হেফাজতে ইসলামের একটি বড় গ্রুপের নাম ‘মানহাজি’। সংগঠনের ভেতর এই গ্রুপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি এরাই হেফাজতকে বিভিন্ন আগ্রাসী কর্মসূচি দিতে বাধ্য করত। গ্রুপটির নেতৃত্বে ছিলেন শায়খ মুফতি হারুন ইজহার। এই গ্রুপটির উদ্দেশ্য ছিল, যে-কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা। জানা গেছে, সারা দেশে দেড় হাজারের মতো মানহাজি রয়েছে। এদের তালিকা তৈরি করে অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, এ পর্যন্ত ঢাকায় ২৩ হেফাজত নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ১৭টি মামলা তদন্ত করছে তারা। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ঘটে যাওয়া হেফাজতের প্রায় ৬০টি মামলা এখনো চার্জশিটের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। হেফাজতের এই গ্রুপটি সারা দেশে তাণ্ডব চালাতে সাধারণ কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেছে। এদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
জানা যায়, ধর্মীয় রাজনীতি ও জঙ্গিবাদের পরিভাষায় যারা সরাসরি জিহাদের ডাক দিয়ে কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের ’মানহাজি’ বলে। আর আরেকটি গ্রুপ উপমহাদেশে একটি যুদ্ধে মুসলমানদের জয়লাভ ও যোদ্ধাদের শামে (সিরিয়া) নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারন মুসল্লিদের দলে টানত। এদের বলা হয় গাজওয়াতুল হিন্দ। অরাজনৈতিক দাবি করা হেফাজতে ইসলামের উগ্রপন্থিদের নেতৃত্ব দিতেন সংগঠনটির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক হারুন ইজহার। সংগঠনে তাকে সবাই ‘মানহাজি’দের দলনেতা হিসেবে চিনতেন। বক্তব্য-বিবৃতিতে জিহাদের ডাক দেওয়া হারুন ইজহারকে এর আগেও গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। জামিনে বেরিয়ে আগের মতোই উগ্রপন্থা মতবাদ ছড়িয়ে কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন তিনি। হেফাজতকে তিনিই উগ্রবাদের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ ও জেএমবির নেতাকর্মীদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবদুল্লাহ আল মাসুম জানান, গত ১২ মে হারুন ইজহার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সহিংসতায় জড়িতদের নাম প্রকাশ করেছেন। চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আঞ্জুমান আরার আদালতে তিনি এই জবানবন্দি দেন। তবে ‘তদন্তের স্বার্থে’ নাম প্রকাশ করেননি ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
এর আগে ৩ মে হাটহাজারীর অন্য দুটি নাশকতা মামলাসহ মোট তিনটি মামলায় হারুন ইজহারকে মোট নয় দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল পুলিশ। আর ২৮ এপ্রিল গভীর রাতে লালখান বাজারের জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদরাসা থেকে হারুনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এই মাদরাসার সহকারী পরিচালক তিনি। তার বাবাও এই মাদরাসার পরিচালক। তার বাবা ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি ও হেফাজতের একসময়ের নায়েবে আমির।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে হাটহাজারীতে এবং সারা দেশের বিভিন্ন স্থানের নাশকতায় ‘প্রত্যক্ষভাবে মদত’ দেন হেফাজতের এই নেতা। ২৯ এপ্রিল তাকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে আগে ১৮টি মামলা ছিল। সব মিলিয়ে এখন মামলা ২২টি।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক মোদিবিরোধী আন্দোলনের নামে হেফাজত হাটহাজারীতে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার মদতদাতা ছিলেন হারুন ইজহার। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই উগ্রপন্থা ছড়ানো এবং জঙ্গি কার্যক্রমে জড়ানোর অভিযোগে মামলাও রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’
র্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৯ সালে হারুন ইজহারের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদরাসা ঘিরে আন্তঃদেশীয় জঙ্গিরা একটি ঘাঁটি তৈরি করেছিল। ওই বছরের শেষ দিকে তারা ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনে হামলার ছক কষেছিল। এই পরিকল্পনার সঙ্গে ছিল ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়্যবা। হারুন ইজহার পুরো এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেসময় ওই মাদরাসায় অভিযান চালিয়ে হারুন ইজহার এবং লস্কর-ই-তৈয়্যবার কয়েকজন সদস্য ও ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালেও একবার হারুন ইজহারকে গ্রেপ্তার করেছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ওই বছরের ১০ জুলাই হারুন ইজহারের জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদরাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে তিন জন নিহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারটি তাজা গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে। ওই ঘটনাতেও দেহরক্ষী জুনায়েদসহ হারুন ইজহারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে কয়েক বছর কারাগারে থাকার পর আবারো বের হয়ে আসেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাস কয়েক আগে আতিকুল্লাহ নামে হরকাতুল জিহাদের এক শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট-সিটিটিসি। আতিকুল্লাহ জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ কর্মকর্তাদের সেসময় জানিয়েছিল, হরকাতুল জিহাদ ও আফগান ফেরত মুজাহিদদের অনেকেই বর্তমানে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, হরকাতুল জিহাদ ও আফগান ফেরত মুজাহিদদের নতুন করে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যোগসূত্র ঘটিয়ে দেওয়ার কাজটি মূলত হারুন ইজহার করতেন। তাকে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি এসব বিষয়ে আরো বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য উদ্ঘাটন করা হবে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, হাটহাজহারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে তাণ্ডব হয়েছিল হেফাজতের এই গ্রুপ সেই তাণ্ডবের সঙ্গে যুক্ত। হারুন ইজহার এটির নেতৃত্ব দিতেন। তার কাছ থেকে কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। সে অনুপাতে কাজ হচ্ছে। আমরা হেফাজতের তাণ্ডবের সঙ্গে যুক্তদের আইনের আওতায় আনার কাজ করছি।





