দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বোরো ক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হিটশক বা গরম ঝোড়ো বাতাসে যে পরিমাণ ধান নষ্ট হয়েছে, তাতে উৎপাদন এক লাখ টন কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, সাম্প্রতিক হিটশকে তিন লাখ কৃষকের ২১ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে নতুন করে ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হওয়ায় গতবারের চেয়ে ধান উৎপাদন কমবে না; লক্ষ্যমাত্রায়ও কোনো প্রভাব পড়বে না।
এদিকে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, দেশজুড়ে হিটশকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য সরকার ইতোমধ্যে ৪২ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং সহায়তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে কৃষকদের এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি না হতে হয় সেজন্য উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল এবং রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধক উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
গতকাল রোববার গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) গবেষণা মাঠ পরিদর্শনের সময় এসব বলেন তিনি। অনেকটা আকস্মিকভাবেই মন্ত্রী ব্রির গবেষণা মাঠ পরিদর্শন করেন। সম্প্রতি হিটশকে ধানের ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চতাপ সহনশীল ধানের জাত এবং গবেষণার অগ্রগতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে যান তিনি। সেখানে দীর্ঘ সময় তিনি ব্রির গবেষণা মাঠে উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধানের গবেষণা প্লটসহ ব্লাস্ট ও বিএলবি প্রতিরোধী ধানের অগ্রগামী জাত, ব্রি উদ্ভাবিত বাসমতি টাইপ ধান, হাইব্রিড ধানের গবেষণা এবং ব্ল্যাক রাইসসহ বিভিন্ন উন্নত গুণসম্পন্ন জাতের প্লটসমূহ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর মন্ত্রীকে বিভিন্ন গবেষণা প্লট সম্পর্কে ব্রিফ করেন।
কৃষিমন্ত্রী সুপার হাইব্রিড ইউএস-৮৮ এবং ব্রি উদ্ভাবিত বোরো মওসুমের ব্রি হাইব্রিড ধান-৩, ব্রি হাইব্রিড ধান-৫, ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ (প্রস্তাবিত) এবং বহুল প্রচলিত হাইব্রিড এসএল-৮ এবং তেজ গোল্ডের ফলনের তুলনামূলক পরীক্ষণ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান-৫-এর বীজ উৎপাদন প্লট পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি খাদ্য নিরাপত্তায় ব্রির বিজ্ঞানীদের প্রস্তুতি ও গবেষণা অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানান।
এবার বোরোতে ২ কোটি ৫ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে হাওর অঞ্চলে বোরোর আগাম ফলন কাটাও শুরু হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বলেন, হিটশকে ২১ হাজার হেক্টর জমির সফল নষ্ট হয়েছে। এতে করে এই বোরো মৌসুমে এক লাখ টন ধান কম উৎপাদন হতে পারে। তিন লাখের মতো কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার সারা দেশে ৭৮ হাজার হেক্টর জমি বেশি আবাদ হয়েছে। আবার হিটশকে ২১ হাজার হেক্টর জমি যখন ক্ষতি হয়েছে সেই হিসেব করলেও গতবারের চেয়ে এবার আবাদি জমি বেশিই রয়েছে; মাঠে ফলনও ভালো হয়েছে। এই ফসলটি ওঠার আগে যদি আর কোনো দুর্যোগের কবলে না পড়ে তাহলেও গতবারের চেয়ে এবার ফলন বেশি হবে, ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় কোনো ধরনের সমস্যা হবে না।
প্রসঙ্গত, বোরো ধানের ফুল ফোটার সময়ে গত ৪ এপ্রিল ‘হিটশক’ বা গরম বাতাসে পুড়ে ফলনের ক্ষতি হয়। গরম ঝোড়ো বাতাসের কারণে ফুল ফোটার অপেক্ষায় থাকা ধানে চিটা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নেত্রকোনো, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নড়াইল এলাকার কৃষকই বেশি। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই গরম ঝোড়ো বাতাসে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। হিটশকের পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মেসবাহুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নেত্রকোনা, মদন, খালিয়াজুড়ি, কেন্দুয়া, কিশোরগঞ্জের নিকলী, করিমগঞ্জ, সদর এলাকা ঘুরে দেখেন।
অক্সিজেন সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছেন উৎপাদক-বিক্রেতারা
নিজস্ব প্রতিবেদক হ
হঠাৎ করে বেড়েছে অক্সিজেনের চাপ। দেশের করোনা পরিস্থিতি যতই খারাপের দিকে যাচ্ছে, ততই সংকট বাড়ছে মেডিকেল অক্সিজেনের। সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছেন উৎপাদক ও খুচরা বিক্রেতারা। করতে হচ্ছে আমদানিও। শিল্পকারখানায় অক্সিজেন সরবরাহ অনেকে বন্ধ করার কথা জানালেও সেখানকার চাহিদাও ভূমিকা রাখছে চলমান সংকটে। সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন চাহিদার তুলনায় দিনে প্রায় ৬০ টন অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন উৎপাদনকারীরা। হাসপাতাল এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় দৈনিক অক্সিজেন চাহিদা আছে ১৮০ টনের। দেশের বহুজাতিক অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লিন্ডে জানিয়েছে, চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে তারা উৎপাদন বাড়িয়েছে। রূপগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের প্লান্টে দিনে ৯৫ টন উৎপাদন করছে এবং পুরোটাই সরবরাহ করছে। পাশাপাশি চাহিদা মেটাতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লিকুইড অক্সিজেনও আমদানি করা শুরু করেছে লিন্ডে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুটি প্ল্যান্টের এখন সর্বাধিক উৎপাদন ক্ষমতা ৯৫ টন। আরেকটি মেডিকেল গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৫ টন। অন্যদিকে দেশের শিল্পকারখানায় প্রতিদিন চাহিদা আছে ১০-১৫ টনের।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিফিল হচ্ছে বেশি : মিরপুরের বাসিন্দা হারুন-উর-রশিদ অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে শুধু ঘুরছেন রিফিল করানোর জন্য। মিরপুর থেকে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই তেজগাঁওয়ের কলোনি বাজারে এসেছেন একটু অক্সিজেনের আশায়। শেষে পেলেনও। বিক্রেতা জানালেন সংকটের কথা। কিছুক্ষণের জন্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও দুশ্চিন্তায় আছেন হারুন-উর-রশিদ। এই অক্সিজেন শেষ হলে আবার কোথায় পাবেন।
তেজগাঁওয়ের তাহের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবু তাহেরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘অক্সিজেন সরবরাহ কমে গেছে। আমরা বেশ হিমশিম খাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনে মেডিকেল রিফিল কম হয়। তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিফিল করছে বেশি। অথচ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিফিল এখন বন্ধ থাকার কথা। আমাদের কাছে বাড়তি চাপ আসে। আমরা ফেরত পাঠাই। এখন নতুন কোনো হাসপাতাল এলেও আমরা দিই না। আগে থেকে যাদের দিয়ে আসছি তাদেরই প্রাধান্য দিচ্ছি।’
মগবাজারের আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মালিক লতিফ রেজা বলেন, ‘এখন প্ল্যান্টে গাড়ি পাঠালে ৩-৪ দিন অপেক্ষা করতে হয়। আগে গাড়ি পাঠালে দিনে দিনে গ্যাস পেতাম।’
গাড়ি প্ল্যান্টে যাওয়ার পর ফেরত আসছে বলে অভিযোগ প্রায় সব অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রেতারই। তবে কেউ কেউ চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদনকেই বেশি দুষছেন। মগবাজারের ওই বিক্রেতা আরো জানালেন, ‘নতুন সিলিন্ডার এখন বিক্রি কমিয়ে দিয়েছি। বিশেষ ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করে দিচ্ছি। কারণ অনেকেই রোগী না থাকলেও শুধু দুশ্চিন্তার কারণে সিলিন্ডার ঘরে নিয়ে রাখছে। এ জন্য আমরা রিফিলই করছি বেশি। যারা খালি সিলিন্ডার কষ্ট করে নিয়ে আসে, বোঝা যায় তাদের ঘরেই রোগী আছে।’
পাশেই আরেক বিক্রেতা জানান, ‘নতুন সিলিন্ডার বিক্রি চালু আছে তবে কম। বেশির ভাগই রিফিল নিচ্ছে।’
উৎপাদকরা যা বলছেন
লিন্ডের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সায়কা মাজেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যতটুকু সম্ভব পুরোটাই মেডিকেল অক্সিজেন দিচ্ছি। ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে আমদানিও করছি। ভারতেও লিন্ডের নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে। সরকারও আমাদের সহায়তা দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িনি। বড় হাসপাতালগুলোতে লিকুইড অক্সিজেন দিই আমরা। এখনো চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি। তবে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়াতে আমাদের ক্লোজ মনিটরিংয়ে থাকতে হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে মানসম্মত বিদ্যুতের সমস্যা আছে। সে কারণে যদি কোনো প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়, সেটি চালু করতে ৩ ঘণ্টা লেগে যায়। আমাদের প্ল্যান্ট বিদ্যুৎ ও গ্যাস জেনারেটরে চলে।’
বিক্রেতাদের অভিযোগ সম্পর্কে জানালে তিনি বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাসের জন্য মেডিকেল গ্যাসের সরবরাহ দিতে দেরি হচ্ছে ব্যাপারটা এমন নয়। শিল্পকারাখানা কিন্তু চালু আছে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও। তার পরও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেডিকেলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারখানা খোলা থাকলে আমাদের জন্য একটু চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে একটা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করতে হয়। সিলিন্ডার দিলেও আমাদের গাড়ির সীমাবদ্ধতা আছে। চাহিদা দ্বিগুণ হলেও লজিস্টিক তো বেড়ে যায়নি।’
অপর এক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, মেডিকেল অক্সিজেনের জন্য সিরিয়াল লেগে আছে। একটি বড় সিলিন্ডার রিফিলে ঘণ্টাখানেক লাগে। আমরা দিনে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার কিউবিক মিটার অক্সিজেন রিফিল করতে পারি। কিন্তু চাহিদা এর প্রায় ৩ গুণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে ১৭ হাজার ৭২৪টি। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে ১ হাজার ৩৪৮টি এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে ১ হাজার ১৩২টি।





