বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২০ December ২০১৯

এতিমের অধিকার


ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের ধর্ম। এই ধর্মের মহান শিক্ষা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের অধিকারী হলে নিজের ও পরিবারের পাশাপাশি সমাজের দায়িত্বও পালন করতে হবে। দয়া ও ভালোবাসার ধর্ম ইসলাম মানবহূদয়ে আশার প্রদীপ প্রজ্বালন করে; অসহায়ের দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করে। এতিমের অধিকার সম্পর্কে লিখেছেন সৈয়দা রাকীবা ঐশী

 

এতিম

এতিম শব্দের অর্থ নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ। বাংলা অভিধান অনুযায়ী, মাতা-পিতাহীন বালক-বালিকাকে এতিম বলা হয়। ইসলামী পরিভাষায়, যে শিশুর পিতা ইন্তেকাল করেছেন, শুধু তাকে এতিম বলা হয়। পিতা উপস্থিত থাকা অবস্থায় মাতাবিহীন শিশুকে ইসলামী পরিভাষায় এতিম বলা হয় না। কেননা সন্তানের লালন-পালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব পিতার। তাই শিশুকে তখনই নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ ধরা হবে, যখন পিতা থাকবে না। মাতার অবর্তমানেও এই দায়িত্বভার পিতার ওপর অর্পিত। তাই মাতাবিহীন শিশু নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ নয়। আর সন্তান যখন বালেগ হয়ে যায়, তখন তাকে এতিম বলা হয় না। কেননা সে তখন স্বনির্ভর। এতিম সম্পর্কে ইসলাম শুধু নৈতিক নির্দেশনামা দেয়নি; এতিমের প্রশাসনিক ও আইনগত অধিকারের ভিত্তিও দাঁড় করিয়েছে। হাদিস ও ফিকহের কিতাবে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

 

কোরআনে এতিমের মর্যাদা

এতিমের দায়িত্ব গ্রহণে মর্যাদা ও নির্দেশনা সম্পর্কিত একাধিক আয়াত রয়েছে পবিত্র কোরআনে। এক আয়াতে এসেছে, ‘তারা তোমাকে এতিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, তাদের ইসলাহ তথা সুব্যবস্থা (পুনর্বাসন) করা উত্তম...।’ (বাকারা : ২২০)। অর্থাৎ আপনি যদি তাদের উন্নয়নে কল্যাণমূলক কিছু করতে চান, তাহলে তাদের ইসলাহ তথা সার্বিক দেখভালের সুব্যবস্থা করুন।

যারা এতিমের প্রতি অবিচার করে, আল্লাহতায়ালা তাদের ভর্ৎসনা করে বলেন, ‘অসম্ভব, (কখনোই নয়) বরং তোমরা এতিমের সম্মান রক্ষা করো না।’ (ফজর : ১৭) মক্কার কুরাইশরা এতিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করত। বাবা মারা গেলে চাচা এসে ভাতিজার সমুদয় সম্পদ আত্মসাৎ করে নিজ উদরে হজম করে ফেলত। আল্লাহতায়ালা তাদের এই মন্দ কর্ম নিষিদ্ধ করেন। ইসলামে এতিম ও অনাথকে ধমক দেওয়াও নিষিদ্ধ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ (দুহা : ৯)।

এতিমদের প্রতিপালন, তাদের পুনর্বাসন ইত্যাদি হতে হবে নিঃস্বার্থ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও (আল্লাহর ভালোবাসায়) অভাবী, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। (এবং তারা বলে) শুধু আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের আহার্য দান করি। বিনিময়ে তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান চাই না।’ (দাহর : ৮-৯)।

 

হাদিসে এতিমের মর্যাদা

এতিমের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, বিধবা, এতিম ও গরিবের সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে মুজাহিদের সমতুল্য। অথবা তার মর্যাদা সেই (নামাজের জন্য) রাত জাগরণকারীর মতো, যে কখনো ক্লান্ত হয় না। অথবা তার মর্যাদা সেই রোজাদারের মতো, যে কখনো ইফতার (রোজা ভঙ্গ) করে না। (মুসলিম) ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমের প্রতিপালন জান্নাতে যাওয়ার উপায়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো এতিমকে আপন মাতা-পিতার সঙ্গে নিজেদের (পারিবারিক) খাবারের আয়োজনে বসায় এবং (তাকে এই পরিমাণ আহার্য দান করে যে) সে পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, বিশ্বনবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম, যে বাড়িতে এতিম আছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি, যে বাড়িতে এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। অতঃপর তিনি তার অঙ্গুলির মাধ্যমে বলেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করব।’ (ইবনে মাজাহ)।

