অপরাধ

হামলার ছক কষছে জেএমবি

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ৫ ডিসেম্বর, ২০২১

বোমা হামলার ছক কষছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে মরিয়া হয়ে একের পর এক আস্তানাও গড়ে তুলছে তারা। এসব আস্তানায় বোমা তৈরিসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে কঠোর গোপনীতার মধ্যে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে সংগঠনটির প্রশিক্ষকরা। নিষিদ্ধ এ সংগঠনটির উত্তরাঞ্চলের শহর নীলফামারীতে আস্তানা গড়লেও র্যাব তা চিহ্নিত করে অভিযান চালায়। অভিযানে রংপুর বিভাগীয় জেএমবির প্রধান, বোমা বিশেষজ্ঞসহ আটক করা হয়েছে ৫ জঙ্গিকে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম।

এর আগে গত বছরের শেষ দিকে রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ায় জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মেলে। সংগঠন গোছানোর জন্য বার বার উত্তরাঞ্চলকেই বেছে  নিচ্ছে জেএমবির জঙ্গিরা। মূলত নজরদারি এড়ানো, ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই তাদের দলে ভেড়ানোর কৌশল হিসেবে দেশের এ অঞ্চলকেই বেছে নিচ্ছে তারা।

নীলফামারীতে অভিযান চালানো র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বলছে, এ অঞ্চলকে বেছে নিয়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু নিয়মিত নজরদারির কারণে তাদের এ চেষ্টা সফল হচ্ছে না। র্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, জেএমবি বোমা হামলা করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতেই তারা একত্রিত হয়েছিল। তৈরি করছিল বোমা। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, র্যাবের সাইবার মনিটরিং সিস্টেমের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি করে আসছিল তাদের। আর নজরদারির কারণে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে র্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগ ও র্যাব ১৩ এর অভিযানিক দল এ অভিযান পরিচালনা করে। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত ওয়াহেদ জেএমবির একজন বোমা বিশেষজ্ঞ। মূলত সে বোমা তৈরি করে সেটির মাধ্যমে নাশকতা চালিয়ে জেএমবির অস্তিত্ব জানান দিতেই তারা পরিকল্পনা করছিল। এছাড়াও অভিযানে রংপুর অঞ্চলের প্রধান জাহিদকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওই অভিযানে অন্যান্য গ্রেপ্তারকৃতরা হলো জাহিদের ভাই অহিদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল মামুন, নূর আমিন। এদিকে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা আবারো সক্রিয় হয়ে উঠার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক শক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে নাশকতার পরিকল্পনা করছে তারা। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ছদ্মবেশে থেকে এ অঞ্চলে সারা দেশ থেকে নতুন নতুন সদস্য এনে এমন চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ এ সংগঠনটি।

এর আগে সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌর এলাকায় সর্বশেষ জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায়। এখানেই অভিযান চালিয়ে র্যাব ৪ জঙ্গিকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে তারা আত্মসমর্পণ করে।

এর আগে রাজশাহী মহানগরীর শাহ মখদুম এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ অঞ্চলের জেএমবি প্রধান মাহমুদসহ ৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যে শাহজাদপুরের আস্তানার খোঁজ পায় র্যাব।

বগুড়ায় নব্য জেএমবির আরেকটি ৪ জনের গ্রুপকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, নব্য জেএমবির ৪/৫ জনের একেকটি গ্রুপ তৈরি হয়ে তারা নাশকতার পরিকল্পনা করছে।

সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়া এবং সর্বশেষ নীলফামারীতে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ড্রোন, বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়।

র্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব জানতে পারে উত্তরাঞ্চলীয় নব্য জেএমবির প্রধান জুয়েল ওরফে হাবিবুল্লাহ মাহমুদ রাজশাহী মহানগরীর শাহ মখদুম এলাকায় অবস্থান করছে। এমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মাহমুদ আটক হয়, সঙ্গে তার তিন সহযোগীও। এরা হলো খুলনার খালিশপুরের আশরাফুল, সাঁথিয়া পাবনার আলিফ (২০) এবং নালথা সাতক্ষীরার জুয়েল (২২)।

আটককৃতদের ভাড়া বাসা থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল, ছোট বেয়ারিং বল, গান পাউডার, ফিউজ, ডেটোনেটর, ওয়্যার কেবল, রড কাটার, রড কাটিং টুল, জিহাদি বই, বিভিন্ন নির্দেশিকা, চাপাতি ১টি ও রামদা ২টি উদ্ধার করা হয়।

রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের দুই অভিযানে মোট ৮ জঙ্গিকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে রাজশাহীর আঞ্চলিক কমান্ডার বা আমির হাবিবুল্লাহ মাহমুদকে আটক করা হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়ায়।

মাহমুদ প্রথমে আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য ছিল। এরপর সে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যায়। ২০১৯ সালে ১০ অক্টোবর মামলায় জামিন পেয়ে জেলহাজত থেকে বেরিয়ে আসে। জেলে থাকা অবস্থায় নব্য জেএমবির আরেক সদস্য রাশেদুল ইসলাম সুমনের কাছ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবিতে যোগদান করে। জেল থেকে বেরিয়ে সে উত্তরাঞ্চলে নব্য জেএমবিকে সংগঠিত করার কাজ করতে থাকে। এরই মধ্যে আমিরও নির্বাচিত হয়।

র্যাব জানায়, মাহমুদকে আমরা দীঘদিন ধরেই খোঁজা হচ্ছিল। এরই মধ্যে তার সন্ধানও পাওয়া যায়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন স্থানে ৪/৫ জন করে একেকটি গ্রুপ করে তাদের থাকা খাওয়া এবং প্রশিক্ষণের কাজ করে আসছিল।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, আস্তানা গড়েই তারা নাশকতার জন্য তারা তৈরি হচ্ছিল। এ জন্য অস্ত্র, বোমা তৈরির গানপাউডারও সংগ্রহ করেছিল। এদের কেউ কেউ বোমা বানানো ও অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ এমনকি গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণও নিচ্ছিল। জঙ্গিরা যেন সংগঠিত হয়ে নাশকতা চালাতে না পারে এ কারণে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রাপ্ত তথ্য যাছাই বাছাই করে অভিযান অব্যাহত থাকছে।

বগুড়ায় গ্রেপ্তার চার জঙ্গি হলেন-গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার তরশ্রীরামপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে তানভীর আহম্মেদ ওরফে আবু ইব্রাহিম (২৫), টাঙ্গাইল জেলার ভুয়াপুর উপজেলার জগতপোড়া এলাকার জাকারিয়া জামিল (৩১), ময়মনসিংহ জেলার সদরের চকশ্যামরামপুর এলাকার আবদুর রহমানের ছেলে আতিকুর রহমান (২৮) ও আবদুল হাকিমের ছেলে আবু সাঈদ (৩২)।

তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটার গান, এক কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য (পটাশিয়াম ক্লোরেট), ২ রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন, দুটি কার্তুজ, তিনটি বার্মিজ চাকু, একটি চাপাতি ও চারটি ব্যাটারিসহ বেশ কিছু তার উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। উদ্ধার করা বিস্ফোরক দিয়ে ৫০টি বোমা তৈরি করা সম্ভব।

আটক ৪ জঙ্গির মধ্যে জাকারিয়া জামিল নব্য জেএমবির মিডিয়া শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থানার জগতপোড়া এলাকার খন্দকার গোলাম সারোয়ারের ছেলে জামিল ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পশ্চিম রাজাবাজারে বসবাস করতো।

সে অনলাইনে আরবিতে প্রকাশিত জঙ্গিবাদ সংক্রান্ত সব প্রকাশনা বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করতো। তার বিরুদ্ধে ঢাকার আশুলিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে। আটক তানভীর আহম্মেদ ওরফে আবু ইব্রাহিম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিভাগের ছাত্র।

গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার তরশ্রীরামপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে তানভীর নব্য জেএমবির আইটি শাখার সদস্য ছিল। তবে তিনি ঢাকার খিলগাঁওয়ের বনশ্রী এলাকায় বসবাস করতো। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ড্রোন তৈরির সামগ্রীসহ তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছিল। অবশ্য তখন তিনি পলাতক ছিলেন।

অপর দুই জঙ্গির মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার চকশ্যামরামপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে আতিকুর রহমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ছাত্র। নব্য জেএমবির নতুন এই সদস্য অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতো। একই এলাকার আব্দুল হাকিমের ছেল আবু সাঈদও সংগঠনের নতুন সদস্য। সে যুদ্ধ করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল বাতেন বলেন, এ অঞ্চলে জঙ্গিরা যেন নেটওয়ার্ক গড়তে না পারে সে জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads