আপডেট : ২৩ April ২০১৯
প্রথমেই তালাক সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাটি শুধরে নিই। মুখে মুখে তিনবার ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করলে বা একসঙ্গে ‘বায়েন তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করলে তালাক কার্যকর হয় না। এমনকি মুখে উচ্চারণ ছাড়া লিখিতভাবে তালাক দিলেও তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না। এর মধ্যে রয়েছে সালিশি পরিষদের বিরাট ভূমিকা। সম্প্রতি বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তান হেফাজত ও দেনমোহরের মতো বিষয়ে জটিলতা এড়াতে সালিশ পরিষদের (আরবিট্রেশন কাউন্সিল) কার্যকারিতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এ-সংক্রান্ত এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৫ এপ্রিল ২০১৯ বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেন। রুলে পবিত্র কোরআন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও আইন অনুসারে বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর পরিশোধ ও সন্তানের হেফাজতের বিষয় নিষ্পত্তিতে এ-সংক্রান্ত সালিশ পরিষদের ভূমিকা নিশ্চিতে একটি নীতিমালা করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণ-পোষণসহ আনুষঙ্গিক পাওনা নিষ্পত্তিতে সালিশি পরিষদের ভূমিকা বাধ্যতামূলক করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে। এবার আসল কথায় আসি, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে বলা হয়েছে, তালাক যেভাবেই হোক না কেন, তালাক দিতে চাইলে যে কোনো পদ্ধতির তালাক ঘোষণার পর অপর পক্ষ যে এলাকায় বসবাস করছেন, সে এলাকার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান/পৌর মেয়র/সিটি করপোরেশন মেয়রকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ দিতে হবে। সেই সঙ্গে তালাক গ্রহীতাকে উক্ত নোটিশের নকল প্রদান করতে হবে। চেয়ারম্যান/মেয়র নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে নব্বই দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো তালাক বলবৎ হবে না। কারণ নোটিশ প্রাপ্তির ত্রিশ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান/মেয়র সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপস বা সমঝোতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সালিশি পরিষদ গঠন করবে এবং উক্ত সালিশি পরিষদ এ-জাতীয় সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই অবলম্বন করবে। তবে সমঝোতার ৯০ দিন সময় চেয়ারম্যান কর্তৃক নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে শুরু হয়। তালাক দেওয়া বা নোটিশ লেখার তারিখ থেকে শুরু হয় না। (শফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র, ৪৬ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৭০০)। সালিশি পরিষদ ৯০ দিন সময় পেয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রতি ৩০ দিনে একটি করে মোট তিনটি নোটিশ দেবে। এ সময় যদি স্বামী-স্ত্রী মনে করেন তাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির কারণে তালাকের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সে ক্ষেত্রে তারা সমঝোতা করে তালাক প্রত্যাহার করে নিয়ে পুনরায় সংসার করতে পারেন। এ জন্য নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাতে হয়, আমাদের দেশের অধিকাংশ সালিশি পরিষদ অনেক সময় ডাকে না এবং অনেকে যানও না। এমনকি এ আইন সম্পর্কে অবগতও নন। এতে করে তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তবে এর সঙ্গে দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ ও সন্তান থাকলে তাদের জিম্মায় নেওয়ার বিষয়ও থাকে। যে কারণে তালাক কার্যকরের পরে এসব বিষয় নিয়ে মামলা হয়, যা নিষ্পত্তিতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই পবিত্র কোরআনের মর্মবাণী, আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও আইন অনুসারে সালিশি পরিষদ কার্যকর করতে এবং এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশনা চেয়ে করা রিটটিতে আদালত ওই রুল দেন। গত বছরের ২৭ আগস্ট ‘ঢাকায় ঘণ্টায় এক তালাক’ শিরোনামে প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। এটি যুক্ত করে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে সাধারণ সম্পাদিকা সীমা জহুর ও আইনজীবী কাজী মারুফুল আলম ওই রিটটি করেন, যার ওপর শুনানি শেষে আদালত ওই আদেশ দেন। এবার আসা যাক তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণ-পোষণ নিয়ে সালিশি পরিষদের ভূমিকা বিষয়ে। মো. হেফজুর রহমান বনাম ছামছুর নাহার বেগ এবং অন্যান্য (১৯৯৫) ১৫ বিএলডি, পৃষ্ঠা-৩৪ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের একটি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, তালাক দেওয়ার পরও তার তালাকপ্রাপ্ত উক্ত স্ত্রীর পুনঃবিবাহ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য যৌক্তিক পরিমাণ অঙ্কের ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। তবে এ প্রসঙ্গে আপিল বিভাগ ১৯ বিএলডি পৃষ্ঠা-২৭ মামলার সিদ্ধান্তে বলেছেন, গর্ভাবস্থায় একজন তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীলোকের জন্য পরিষ্কার নির্দেশনা হলো, তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সে ভরণ-পোষণ পাবে। আরেকটি মামলা রশিদ আহমেদ বনাম আনিছা খাতুন (১৯৩২) ৫৯ ইন্ডিয়ান আপিলস, পৃষ্ঠা ২১-এ বলছেন, ইদ্দতকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত যদি তালাকের বিষয় স্ত্রীকে অবহিত করা না হয়, সেক্ষেত্রে তালাকের বিষয় অবহিত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী ভরণ-পোষণ পেতে অধিকারিণী। এ বিষয়গুলোর সুরাহার দায়িত্ব সালিশি পরিষদের। দেনমোহর বিষয়ে বলা আছে, স্ত্রী যদি স্বামীকে আগে তালাক দেন সে ক্ষেত্রেও অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রী যিনিই তালাক দিন না কেন, দেনমোহরের টাকা অবশ্যই স্ত্রীকে দিতে হবে। তবে বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌনমিলন না হয়ে থাকলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী অর্ধেক পরিমাণ দেনমোহর পেতে অধিকারিণী। (তাজবি বনাম নাতার শেরিফ, ১৯৪০, ২ এমএলজে, পৃষ্ঠা-৩৪৫)। দেনমোহর দুই ধরনের। একটি তাৎক্ষণিক দেনমোহর, যা স্ত্রীর চাওয়ামাত্র পরিশোধ করতে হবে। আরেকটি হচ্ছে বিলম্বিত দেনমোহর। বিলম্বিত দেনমোহর বিবাহবিচ্ছেদ অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া স্বামী সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীকে বিলম্বিত দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। বিচ্ছেদের পর সন্তানদের আইনগত অবস্থান কী হবে, তারা কার কাছে থাকবে, কে বহন করবে তাদের ভরণ-পোষণ- এ নিয়ে সালিশি পরিষদের এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম আইন অনুযায়ী, পিতাই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আইনগত অভিভাবক আর মা হচ্ছেন সন্তানের জিম্মাদার। বিচ্ছেদ হলেও মা তার সন্তানের তত্ত্বাবধান করার ক্ষমতা হারান না। ছেলের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তানের বয়ঃসন্ধি বয়স পর্যন্ত মা সন্তানদের নিজের কাছে রাখতে পারবেন। সন্তানের মঙ্গলের জন্য যদি সন্তানকে মায়ের তত্ত্বাবধানে রাখার আরো প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে এ বয়সসীমার পরও মা সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারবেন। তবে এজন্য ক্ষেত্রবিশেষে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। তবে মা যদি দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে সন্তানকে নিজের হেফাজতে রাখার ক্ষমতা হারাতে হতে পারে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, ১৬ ডিএলআরে জোহরা বেগম বনাম মাইমুনা খাতুন মামলায় আদালত বলেন, নিষিদ্ধ স্তরের বাইরে মায়ের বিয়ে হলেই মায়ের কাছ থেকে হেফাজতের অধিকার চলে যাবে না। মা যদি তার নতুন সংসারে সন্তানকে হেফাজতে রাখতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাকে সন্তানের জিম্মাদারি দিতে কোনো সমস্যা নেই। তবে যদি আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান মায়ের হেফাজতে থাকলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে, সন্তানের কল্যাণ হবে এবং স্বার্থ রক্ষা হবে- সেক্ষেত্রে আদালত মাকে ওই বয়সের পরেও সন্তানের জিম্মাদার নিয়োগ করতে পারেন। আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এসএমএ বকর ৩৮ ডিএলআরের মামলায় এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিচ্ছেদের পর সন্তান যদি মায়ের কাছেও থাকে, তবে সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বাবার। অর্থাৎ মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হলে কিংবা মা-বাবা আলাদা বসবাস করলে বাবাকেই সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিয়ে যেতে হবে। ইচ্ছে করলে মা আলাদা থেকেও বিবাহবিচ্ছেদ হোক বা না হোক, সন্তানের ভরণ-পোষণ আদায় করার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করে ভরণ-পোষণের অধিকার আদায় করতে পারেন। প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা একটি ইতিবাচক সংবাদের অপেক্ষায় থাকি। যেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার পাতায় দেখতে পাবো তালাক ইস্যুতে সালিশি পরিষদের কার্যকারিতা সফলতা পেয়েছে। লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ংবৎধল.ঢ়ৎধসধহরশ—মসধরষ.পড়স
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১