মুফতি উবায়দুল হক খান
একজন মুসলমানের অবশ্য করণীয় কাজসমূহের একটি হলো, তার ওপর আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের মূল্যায়ন করা। এমন কাজ করা উচিত যাতে নিয়ামতের হেফাজত ও সংরক্ষণ হয়। আমাদের ওপর আল্লাহতায়ালার নিয়ামতের শেষ নেই। গণনা করে আল্লাহর নিয়ামতের শেষ করা যাবে না। অগণিত নিয়ামতরাজির মধ্য থেকে হিজরি সন মুসলিম উম্মাহর জন্য মহান আল্লাহর এক অনন্য নিয়ামত। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব প্রিয়নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা হতে মদিনার ঐতিহাসিক হিজরতের পর থেকে এ হিজরি সন গনণা শুরু হয়। যার ওপর সাহাবিদের ঐকমত্য রয়েছে।
সাহাবিগণের পর মুসলমানেরা উত্তরাধিকার সূত্রে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে থেকে সন গণনা করে আসছেন। কেননা মুসলমানদের সব কাজ-কর্মের অনুপ্রেরণা হলো একমাত্র বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর হিজরতকে চির স্মরণীয় করে রাখা তাঁর উম্মতের আত্মার প্রশান্তি, মনের তৃপ্তি। তাছাড়া আল্লাহর মনোনীত ইসলাম ধর্মে অনেকগুলো ইবাদত রয়েছে যেগুলো হিজরি সনের সাথে সংশ্লিষ্ট। তা হলো-রমজান মাসের প্রথম রোজার তারিখ জানা। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন জানা। হাজী সাহেবগণের হজের তারিখ জানা। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিবসে নফল রোজা পালনের জন্য হিজরি তারিখ জানা অতীব জরুরি। যে দিবসগুলোতে রোজা পালনের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা পালনের জন্য গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন-জিলহজ মাসের নয় তারিখ বা আরাফাহ দিবসের রোজা, মহাররম মাসের দশ তারিখের রোজা, প্রতি আরবি মাসের আইয়্যামে বিজ তথা ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখের রোজা।
এছাড়াও আরো নফল রোজা রয়েছে। তবে এ দিনগুলোতে রোজা রাখার জন্য হিজরি সনের হিসাব জানা জরুরি। তাই হিজরি সনের হিসাব জানা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর জন্য অবশ্য কর্তব্য।
কোনো মহলে কাউকে না কাউকে এ হিসাব রাখা একান্ত জরুরি। কারণ এছাড়া এ কথা প্রতিভাত হলো, হিজরি সনের তারিখ গণনা না জানা থাকলে ইসলামের কিছু কিছু ইবাদত করা অসম্ভব। তারিখের সাথে অনেক কিছুই সম্পর্কিত। রোজা কখন শুরু হবে, আর কখন শেষ হবে এর কোনো হিসাব ঠিক থাকবে না। আবার ঈদ উদযাপনেও সমস্যার সৃষ্টি হবে। পবিত্র হজব্রত পালন করাও জটিল হয়ে যাবে। সুতরাং মুসলিম সমপ্রদায়ের সাথে হিজরি সনের সম্পর্ক নিবিড়।
তিক্ত হলেও সত্য, আমরা হিজরি সনের চেয়ে ইংরেজি সন নিয়ে মেতে আছি। বাঙালি হিসেবে বাংলা সনের যেমন আমাদের গুরুত্ব নেই, তেমনি মুসলিম হিসেবে হিজরি সনের কোনো গুরুত্ব আমাদের কাছে নেই। অনেকে বাংলা বার মাসের নাম জানলেও আরবীটা জানেন না। পত্রিকাগুলোতে দায়সারাভাবেই লেখা হয় হিজরি সনের তারিখ। তবুও লেখা হয়, এটুকু সান্ত্বনাও কম কী। আমরা একটা গোলামি জিঞ্জিরে আবদ্ধ। ইংরেজি ভাষা শেখায় যেমন গুরুত্ব আমাদের ঘরে, তেমনি ইংরেজি সনের তাজিম। এক সময় ইসলামী ঘরানার প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংগঠনগুলো হিজরি সন-তারিখ, তাদের পোস্টার, লিফলেট ও বিজ্ঞাপন-বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহার করে আসছিল। এখন সেটাও লুপ্ত প্রায়। অন্তত আলোচনা সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের তারিখে আরবী মাসের প্রতি লক্ষ রাখা উচিত নয় কি?
নীরবে আমাদের মাঝে হিজরি সন আসে, আর নীরবেই চলে যায়। কে রাখে কার খোঁজ। হিজরি সন এভাবেই বিলুপ্ত হোক সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিজাতীয় সংস্কৃতির দাবানলে, আগ্রাসনের কালো থাবায় হাবুডুবু খাচ্ছি আমরা। প্রতিনিয়ত বিজাতীয় স্যাটেলাইটের অভিনব কালো স্রোতের অমানিশার ইতারে আমাদের সাংস্কৃতিক জীবন-যৌবন অসুস্থ হচ্ছে। সম্ভাবনাময় মুসলিম সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রাখতে হিজরি সনের গুরুত্ব বাড়াতে হবে, এনিয়ে আলোচনাও বাড়ানো উচিত। নতুন নতুন পদক্ষেপও গ্রহণ করা উচিত। সংশ্লিষ্ট চিন্তাশীল আলেম ও অগ্রসর তারুণ্যকে এ বিষয়ে নতুন করে ভাববার জন্য বিশেষ অনুরোধ করছি। আল্লাহ আমাদের সহয় হোন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর





