বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ৩০ March ২০২০

করোনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের আহ্বান

বিশ্বে মৃত ৩০ হাজার ৮৮২, স্পেনে এক রাতে ৮৩৮ মৃত্যু


করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্স চার্লস। মারা গেছেন স্পেনের রাজকুমারী মারিয়া টেরেসার। আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যঙ্গেলা মেরকেল। শীত গেলেই পালাবে বলে বড়াই করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা নিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। হোয়াইট হাউজের এক কর্মী করোনা আক্রান্ত। দেশটিতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৭৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ২২৯ জনের। ইতালিতে প্রতিদিনই প্রায় হাজার খানেক মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় তাদের জানা নেই। একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই পারেন মুক্তি দিতে। ব্যাপক ছোঁয়াচে এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে ইউরোপ। বিশ্বের সব দেশেই হানা দিয়েছে এই মহামারী করোনা। যেসব দেশের নাম এখনো আক্রান্তের তালিকায় নেই, সেসব দেশে রোগ নির্ণয় করার মতো কিট নেই। তাই তারা বলতে পারছে না কতজন আক্রান্ত হয়েছে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়।  দেশটি এখন প্রায় ভাইরাসমুক্ত বলা যায়। কিন্তু যেভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে উহানে যদি নতুন করে এর সংক্রমণ শুরু হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এটা এমনই এক ভাইরাস যার বিরুদ্ধে কারো একার পক্ষে লড়াই করে বাঁচা সম্ভব নয়। এক দেশ মুক্ত তো অন্য দেশ তাতে আক্রান্ত। এভাবে চক্রাকারে ভাইরাসটি বিশ্বের বুকে ঘুরতেই থাকবে। ফলে জনশূন্য হয়ে যেতে পারে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর এমনকি কোনো কোনো দেশও। তাই এর বিরুদ্ধে বিশ্বকে এক হয়ে লড়তে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতা, নিজের শক্তি প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের নেশায় মানুষ ভুলে গিয়েছিল ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’। করোনা ভাইরাস আমাদের নতুন করে বিষয়টা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলেছে। তারই এক অনন্য উদাহরণ এক মুসলমান ও ইহুদির একসঙ্গে প্রার্থনা করা। করোনায় আক্রান্তদের সেবা করার কারণে দম ফেলার ফুরসত নেই ইসরাইলের আব্রাহাম মিন্টজ ও জোহর আবু জামার। শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা ৪১ বছর বয়সী এক নারীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বিয়ার শেভার শহর থেকে এনেছেন তারা। এর আগে ৭৭ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তিকে আনতে গিয়েছিলেন তারা। সামনে আরও কাজ বাকি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটা ছয়টা ছুঁইছুঁই। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তারা বের করে নেন প্রার্থনা করার সময়। ইসরাইলের ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম বা জরুরি সেবা সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড আদমের (এমডিএ) এই দুই সদস্য প্রার্থনার জন্য থামলেন। করোনা মহামারী থেকে মুক্তির জন্য দুই ধর্মের দুজন একসঙ্গে প্রার্থনা শুরু করলেন। ইহুদি ধার্মিক আব্রাহাম কাঁধে সাদা-কালো শাল ঝুলিয়ে জেরুজালেমের দিক মুখ করে প্রার্থনা করলেন আর আবু জামা জায়নামাজ বিছিয়ে কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়লেন। করোনা ভাইরাস মহামারীর সময়ে এটি বিশ্ববাসীর জন্য অনুপ্রেরণা। ভিন্ন ধর্মের দুই ব্যক্তির প্রার্থনার ছবিটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

ইনস্টাগ্রামে একজন লিখেছেন, ‘জরুরি উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য আমি গর্বিত। কে কোন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের তাতে কিছু যায় আসে না।’ টুইটারে একজন লিখেছেন, ‘একটাই যুদ্ধ। একটাই জয়। চল একসঙ্গে লড়ি।’ হ্যাঁ আমাদের একসঙ্গে লড়তে হবে। একই কথা বলেছেন, পোপ ফ্রান্সিসও। ইতালিতে প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। চারদিকে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। দেশটি এখন  যেন মৃত্যুপুরী। প্রতিটি ধর্মীয় ও দর্শনীয় স্থান এখন জনমানবহীন। আর এমন অবস্থা দেখে পোপ বলছেন, ‘ইতালি কবে যে এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে তার কোনো ঠিক নেই। চারদিকে ঘন অন্ধকার। শহর, রাস্তাঘাট কোথাও আলো নেই। সব ফাঁকা। বহু মানুষের প্রাণ গিয়েছে। চারদিকে শুধু হতাশা। প্রচণ্ড ভয় করছে, মনে হচ্ছে কোনো আঁধারে হারিয়ে যাচ্ছি আমরা...। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, করোনা ভাইরাস যদি ঝড় হয়, তা হলে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমরা সবাই একই নৌকায় রয়েছি। আমাদের একসঙ্গে লড়তে হবে।’

এর আগে একই কথা বলেছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (হু)। সংস্থাটির মহাপরিচালক  তেদরোস আধানোম গ্যাব্রিয়াসুস বলেন, ‘করোনা থেকে মুক্তির সহজ কোনো পথ নেই। এই মহামারী থেকে বাঁচতে হলে আমাদের লড়াই করতে হবে, একতাবদ্ধ থাকতে হবে এবং আরো সক্রিয় হতে হবে। করোনা  মোকাবিলায় তিনটি বিয়ষ গুরুত্বপূর্ণ- লড়াই, একতা ও সক্রিয়তা বজায় রাখার পাশাপাশি আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকতে হবে। আমরা লড়াই সবে শুরু করেছি। করোনার টিকা পেতে এখনো ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে আক্রান্তদের জন্য ও মানুষের জীবন বাঁচাতে চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন।’

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে গতকাল রোববার পর্যন্ত দুনিয়াজুড়ে মৃতের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওমিটার। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মহামারীতে এ পর্যন্ত  ১৯৯টি দেশ ও অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৭১। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৮৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৬১ জন।

উৎপত্তিস্থল চীনের বাইরে প্রকোপ ১৩ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ১১ মার্চ দুনিয়াজুড়ে মহামারী ঘোষণা করে হু।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ২২৭ জনের। তবে মৃতের হিসাবে শীর্ষে রয়েছে ইতালি। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ২৩। আর আক্রান্ত ৯২ হাজার ৪৭২ জন। মৃতের হিসাবে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্পেন। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ৯৮২। মোট আক্রান্ত ৭৩ হাজার ২৩৫ জন। এরপর সবচেয়ে বেশি  মৃত্যু হয়েছে চীনে। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮১ হাজার ৪৩৯ জন। এর মধ্যে তিন হাজার ৩০০ জনের মৃত্য হয়েছে। তবে চীনের বিরুদ্ধে প্রকৃত পরিস্থিতি গোপনের অভিযোগ রয়েছে। উহানের একজন স্বেচ্ছাসেবী বলেন, ‘বুদ্ধি-বিবেচনাসম্পন্ন যেকোনো মানুষ এ সংখ্যা (সরকারি পরিসংখ্যান) সন্দেহ প্রকাশ করবে।’

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে: ভাইরাস সংকট আরো খারাপ হবে বলে হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। ব্রিটেনের সব বাড়িতে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে এই হুঁশিয়ারি জানান তিনি। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সেলফ আইসোলেশনে রয়েছেন তিনি। প্রয়োজন হলে আরও কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সরকারি নিয়মের বিস্তারিত ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য বিশিষ্ট লিফলেট বিতরণ করা হবে। এখন পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনার সুস্পষ্ট তথ্য না দেওয়ায় সমালোচিত হয়েছে বরিস সরকার। ব্রিটেনে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৯ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে শনিবার। এ ছাড়া, মোট ১৭ হাজার ৮৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

ইতালিতে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াল: ইতালিতে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ৮৮৯ জন। এর আগে দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চসংখ্যক ৯৭৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৩ জনে। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯২ হাজার ৪৭২ জন। এর মধ্যে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৪ জন সুস্থ হয়েছেন।

স্পেনে আরও ৮৩৮ মৃত্যু: করোনা মহামারীতে ইউরোপে যেন মৃত্যুপুরী! এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় স্পেনে আরও ৮৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। স্পেনে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু।  দেশটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৬ হাজার ৫২৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৫৪৯ জন। এ নিয়ে স্পেনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৮ হাজার ৭৯৭। শনিবার রাতে টেলিভিশনে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘোষণা দেন, ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অত্যাবশ্যকীয় কাজ করেন না, এমন কর্মীদের দুই সপ্তাহের জন্য বাসায় অবস্থান করতে হবে। এ সময় কর্মীরা বেতন পাবেন কিন্তু হারানো কর্মঘণ্টা পুষিয়ে দিতে পরবর্তী সময়ে বেশি সময় কাজ করতে হবে তাদের। ৩০ মার্চ থেকে আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করবেন তারা।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১