে স্পেকট্রা কোম্পানির অক্সিজেন সিলিন্ডারের সরবরাহ রয়েছে।
তবে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোভিড রোগীদের জন্য নির্ধারিত ২৫০ বেডের বিপরীতে ২৭০-২৭৫ জন রোগী ভর্তি থাকে। এ অবস্থায় হাসপাতালটিতে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী সংকট দেখা দিয়েছে। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. কুদরত-ই-খোদা জানান, করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ৯০টি বেড ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বর্তমানে ২৫০টি করা হয়েছে। কিন্তু, রোগীর সংখ্যা আরও বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম হওয়ায় চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়সহ সংশ্লিষ্টরা চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। গত ৩০ জুন অক্সিজেনের অভাবে এ হাসপাতালে কয়েকজন রোগী মারা গেছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে চালু থাকা ১৮টি ইউনিটে চিকিৎসক প্রয়োজন ৫৮ জন। কিন্তু চিকিৎসক রয়েছে ৩১ জন। ২৭ জন চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। এছাড়া ৫০ জন সুইপার, ৫০ জন আয়া ও ৫০ জন ওয়ার্ডবয় প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সংকট নেই, তবে হাই-ফ্লো নেজাল ক্যানুলা সংকট রয়েছে। বর্তমানে ২০ হাজার ইউনিট অক্সিজেন রয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনে। সেখান থেকেই অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে রোগীদের।
রোগীর চাপ বাড়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড রোগীদের জন্য সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনসহ নির্ধারিত বেড ৪০৫টি থেকে বাড়িয়ে ৪৫৫টি করা হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা শামীম ইয়াজদানী জানান, আমাদের হাসপাতালে অক্সিজেনের কোনো সংকট নেই। এখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতালে প্রতিদিন ৬ হাজার লিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন থাকলেও, আমাদের সরবরাহ আছে ১০ হাজার লিটার। এছাড়া, ১৪ হাজার লিটার অক্সিজেনের একটি ট্যাংকার গাড়ি বাড়তি রিজার্ভ হিসেবে রাখা হয়। ১ হাজার ১২২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ২৩৩টি অক্সিজেন কনসুলেটর রয়েছে। এছাড়া ৬৯টি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে। তিনি জানান, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন করে নতুন রোগী ভর্তি হলে; যত ব্যবস্থাই থাকুক না কেন তা ভেঙে পড়তে বাধ্য হবে।
উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন সরবরাহর অভাবে কয়কজন রোগী মারা যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে উঠে আসার পর বগুড়ার কোভিড ডেডিকেটেড দুই সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি উদ্যোগে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এখন দুই হাসপাতালে যে পরিমাণ হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে তাতে রোগীদের চিকিৎসার কোনো সমস্যা হবে না। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীর মৃত্যু কমে আসবে।
যদিও গত শুক্রবার অক্সিজেনের অভাবে বগুড়ায় ১৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এনিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরপর শনিবার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টি এবং বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ১০টিসহ মোট ২০টি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলাসহ আনুষাঙ্গিক উপকরণ দেয় এস আলম গ্রুপ।
বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগে ১২টি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যালুনা ছিলো। ৩ জুলাই এস আলম গ্রুপ থেকে ১০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দেওয়া হয়। রোববার নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি থেকে তিনটি ও এসআর ট্রাভলেস দুটি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দিয়েছে হাসপাতালটিতে। হাসপাতালটিতে করোনা রোগীদের জন্য শয্যা ১০০টি থেকে বাড়িয়ে ২০০টি করা হয়েছে।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে তাতে রোগীদের ভালোভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। বাগেরহাট থেকে গুরুতর অসুস্থ রে
বাগেরহাটের ৫০ বেডের কোভিড ডেডিকেটেড সদর হাসপাতালে মাত্র ১০ জন চিকিৎসক ও ১২ জন নার্সকে এই রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। সংকট রয়েছে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরও। সিকিউরিটি গার্ড ওয়ার্ডবয়ের কাজ করছে। জনবল সংকট মোকাবেলায় খুলনা থেকে ৬ জন নার্স ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে থেকে অতিরিক্ত চারজন চিকিৎসক আনা হয়েছে। তারপরও রোগীর চাপ সামলাতে হিশশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কোভিড হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন থাকলেও আইসিইউ নাই। আইসিইউয়ের জন্য সঙ্কটাপন্ন অবস্থার রোগীদের খুলনায় পাঠাতে হয়।
বাগেরহাট জেলা সিভিল সার্জন ডা কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, রোগী বাড়ায় কোভিড হাসপাতালের শয্যা ৫০টি থেকে বাড়িয়ে ৭০টি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার আনা হয়েছে। কিন্তু, পরিস্থিতি যদি বেশি খারাপ হয়, তাহলে আমাদের পক্ষে সেবা দেওয়া কঠিন হবে।
এদিকে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অক্সিজেন সরবরাহ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তদের মুখপাত্র অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিনের চাহিদার তুলনায় অক্সিজেনের উৎপাদন বেশি। তবে, রোগীর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বৃদ্ধি পেলে অক্সিজেন সরবরাহ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, যারা অক্সিজেন উৎপাদন করে তাদের সাথে আমাদের প্রতিনিয়ত কথা হচ্ছে। আমরা আমাদের চাহিদা জানাচ্ছি।
নাজমুল ইসলাম আরো বলেন, দেশে কোন কিট সংকট নেই। প্রতিটি জায়গায় অ্যান্টিজেন ও আরটিপিসিআর টেস্ট করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৫০ হাজার টেস্টের সক্ষমতা আছে। মানুষ টেস্ট করাতে গেলেই টেস্ট করাতে পারবে।





