বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১০ December ২০২০

ফেঁসে যাচ্ছে ইভ্যালি


ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মকে পুঁজি করে প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি, ‘ক্যাশব্যাক’-সহ বিভিন্ন অফারের নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণাসহ বিস্তর অভিযোগ রয়েছে ইভ্যালির বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটিতে ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনায় মানা হয়নি নীতিমালা। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সবিহীন ই-ওয়ালেট পদ্ধতি চালু করে ইভ্যালি। একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে ইভ্যালির বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংসহ ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধাতা ও জবাবদিহিতা না-থাকাসহ নানা অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এ অবস্থায় ডিজিটাল প্রতারণার নিজস্ব ফাঁদেই ফেঁসে যাচ্ছে ইভ্যালি।  

ইভ্যালির ব্যবসা পদ্ধতির সবকিছুই ডিজিটাল ফাঁদ মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ই-কমার্সের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সঠিক পণ্য সময়মতো পৌঁছানো। কিন্তু ইভ্যালি অনেক ক্ষেত্রেই কাজটি করতে পারছে না। টাকা আটকে রেখে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহককে জানিয়ে দিচ্ছে, পণ্যের সরবরাহ নেই (স্টক আউট) বলে অর্ডার বাতিল করা হলো। আবার ‘গিফট কার্ড’ নাম দিয়েও গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিচ্ছে ইভ্যালি। যারা গিফট কার্ড কিনছেন, তারা তাদের টাকা ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে ইভ্যালিতে পণ্য না পেয়ে অনেক সময় ক্রেতা যখন বিরক্ত হয়ে অর্ডার বাতিল করে দেন, তখন তার টাকা জমা হয় ই-ওয়ালেটে। পণ্যের সরবরাহ না থাকায় ইভ্যালি নিজেও বাতিল করে দেয় অর্ডার। তখনো গ্রাহকের টাকা ই-ওয়ালেটে জমা হয়। টাকা আর ফেরত পান না গ্রাহক, বরং অন্য পণ্য কিনে উশুল করতে হয়। এভাবে অফার ও গিফট কার্ডের আড়ালে গ্রাহকের কোটি কোট টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ কৌশলে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ইভ্যালির ব্যবসায়িক ফাঁদ অনুসন্ধানে দেখা যায়, অফারের নামে কৌশলে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ই-কমার্স বাজারে এসেই নতুন মার্কেটিং কৌশল অবলম্বন করে আসছে ইভ্যালি। যেমন সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ১৫ টাকায় ল্যাপটপ ৩০ টাকায় আইফোন বিক্রির অফার দিয়েছিল। এ অফারে ব্যবসায়িক ফাঁদ যাচাই করে দেখা যায়,  ১৫ টাকা দিয়ে একটা লটারি কিনলেন, ৫০টা ল্যাপটপ ভাগ্যবান বিজয়ী পেয়ে গেলেন। কিন্তু পারটিসিপেট করেছে ২ লাখ মানুষ। ২ লাখ ১৫ টাকা= ৩০ লাখ টাকা তাদের আয় উঠে গেল। ৫০ হাজায় টাকায় ৫০টা ল্যাপটপ= ২৫ লাখ টাকা। তারা কিন্তু ৫০ হাজার টাকায় পণ্যটি কেনেনি। ৩৫ হাজারে কিনেছে। এক্ষেত্রে ৫০টি পণ্যে ১৫ হাজার টাকা করে থাকছে ইভ্যালির।

তাদের ফাঁদের খেলা এখানেই শেষ নয়। বাকি ১ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫০ জনের ১৫ টাকা তারা ফেরত দিয়ে দেবে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে তাদের অন্য কোনো পণ্য এখান থেকে কিনলে সেই টাকার সাথে অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে। এখানে কিছুটা ডেসটিনি (এমএলএম) খেলা খেলেছে ইভ্যালি। ২০০ টাকার পণ্য কিনলে ২০-৫০ টাকা তার প্রফিট থাকবেই। সুতরাং ১৫ টাকা ফেরতের নামে সে আপনার কাছ থেকে আরো ৫টাকা বেশি রেখে দিল। আর যে ব্যক্তি পণ্য কিনল না, তার ১৫ টাকা কোম্পানির কাছেই মানে ইভ্যালির কাছেই রয়ে গেল। এই জনসংখ্যার মধ্যে ৫০ হাজার জন যদি টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য অন্য আরেকটা পণ্য কেনে, তবে তাদের এক মার্কেটিং তথা ৫০টা ল্যাপটপের বদলে ৫০ হাজার পণ্য সেল হয়ে গেল।

ইভ্যালির রয়েছে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ‘ভাউচার অফার’। আরো রয়েছে ‘ক্যাম্পেইন’ নামক একটি বিকল্প কর্মসূচি। ক্যাম্পেইনভেদে পণ্য সরবরাহ করা হয় ৭ থেকে ৪৫ দিনে। ইভ্যালি বলছে, অনিবার্য কারণবশত ক্যাম্পেইনে যেকোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা পরিমার্জনের সম্পূর্ণ অধিকার ইভ্যালি কর্তৃপক্ষের রয়েছে। তবে কিছু গ্রাহকের অভিযোগ হচ্ছে, বেঁধে দেওয়া সময়ে তারা পণ্য পাচ্ছেন না। আর ইভ্যালির জবাব হচ্ছে, স্টক থাকা সাপেক্ষে পণ্য দেওয়া হয়, এমনকি চাইলেই গ্রাহকেরা টাকা ফেরত নিয়ে যেতে পারেন।

ইভ্যালির পণ্য বঞ্চিত গ্রাহক হাসান বুলবুল জানান, তিনি একটি আসুসের ল্যাপটপ কিনবেন বলে অর্ডার দিলেন। টাকাও জমা দিলেন। এক থেকে দুই মাস পর ইভ্যালি তাকে জানাল যে পণ্যটির সরবরাহ নেই। সরবরাহ আছে বেশি বেশি দরের অন্য ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ। গ্রাহক সেটাই নিতে বাধ্য হন।

ইভ্যালির ‘সাইক্লোন’ অফারে সাড়া দিয়ে গত সম্প্রতি দুই হাজার ৬৫০ টাকার একটি প্রডাক্ট অর্ডার করেন ক্রেতা রফিক মিয়া। ওই টাকার পরিবর্তে পরপর ১০ বারে তার সাড়ে ২৬ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি রিপোর্ট ইস্যু করেন। কাস্টমার কেয়ারে অভিযোগও করেন। মেইলও করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান হবে। কিন্তু প্রায় এক মাসেও তিনি অর্থ ফেরত পাননি। বলা হচ্ছে, ইভ্যালির পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে টাকা কাটা হয়েছে, কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি।

রফিক মিয়া, হাসান বুলবুলের মতো অনেকেই ইভ্যালির ফাঁদে পা দিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনলাইনে পণ্য কেনাকাটায় ই-কমার্সের নামে এই প্রতারণা বন্ধে আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আইন না থাকা আর জবাবদিহিতার অভাবেই ইভ্যালির ৩৭ লাখ গ্রাহক এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। অবশ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এরই মধ্যে ইভ্যালির কার্যক্রম খতিয়ে দেখছে।

 

ইভ্যালির কার্যক্রম শুরু হলো মাত্র দুই বছর। এরই মধ্যে নানা কৌশলে প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। অথচ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র এক কোটি টাকা। দুই বছর বয়সি এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় নানা অভিযোগ জমা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার ধরন দেখে অনুসন্ধানে থাকা কর্মকর্তারা এতে মানিলন্ডারিংয়ের তথ্য পেয়েছেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ করা না হলে অনূর্ধ্ব এক বছরের সশ্রম বা বিনা শ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা বলেন, ইভ্যালির বিরুদ্ধে আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে। প্রতিকারও নিচ্ছি।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াদুদ তমাল বলেন, ‘ইভ্যালির ব্যবসার মডেল অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কি না, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি নীতিমালা না মেনে ব্যবসা করছে কি না, তাও তদন্ত করছি। এ ছাড়া ইভ্যালির ব্যবসা পরিচালনায় এমএলএমের ধরন আছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মাত্র ৫০ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে শুরু করা ইভ্যালির কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন এখনো ৫০ হাজার টাকাই। ২০১৮ সালের ১৪ মে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নেয় ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড। এর অনুমোদিত মূলধন ৫ লাখ টাকা। ১০ টাকা মূল্যমানের এক হাজার শেয়ারের মালিক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল। আর চার হাজার শেয়ারের মালিক তার স্ত্রী ও কোম্পানির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন মোহাম্মদ রাসেল আর শামীমা নাসরিন দিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা। 

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক (গোয়েন্দা) মীর জয়নুল আবেদিন শিবলী বলেন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা থেকে ইভ্যালির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ দুদকে জমা পরেছে। এরই মধ্যে প্রতারণা ও মানিলন্ডরিংসহ ইভ্যালির সব কার্যক্রম অনুসন্ধানের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। গঠন করা হয়েছে একটি অনুসন্ধান টিম। টিমের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ইভ্যালির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে দুদক। 

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১