আপডেট : ০৫ September ২০২০
প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা মিরসরাইয়ের ঝর্ণাগুলো যেন এখন মৃত্যু কূপে পরিনত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকেই। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝর্ণাগুলোতে নেই প্রশাসনিক কোন নিয়ন্ত্রণ। গত ৫ বছরে ১১জন পর্যটক নিহত ও আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। তবে একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। জানা গেছে, নজরকাড়া পাহাড়ি প্রাকৃতিক ঝর্ণার কারণে মিরসরাইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঝর্ণা দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসছেন। বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামে এসব ঝর্ণায়। উপজেলার নয়স্তর বিশিষ্ট খইয়াছরা, নাপিত্তাছরা, সহস্রধারা, মহামায়া, বাওয়াছরা, রূপসী ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্ণা, হরিণাকুন্ড ঝর্ণা, সোনাইছরি ঝর্ণা নজর কেড়েছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের। তবে ঝর্ণাগুলোতে প্রশাসনের কোন নজরদারী না থাকাতে একেরপর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। তবুও ঝর্ণার পানিতে একটু শরীর ভিজিয়ে নিতে ছুটে যাচ্ছেন শতশত মানুষ। সর্বশেষ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের দশস্তর বিশিষ্ট খইয়াছড়া ঝর্ণার উপর থেকে নীচে পড়ে যান ফয়েজ আহমেদ প্রকাশ খাজু (৩৯)। তিনি ফেনী পৌরসভার বড়াইপুর গ্রামের মো: ইদ্রিসের ছেলে। ফয়েজ আহমেদের বন্ধুরা বলেন, শুক্রবার সকালে ফেনী জেলা থেকে ফয়েজ আহমেদ সহ আমরা ৯ বন্ধু মিলে খইয়াছড়া ঝর্ণায় আসে। ঝর্ণার একদম শেষ ধাপে উঠার পর ফয়েজ আহমেদ পা পিছলে নীচে পড়ে যান। গত বছর ১৫ আগস্ট উপজেলার বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণার কূপে ডুবে নিহত হন মেহেদী হাসান প্রান্ত (২১)। মেহেদী নাটোর জেলার নাটোর উপজেলার জালালাবাদ গ্রামের মো. নুরুল আমিনের ছেলে। তারা চট্টগ্রাম শহরের কর্ণেলহাট প্রশান্তি আবাসিক এলাকায় থাকতো। প্রান্ত চট্টগ্রাম শহরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট টেকনোলজিতে সিভিল ডিপার্টমেন্টের ষষ্ঠ সেমিষ্টারের ছাত্র ছিলেন। মেহেদী হাসানের বন্ধু শাহরিয়ার ইসলাম বলেন, রূপসী ঝর্ণা দেখার জন্য আমরা বৃহস্পতিবার সকালে তারা ৬বন্ধু চট্টগ্রাম শহর থেকে আসি। ঝর্ণায় দ্বিতীয় স্তরে উঠে মেহেদী সহ আরো ২জন উপর থেকে পানিতে লাফ দেয়। এসময় ২জন উঠে গেলেও মেহেদী উঠতে পারেনি। সে মুহূর্তের মধ্যে পানিতে ডুবে যায়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে পানি থেকে তুলতে পারিনি। এভাবে তাকে হারাতে হবে কখনো ভাবিনি। গতবছর ২৬ জুলাই খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেখতে এসে ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে নাম আবু আল হোসাইন মেমোরী (২৯) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। তার বাড়ি বগুড়া জেলার বগুড়া সদর থানায়। সে ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় সেইফটি কনসালটেন্ট বিডি প্রতিষ্ঠানের আর্কিটেকচার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতো। গতবছর ২৮ জুন খৈয়াছড়া ঝর্ণায় আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটক উপর থেকে পড়ে নিহত হয়। সে ফেনী সদরের আব্দুল মজিদের পুত্র। গতবছর ২ এপ্রিল খৈয়াছড়া পাহাড়ি এলাকায় ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে মো. আশরাফ হোসেন (৩০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আশরাফ ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মৃত নাজিম উদ্দিনের সন্তান। গতবছর ১৭ জুলাই মহামায়া লেকের পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয় শাহাদাত হোসেন (২২) নামে এক যুবক। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল ১৯ জুলাই শাহদাতকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। তার বাড়ি মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নে। ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট নয়দুয়ারিয়ার নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। সে ফকিটছড়ি উপজেলার নিরঞ্জন দে’র ছেলে। একই বছরের ২৪ আগস্ট বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণায় উপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। তার বাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া এলাকায়। ওই বছরের ১৫ জুলাই খৈয়াছরা ঝর্ণার সাতটি স্তরের ৫ম স্তরে উঠার পর স্থানীয় এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরতে যায় ওয়াসিম আসগর। ওই পর্যটক সামান্য আঘাত পেলেও ওয়াসিম পাহাড়ের নিচে পড়ে যায়। এতে মারাত্বক আহত হয় সে। ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর উপজেলার নাপিত্তছরা ঝর্ণায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুন (২২) মৃত্যু হয়। সে ফেনী জেলার শৈর্শদী এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে। ১২ জুলাই উপজেলার বোয়ালিয়া ঝরনা দেখতে এসে আটকা পড়ে ১৫ পর্যটক। চারঘণ্টা চেষ্টার পর তাদের উদ্ধার করে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। এছাড়াও ঝর্ণার উপর থেকে পড়ে আহত হয়েছে আরও অর্ধশত। মিরসরাই কলেজের প্রভাষক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, কোন রকম পাহাড়ি ঝিরি পথে চলার ট্রেনিং না নিয়ে ঝর্ণাগুলো দেখতে আসা খুবই বিপদজনক এর জন্যে অবশ্যই ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন আছে। তাছাড়া মিরসরাইয়ের সামাজিক সংগঠনগুলো ঈদের ছুটিতে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিপলেট বিতরণ করতে পারলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) সভাপতি মো. সরওয়ার উদ্দিন বলেন, আমরা পর্যটকদের জন্য সচেতনতা মূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করেছি। খৈয়াছরা, সহস্রধারা, নাপিত্তা ছরা, লবণাক্ষ ছরা, বাওয়া ছরা, কমলদহ ছরা, সোনাই ছরা ঝর্ণা এলাকায় নিরাপদে যাওয়ার জন্য ২০ জন ইকো গাইডকে নিয়োগ দিয়েছি। পর্যটকরা যদি ঝর্ণা এলাকায় যাওয়ার সময় ইকো গাইডদের সাথে নিয়ে যায় তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। খইয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, মূলত দায়িত্বহীনতা ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকে ঝর্ণার উপরে উঠে সেলফি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়। মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর ষ্টেশন অফিসার মো. তানভির আহম্মদ বাংলাদেশের খবরকে, ঝর্নাগুলোতে প্রশাসনের নজর দেয়া প্রয়োজন। পর্যটকদের গাইড দিতে হবে কোন স্থানে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে, কোন স্থানে গেলে নিরাপদ তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে। মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জসীম উদ্দিন বলেন, মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে সৃষ্ট ঝর্ণা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাকারো পর্যটক আসে। ঝর্ণা এলাকাগুলোতে যদি পর্যটন মন্ত্রণালয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে তাহলে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব। এখানে কোন নিরাপত্তা না থাকায় ইতমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা পর্যটন এলাকগুলোতে বিপদনজক স্থান চিহ্নিত করে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শীঘ্রই সর্তকতামূলক সাইনবোর্ড দিবো।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১