আপডেট : ২২ November ২০১৯
এমন একটা সময় ছিল, যখন আমাদের পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকত অনেক নীতিবাক্য। এর একটি যেমন ‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ এসব এখন আর সেভাবে পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে সেভাবে পড়ানোও হয় না শিক্ষার্থীদের। এমনকি অনেক শিক্ষকও জানেন না এমন নীতিবাক্যের কথা। জানলেও পড়ানোর প্রয়োজন মনে করেন না। কারণ কেউ কেউ এখন নীতি আর মূল্যবোধের ধার ধারেন না। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের সমাজব্যবস্থায়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জীবনে। কিন্তু বাস্তবতা হলো একটা রাষ্ট্রের জন্য শিশু-কিশোর হলো আগামীর সম্পদ। তাদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হয় উজ্জ্বল। কারণ তারাই দেশকে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে। তাদের নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় আমাদের মারাত্মকভাবে ভাবিয়ে তুলছে। বিষয়টি কিশোর অপরাধের। বর্তমানে আমাদের দেশে কিশোর অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে কয়েক শ কিশোর অপরাধী গ্রেপ্তারের ঘটনা আমাদের নতুন করে শঙ্কায় ফেলেছে। পাশাপাশি কিছু প্রশ্নেরও সম্মুখীন করছে সবাইকে। কারণ এর সঙ্গে দায়-দায়িত্বের বিষয়গুলোও জড়িত। বিশেষ করে সমাজে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা; জন্ম দিচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধের। এটা আমাদের সমাজব্যবস্থার জন্য নতুন না হলেও কিশোর অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা; কোনো সন্দেহ নেই নতুন করে উদ্বেগের। সম্প্রতি দেশে কয়েকটি ঘটনা এর বড় উদাহরণ। বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে, মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই অনেক কিশোর জড়িয়ে পড়ছে অপরাধীচক্রের সঙ্গে। ইভ টিজিং, ছিনতাই যেন এখন তাদের কাছে মামুলি বিষয়। অবশ্য এসব দিয়ে হচ্ছে তাদের হাতেঘড়ি। এরপর তারা আরো বড় অপরাধ, মানে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। অবশ্য এটা তারা একা করছে না, বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে অর্থের বিনিময়ে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। কখনো সহপাঠীকে অপহরণ করে পরিবারের কাছে দাবি করছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। না দিলে তাদের হত্যা করতে কাঁপছে না এসব কিশোরের হাত। এমনকি ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনায়ও জড়াচ্ছে তারা। বর্তমানে বিভিন্ন নামে কিশোররা গ্যাং গ্রুপ তৈরি করছে। লাড়া দে, ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, ফিফটিন, ব্ল্যাক রোজ, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপারসহ এ রকম শতাধিক নামের গ্যাং গ্রুপের কয়েক হাজার কিশোর এখন গোটা রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে প্রায় ৮০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। কিশোর অপরাধের এমন ঘটনা আমাদের প্রতিনিয়ত করছে উদ্বিগ্ন। একটি তথ্য এই উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দেয়। তা হলো কিশোর অপরাধসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি। প্রতি বছর সারা দেশে কিশোর অপরাধসংক্রান্ত মামলা হচ্ছে পাঁচ শতাধিক। পরিসংখ্যান দিচ্ছে আরো দুঃসংবাদ। কারণ এই সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে। মামলার সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিশোরদের অপরাধের ধরনে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আমাদের সমাজে কেন কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে? কেনই বা কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। এর অনুসন্ধানে দেখা যায় একটি বা দুটি কারণে এমনটি হচ্ছে না। এর নেপথ্যে রয়েছে নানা কারণ। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া রয়েছে পরিবারের অসচেতনতা। সঙ্গে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার দীনতাও। এমন একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরা, ভালো বন্ধুদের সঙ্গে মেশা, স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করার মতো বিষয়ে ছিল কড়াকড়ি। অভিভাবকদের এ বিষয়ে ছিল সতর্ক দৃষ্টি। এমনকি স্থানীয় মুরুব্বিদেরও ছিল শাসনের অধিকার। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। শহরে কে কার প্রতিবেশী তা আমরা নিজেরাই জানি না। ফলে পরস্পরের সঙ্গে সেভাবে সংযোগ গড়ে উঠছে না। আমরা এখন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। শুধু শহর নয়, গ্রামেও একই চিত্র বিদ্যমান। এসব বিষয় কিশোরের অপরাধী হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বাস্তবতা হলো প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন পরিবারের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চলতে চায়। সেটাই কিশোর সময়। এটাই জীবনের প্রবণতা। আর তখনই প্রয়োজন পড়ে তাদের চোখে চোখে রাখা। আগে যেটা সহজ ছিল সেটা এখন প্রযুক্তি উৎকর্ষে আরো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে ভালোমন্দের বিচার করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং নানা প্রলোভন তাদের ভুল পথে পরিচালিত করছে। আগে স্কুলেরও একটা প্রভাব ছিল। শিক্ষকরা অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু সেদিন যেন এখন অতীত। এই সুযোগে বর্তমানের কিশোররা ভুলে যায় স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার কথা। নিজেদের ইচ্ছেমতো যা কিছু করাকে ফ্যাশন মনে করে তারা। যেন এটাই আধুনিকতার স্টাইল। এখানে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায় অবশ্যই পরিবার বা অভিভাবকদের। কারণ পরিবার সচেতন হলেই সন্তানের পথ হারানোর সম্ভাবনা সিংহভাগ কমে যাবে। কেননা শিশুর সামাজিক জীবনের ভিত পরিবার থেকেই তৈরি হয়। তাই তাদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। জীবনের প্রারম্ভে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার দায় তাই পরিবারকেই নিতে হবে। কারণ একজন কিশোরের অপরাধ বন্ধ করার জন্য নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধের শুরুটা করতে হয় মা-বাবাকে। তারা যদি ব্যর্থ হন তবে তার সন্তান বিপথে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। এছাড়া রয়েছে কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতাও। এমন একটা সময় ছিল যখন সারা বছরই এলাকাভিত্তিক সামাজিক কর্মকাণ্ড হতো। কিন্তু এখন তেমন হয় না বললেই চলে। আগের মতো হয় না সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। শিশু-কিশোরদের জন্য নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠও। সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান ও খেলাধুলা করতে না পারার কারণে কিশোররা সাইবার জগতে বুঁদ হচ্ছে। এখন দিনের অধিকাংশ সময়জুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত রাখছে নিজেকে। এখন কিশোররা বইপত্রের চেয়ে বিশেষ করে মোবাইল, ফেসবুক ও ইউটিউবে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে। অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দেখা দিচ্ছে বিরূপ প্রভাব। বিশেষ করে কুরুচিকর সাইটে ঢুকে অনৈতিক বিষয়ে অভ্যস্ত হচ্ছে। এসব তাদের মানসিকতাকে বিক্ষিপ্ত করছে। তারা সহজেই বিপথগামী হচ্ছে। মাদকদ্রব্য সব অপরাধের মূল চালিকা শক্তি। আমাদের সমাজব্যবস্থায় মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্তিও কিশোর অপরাধের উৎপত্তির প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মাদকদ্রব্য কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ মাদকাসক্ত ব্যক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এতে তাদের মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয় ঘটে। কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির জন্য আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ী। কারণ এ ক্ষেত্রে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাও। কারণ সামাজিক পরিবেশে পরিবারের ভূমিকার পরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব শিশু-কিশোরদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পায়। কারণ দিনের একটি বড় সময় তারা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটান। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এসব সচেতনতার বিষয়গুলো প্রায় অনুপস্থিত। বিশেষ করে শিক্ষকের বিষয়জ্ঞান, সততা, আন্তরিকতা, ছাত্র শিক্ষকের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, ছাত্রছাত্রীর নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চেতনা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। বরং শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে সম্পর্কের ঘাটতি দৃশ্যত বিদ্যমান। আগে যেটা ছিল অন্য রকম। শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। এখন যা অনেকটা অনুপস্থিত। এখন ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সঙ্গে সেভাবে মেশে না। কৃত্রিম দূরত্ব রক্ষা করে চলে দুই পক্ষই। তাই এ ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারও রয়েছে বাড়তি কিছু দায়িত্ব। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এছাড়া দায়িত্ব আছে প্রশাসন ও মিডিয়াসহ প্রত্যেকে সচেতন নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠানের। সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে কিশোরদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে তাকে, তবে অনেকাংশে কমে যাবে কিশোর অপরাধ। লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১