 

এতিমের ১০টি অধিকার

ইসলাম এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে; বিশেষ করে এতিম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি ১০টি অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

১. এতিমের সম্পদ গ্রাস করা গর্হিত অপরাধ।

২. এতিমের ওপর জোরজবরদস্তি করা নিষিদ্ধ।

৩. এতিমের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।

৪. এতিমের সঙ্গে দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ।

৫. এতিমের খাদ্যের অধিকার।

৬. নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের অধিকার।

৭. বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি সংরক্ষণ।

৮. ইহসান বা ভালো ব্যবহারের অধিকার।

৯. ইনসাফ বা ন্যায়সঙ্গত বিচারের অধিকার।

১০. মালে ফাঈ বা যে সম্পদ কাফিরদের সঙ্গে বিনা যুদ্ধে মুসলিমদের হস্তগত হয় (যেমন— খারাজ, জিজিয়া ইত্যাদি), তার ওপর অধিকার।

 

এতিমদের জন্য যা করা যেতে পারে

আমরা এতিমদের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের জীবনযাত্রার সুব্যবস্থা করে সমাজে অবদান রাখতে পারি। এই কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য বড় সংস্থা-সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। আমরা তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে পারি। বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি। তাদের মধ্যে যারা মেধাবী, যাদের সৃজনশীল ক্ষমতা আছে, তাদের জন্য আলাদা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আমাদের এসব কর্মতৎপরতা তাদের হূদয়ে প্রভাব সৃষ্টি করবে। তবে লক্ষণীয় যে, এসব কাজ এমন আন্তরিকতার সঙ্গে করতে হবে, যেন আমাদের হূদয়ে তার পিতৃহীনতার বিষয়টি অনুভূত না হয়।

সারা দেশে ছিন্নমূল মা-বাবা হারা অগণিত এতিম ও অসংখ্য এতিমখানা রয়েছে। এই এতিমদের চলাফেরা ও যাতায়াতের সুবিধার্থে সব ধরনের গাড়িভাড়া মওকুফের জন্য সুব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন বা সরকারি যানবাহন বাস, নৌযান, রেলগাড়ি প্রভৃতি যন্ত্রচালিত গাড়িতে এতিমদের চলাচলের ক্ষেত্রে ভাড়া মওকুফ করা যেতে পারে।

সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুরা নানা প্রতিকূলতার মাঝে বেড়ে ওঠে। এতিম, অনাথ, সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুরা এক ধরনের প্রতিহিংসা নিয়ে বেড়ে ওঠে। মানুষ খাবার খাচ্ছে, কিন্তু সে পাচ্ছে না— এই চিন্তা হিংসার জন্ম দেয়। অন্যদের জন্য বস্ত্র আছে, শীত নিবারণের উপকরণ আছে, কিন্তু তার নেই— এই চিন্তা প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। এতে এসব শিশুর আচরণ বিকৃত হয়ে যায়। ফলে তারা কাউকে সহজে বিশ্বাস করে না। তাদের মধ্যে ধ্বংসাত্মক কাজে আগ্রহ জন্মে। তাই এদের পক্ষে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই ও মমতাহীন কাজ করা খুবই সহজ। তাদের থেকেই হয়তো গড়ে উঠেছে মুরগি মিলন, টোকাই সাগরসহ বড় বড় সন্ত্রাসী।

এতিম, অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়ে। এসব শিশুদের হোমে প্রেরণের আগেই তাদের মাদকাসক্তি চিকিৎসা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এতিম, অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিশুকে জন্ম নিবন্ধন, শিশুর অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে আইনি বাধাগুলো অপসারণ করা সময়ের দাবি।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১