ঘুর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ৩ দিন ধরে লঞ্চ এবং ২ দিন ধরে ফেরিসহ সব ধরণের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে করে উভয় পাড়ে সহস্রাধিক যানবাহন ও অসংখ্য যাত্রী আটকা পড়ে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
বিআইডব্লিউটিসি ও অন্যান্য সুত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরের পর থেকে ঘুর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট এলাকায় পদ্মা-যমুনা নদী উত্তাল হয়ে ওঠে। বড় বড় ঢেউ, তীব্র বাতাস ও বৃষ্টির কারণে নৌ চলাচল ঝুকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় দুপুর ২ টার দিকে দুর্ঘটনা এড়াতে রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় কতৃপক্ষ।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ও আরিচা-কাজীর হাট রুটের লঞ্চ চলাচল । শনিবার বিকেল ৫টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এখানকার নৌরুটে কোনো ধরণের নৌ-যান চলাচল শুরু হয়নি।
শনিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, দেশের ব্যাস্ততম এ নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় চরম দূর্ভোগে পড়েছেন নদী পার হতে আসা অসংখ্য যাত্রী ও যানবাহনের চালকরা। দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় নদী পারের অপেক্ষায় প্রায় ৫ কিলোমিটার জুড়ে মহাসড়কে আটকা আছে অন্তত ছয় শতাধিক বিভিন্ন যানবাহন। এর মধ্যে প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে ২ সারিতে এবং ২ কিলোমিটার জুড়ে ১ সারিতে যানবাহনগুলো স্থির দাঁড়িয়ে আছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে যানবাহনের সিরিয়াল। পাটুরিয়া ঘাটেও একই ভাবে প্রায় পাঁচ শতাধিক যানবাহন আটকা থাকার খবর নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। আটকে থাকা যাত্রীরা দিনভর বৃষ্টির মধ্যে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রাকৃতিক কর্মে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এ অবস্থায় বহু যাত্রী ঘাট থেকে জনপ্রতি ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া মিটিয়ে কুষ্টিয়ার লালন শাহ ও যমুনা সেতু ঘুরে ঢাকা উদ্দেশ্যে রওনা দিতে দেখা যায়। অনেকেই আর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিতে দেখা যায়।
এদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে অনেক যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে নদী পার হচ্ছেন। পুলিশী তৎপরতা থাকলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক ট্রলার চালক দিনভর সুযোগ বুঝে উত্তাল পদ্মা-যমুনায় যাত্রী পারাপার করছেন। এ ক্ষেত্রে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। সাধারণ সময় ট্রলার ভাড়া যাত্রী প্রতি ৩০ টাকা।
গোয়ালন্দের অম্বলপুর এলাকার ইউনুস হোসেন জানান, তিনি ছেলেকে নিয়ে ঢাকার উদ্যেশ্যে বেরিয়েছেন। রোববার সকাল ৯টায় ছেলের কলেজের ব্যবহারিক পরীক্ষা। আজকের মধ্যে যেতেই হবে। তাই উপায় না পেয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ২ জনে ১ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ট্রলারে নদী পার হয়েছি।
দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় দেখা যায়, ইজাত শেখ নামের এক ট্রলার চালক নৌ-পুলিশের কনস্টেবল রুহিদাস ও মতিয়ার রহমানের নিষেধ উপেক্ষা করে ঘাট ছেড়ে যান। তার আগেই যাত্রীরা চ্যানেলের বাইরে নদীর পাড়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এভাবে দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রী পারের অপরাধে পাটুরিয়ার নৌ-পুলিশ দৌলতদিয়ার ইছাক শেখ নামের ট্রলার চালকের ট্রলারের তলা ফাটিয়ে মাঝ নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
দৌলতদিয়ার ১নং ফেরি ঘাটের মুখে আটকে থাকা বাসযাত্রী চুয়াডাঙ্গার হাবিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জের মো. রাসেদ, যশোরের মোছা. জরিণা বেগম, মহারাণীসহ অনেকেই জানান, ২ দিন ধরে বাসের মধ্যে বসে থেকে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। হোটেলের অস্বাস্থ্যকর খাবার দ্বিগুণ দামে কিনে খেতে হচ্ছে। অনেকের খাবার পয়সাও শেষ। প্রসাব পায়খানায় খুব কষ্ট হচ্ছে। অনেকের ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়াতে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। এমনকি হাত খরচের জন্য বিকাশেও টাকা আনতে পারছে না।
বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা অঞ্চলের পোর্ট অফিসার সেলিম রেজা জানান, আবহাওয়া খারাপ থাকায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ও আরিচা-কাজীর হাট রুটে চলাচলকারী সকল (৩৪টি) লঞ্চ এবং ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আমাদের উপর যাত্রীদের প্রচন্ড চাপ থাকলেও মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে আমরা লঞ্চ-ফেরি চালু করতে পারছি না।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার বেলা পৌনে ৪টার দিকে সংক্ষিপ্ত আকারে ইউটিলিটি ফেরি চালু করলেও রুটের ১৫টি ফেরির মধ্যে পাটুরিয়া ঘাটে ১০টি ও দৌলতদিয়া ঘাটে ৫টি যাত্রী যানবাহন বোঝাই করে বসে আছে। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় নদী পারের অপেক্ষায় সিরিয়ালে রয়েছে প্রায় ৪ শতাধিক যানবাহন। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পুনরায় ফেরি চলাচল শুরু হবে।





