১৯৭১ সালের পরবর্তী সময়ে প্রত্যেক বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে ২০২১ সালের স্বাধীনতা দিবস একটু ভিন্নমাত্রায় পালিত হয়; কারণ ৫০ বছর পূর্তি উৎসব হিসেবে এবার স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করে বাংলাদেশের নাগরিকরা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশের কাঠামো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের আলোচনা প্রধান আলোচিত বিষয় হিসেবে স্থান লাভ করবে। একটা দেশ তখনই উন্নত হয় যখন সে দেশের মানুষ এক হয়ে দেশের জন্য কাজ করে। আর মানুষ তখনই এক হয়ে কাজ করবে যখন দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিলক্ষিত হবে। বাংলাদেশ নামক অতিক্ষুদ্র দেশের ক্ষেত্রে উন্নয়ন নামটা যেন বেমানান ছিল। অর্থাৎ যে দেশের মানুষ তিন বেলা খেতে পারত না, তাদের আবার উন্নয়ন কী?
১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিক্সন প্রশাসনের অন্যতম উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার তাই তো বাংলাদেশকে কটাক্ষ করে বলেছিল তলাবিহীন ঝুড়ি। কিসিঞ্জারের এই বক্তব্যের ৪৭ বছর পর আজকের বাংলাদেশ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, কারণ বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশীল একটি দেশ। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাঙালির মুক্তির দূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর বাঙালিরা নিজেদের মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার নিজের দেশে ফিরে আসেন এবং দেশগড়ার কাজে হাত দেন। কিন্তু তিনি শাসনভার গ্রহণ করার পর দেখতে পান দেশের অবস্থা নাজুক। এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোসম্পন্ন দেশকে স্বাবলম্বী করার জন্য তিনি দেশের জনসাধারণকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। এবং এই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে মুক্তিলাভের জন্য তিনি বহির্বিশ্বের স্বীকৃতি লাভের দিকে মনোনিবেশ করেন, যাতে ওইসব দেশ থেকে সাহায্য লাভ করা যায়। বঙ্গবন্ধুর এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এরপর নানান উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আজকের এই বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং দীর্ঘ ৫০ বছর পর ২০২১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ৫০ বছর আগে যিনি সোনার বাংলা গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন, তারই দল এবং সেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবকিছু ভুলে দেশগড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে। তারই ফলে আমরা দেশে কাঠামোগত উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইত্যাদি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনামূলক আলোচনা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানে তা ৩৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশে। এছাড়া ১৯৭২ সালে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলারে। ২০০১ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং হতদরিদ্রের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ ভাগ এবং হতদরিদ্রের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। কিছুদিন আগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে ২০৩১ সালের মধ্যে অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ৩৫তম। এ তো গেল শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনা, এছাড়া বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। দেশের ৪ হাজার ৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, যার ফলে শহর ও গ্রামে সমানভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়ে এখন প্রযুক্তির ব্যবহার অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে, হোক না সেটা শহর বা গ্রাম। বর্তমানে দেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ১২ কোটি ৩৭ লাখ এবং ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ৪৬ লাখ। বাংলাদেশে আইটি উদ্যোক্তা রয়েছেন ১০ হাজার আর ১৩ লাখ আইটি পেশাজীবী। ফলে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের মানদণ্ড অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে একটি দেশকে তিনটি সূচক পূরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার মানে অনেক বেশি। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন, বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯ পয়েন্ট। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম, বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ। তাই এই তিনটি সূচকের মান অর্জন করেছে বাংলাদেশ, সিডিপিও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় একটি পাওয়া। এছাড়া বাংলাদেশ চলতি বছর মধ্যমআয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আসুন, বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য অর্জনে ব্যক্তিপর্যায়ে সাহায্য করি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।
জাফরুল ইসলাম
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়





