আপডেট : ১৬ November ২০২০
প্রকৃতির হিম হিম ভাব আর হাল্কা কুয়াশায় শীতের আগমন বার্তা জানিয়ে ১লা কার্তিক থেকেই শুরু হয়েছে হেমন্তকাল। এক হেমন্তের দুটি রূপ-ঋতুর শুরুতে মরা কার্তিকে অভাব আর ক্ষুধার হাহাকার; আবার শেষে অগ্রহায়ণে ধানের প্রাচুর্য। প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ যথার্থই বলেছেন-‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে/ অলস গেঁয়োর মতো এইখানে-কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার/ চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/ তাহার আস্বাদ পেয়ে পেকে ওঠে ধান’। কবির বর্ণনা যেন প্রকৃতির প্রতিচিত্র। কার্তিক আর অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল। এই হেমন্তের অঘ্রানে কৃষকের ঘরে নতুন আমন ফসল ওঠে। এ কারণে হেমন্তকে বলা হয় নবান্নের ঋতু। আজ পয়লা অগ্রহায়ণ। অঘ্রানে ফসলে মাঠে মাঠে কাঁচা-পাকা অপরূপ দৃশ্য মন কাড়ে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে অঘ্রানের মোহনমায়ার চিত্ররূপকেই উপস্থাপন করেছেন-‘ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা খেতে, (আমি) কি দেখেছি মধুর হাসি। ...’ হেমন্ত আসে ধীরপায়ে শিশিরস্নাত শীতল পরশ আলতো গায়ে মেখে। হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই কৃষিপ্রধান এই বাংলাদেশে সূচনা হয় নবান্ন উৎসব। ঋতুর রানী হেমন্তে নতুন ফসলের মৌ মৌ গন্ধে প্রকৃতিতে প্রশান্তির ভাব চলে আসে। ভোরের কুয়াশায় ফসলের মাঠে, গাছের পাতায়, ঘাসের ডগায় বিন্দু বিন্দু শিশির জমে। নতুন ধানের মৌ গন্ধে ফসলের মাঠে ওড়াউড়ি করে প্রজাপতি, ভ্রমরা আর ঘাসফড়িংয়ের দল। হেমন্তে ফোটে ফুল শিউলি। দোলনচাঁপাও সুবাস ছড়ায় চারিদিকে। নবান্নের ঋতু হেমন্তকে ঘিরে কবি-সাহিত্যিক লিখেছেন গল্প, কবিতা, আর অমর গান। কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন- হেমন্তের অঘ্রানে বাজুক ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে-এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’। সত্যিই কবিতার মতোই সুন্দর নবান্নের চিরায়ত এই বাংলার গ্রামীণ রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’ আবহমান এই বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধতার শুরু মা-মাটি-কৃষি থেকে। হেমন্ত নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুুর ঋতু। তাই বোধ হয় হেমন্তকে অনুভবের ঋতুও বলা হয়। আবার হেমন্তকে মৌন, শীতল বা অন্তর্মুখী ঋতুও বলা যায়। আজ ১লা অগ্রহায়ণ বাদশা আকবরের সময়ে পহেলা অগ্রহায়ণকে (মধ্য নভেম্বর) বাংলা নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সমস্ত দেশ শস্যে ছেয়ে যেত। সে সময়ে বেশ জনপ্রিয় এবং ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন ফসল ছিল আউশ। অগ্রহায়ণের কিছুটা আগে মানে কার্তিক মাসে আউশ শস্যটি রোপণ করা হতো যার ফলে, হেমন্তকাল এসে পৌঁছাতেই শস্যের মাঠ হলুদে ছেয়ে যেত। হলুদ ফসলের মাঠ দেখে কৃষকদের মুখে ফুটে উঠত তৃপ্তির হাসি। এ কারণেই সে সময়টাকে উৎসবে পরিণত করা হলো, নাম দেওয়া হয় ‘নবান্ন উৎসব’। নবান্ন উৎসব মানে ‘নতুন চাল বা অন্নের উৎসব’। এই সময় ধান কেটে শুকিয়ে সিদ্ধ করে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পিঠাপুলি, পায়েস। বাংলার কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায় যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। ‘নবান্ন’ মানে ‘নতুন অন্ন’। বাংলাদেশে নবান্ন শুরু হয় আমন ধান কাটার পর। আমনের নতুন ধানের চালের প্রথম রান্না উপলক্ষকে কেন্দ্র করেই নবান্ন শব্দটির জনপ্রিয়তা। অঘ্রানে নতুন ফসল পাকলে কৃষকরা ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালের এক কোণায় বেঁধে রাখেন। বাকি এই চালের পায়েসে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। এই নতুন চালের পায়েস দিয়ে মসজিদে দেওয়া হয় সিন্নি। এক সময় সাড়ম্বরে নবান্ন উদযাপন হতো। এই উৎসব মানুষের ভেতরে সমাদৃত ছিল অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব অনেকটা স্বকীয়তা হারিয়েছে। তবে এখনো বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু স্থানে নবান্ন উৎসব অত্যন্ত ঘট করে আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপন হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উদযাপন পালন শুরু হয়।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১