আল ফাতাহ মামুন
‘হিজড়ারাও ইনসান’-এ স্লোগানকে সামনে রেখে সম্প্রতি রাজধানীর কামরাঙ্গীচরের লোহার ব্রিজ এলাকায় দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসা শুরু হয়। এর আগে হিজড়াদের জন্য আলাদা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা শোনা যায়নি। হিজড়াদের বিনামূল্যে ধর্মীয় শিক্ষা এবং শিক্ষা উপকরণের দায়িত্ব নিয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আহমদ ফেরদৌস বারী চৌধুরী ফাউন্ডেশন। ইতোমধ্যে রাজধানীতে আরো দশ থেকে বারোটি তৃতীয় লিঙ্গের অস্থায়ী মাদরাসা গড়ে ওঠেছে। আয়োজকরা বলছেন, একজন হিজড়াও যেন আমাদের শিক্ষা প্রকল্পের বাইরে না থাকে সে চেষ্টা করে যাচ্ছি। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে মফস্বলগুলোতেও তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসার আলো ছড়িয়ে পড়বে ইনশাল্লাহ।
মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি আবদুর রহমান আজাদের কাছে জানতে চাইলাম-এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিলেন কীভাবে? তিনি বললেন, প্রথমে আমি গেন্ডারিয়া বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং পরবর্তীতে পথশিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করি। কামরাঙ্গীচরে আমি একটি মসজিদের খেদমতে আছি। এখানে বয়স্ক ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে কোরআন শেখাতে শুরু করি। এই এলাকার কয়েকজন হিজড়াকে দেখে আমার মনে হঠাৎ ভাবনা এলো- ওরাও তো ইনসান। সৃষ্টির সেরা জীব। দিনের জিম্মাদারি তো ওদের ওপরও আছে। কিন্তু স্কুল-কলেজ-মাদরাসা কোথাও ওরা যায় না, যেতে পারে না। ওদের অসহায়ত্ব এবং সামাজিক লাঞ্ছনার জীবনের কথা ভেবে আমার হূদয় দরদে ভিজে ওঠে। হায়! এ জনগোষ্ঠীর দুনিয়া তো গেলই, আখেরাতও তো চলে যাচ্ছে। এদের মুক্তির জন্য কিছু একটা করতে হবে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, যে করেই হোক ওদের মন জমিনেও কোরআনের বীজ বুনতে হবে।
হিজড়াদের কোরআন শেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যত সহজ, বাস্তবায়ন করা তত সহজ ছিল না। সাধারণ মানুষ যখন হিজড়াদের দেখে পালিয়ে বাঁচে তখন একজন আলেমের পক্ষে হিজড়াদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বলেন, আমার পরিচিত একজন মুসল্লি থেকে একজন হিজড়ার নাম্বার সংগ্রহ করি। নাম্বার আদান-প্রদানেও ছিল বিশেষ বাঁধা। যখন ওই হিজড়াকে ফোন করে বলি, আমি তোমাদের মসজিদের ইমাম বলছি, তোমাদের কোরআন শেখাতে চাই। তখন সে বলল, আমরা চাইলেই কিছু করতে পারি না। আমাদের গুরুমায়ের অনুমতি লাগবে। অনেক কষ্টে গুরুমাকে খুঁজে বের করি। গুরুমা বললেন, আমরা তো আগ্রহের সঙ্গেই দিন-ধর্ম শিখতে চাই। একাধিকবার কয়েকজন আলেমকে প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু হিজড়া বলে তারা আমাদের দূরে ঠেলে দেয়। সব জল্পনা-কল্পনা শেষে নভেম্বর মাসের ৬ তারিখ শুক্রবার ৩৫ জন হিজড়াকে নিয়ে দাওয়াতুল কোরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসার গর্বিত পথ চলা শুরু হয়।
দাওয়াতুল কোরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসা নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন-জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বলেন, অচিরেই আমরা হিফজ কোর্স চালু করব। যারা হিফজ শেষ করবে তাদের ফাউন্ডেশনের খরচে হজ্ব করানোর অফারও দেব ভাবছি। হিজড়ারাও যেনো বড় আলেম হয়ে দিনের জিম্মাদারি এবং দাওয়াতের মেহনত করতে পারেন সে টার্গেট নিয়েই এগুচ্ছি। এছাড়াও আমাদের অন্যতম টার্গেট হলো-হিজড়াদের রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। আজ তারা সমাজের বোঝা এবং মানুষের বিরক্তির কারণ। সেদিন বেশি দূরে নয় যখন হিজড়ারা রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মান এবং সম্পদের কারণ হবে। আমাদের হিজড়ারা যখন হাফেজ-আলেম-কর্মবীর হয়ে মানবসম্পদে পরিণত হবেন, তখন বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা এক বিরল গৌরব অর্জন করবে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। দোয়া করবেন আমরা যেন লোভ এবং লোক দেখানোর ধ্বংসাত্মক মহামারী থেকে বেঁচে থাকতে পারি।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হয়েছে, দাওয়াতুল কোরআন মাদরাসায় হিজড়াদের বিনামূল্যে পড়াশোনার পাশাপাশি থাকা খাওয়ারও ব্যবস্থা করবে। সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পাই-মাদরাসাটিতে অনাবাসিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। সকাল ১০/১১টা পর্যন্ত ক্লাস শেষ করে শিক্ষার্থীরা যার যার বাসায় চলে যায়। এ ব্যাপারে পরিচালক বলেন, আমাদের মাদরাসাটি অনাবাসিক। যেসব সংবাদ মাধ্যম আবাসিক বলে প্রচার করেছে তারা ভুল বার্তা দিয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক





