বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৫ December ২০২০

ফুলবাড়িয়া মার্কেট উচ্ছেদ, ব্যবসায়ীদের কথা ভাবুন


ইমরান হুসাইন

 

কোটি মানুষের আকাশছোঁয়া স্বপ্নের আঁতুরঘর ঢাকা শহর। যেখানে মানুষ কোনো না কোনোভাবে খুঁজে নেয় তার আশ্রয়স্থল, হোক সেটা ফুটপাতে, কুঁড়েঘরে বা উচ্চ দালানকোঠায়। কেউ ঠেলাগাড়ি বহন করে আবার কেউ ছোটখাটো ব্যবসা আবার কেউ বড় কোনো চাকরি। সবকিছু মিলিয়ে নানা স্তরের মানুষের বসবাসের স্থান এই ঢাকা শহর।

এখানে প্রতিনিয়তই কেউ হাসছে অট্টহাসিতে আবার কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছে। এখানে বিরাজমান নিয়ম অনিয়মের অবাধ কর্মকাণ্ড। বলছি বর্তমান সময়ে সব থেকে আলোচিত বিষয় হলো রাজধানীর ফুলবাড়িয়া মার্কেটের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ। যে বিষয়টি আলোড়িত করেছে সারা দেশের মানুষের মনকে। একদিকে নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নকশাহীন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ; অন্যদিকে খেটে খাওয়া, হাজারো স্বপ্ন বোনা মানুষের কর্মক্ষেত্র বিনষ্ট করে নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষা যা একজন সাধারণ মানুষের মনকেও নাড়া দেয়।

গত দুই-তিনদিন পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশন খুললেই আমরা দেখতে পাচ্ছি রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের খবরাখবর। এ বিষয়ে প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এর অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে যায় ডিএসসিসির উচ্ছেদ টিম। কিন্তু তখনই দোকান মালিক ও শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন। এবং সংঘবদ্ধভাবে তারা ডিএসসিসি মেয়রের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পরে তাদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে বেলা পৌনে ১টার দিকে এক্সকেভেটর দিয়ে নগর প্লাজার সামনের ফুটপাতে থাকা দোকান ভাঙা শুরু হয়। ফলে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দোকান মালিক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মাঝে। ব্যবসায়ীরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চারপাশ থেকে উচ্ছেদকারী দলের ওপর ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করে। এ সময় মার্কেটের ব্যবসায়ী, দোকান মালিক ও শ্রমিকরা জানান, এখন করোনা পরিস্থিতি। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুবই খারাপ। এর মধ্যে আমাদের ব্যবসা শেষ করে দিচ্ছে ডিএসসিসি।

অন্যদিকে মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির নেতারা একেকটি দোকানের বিনিময়ে ৫ লাখ, ৭ লাখ, ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। টাকা নেওয়ার রসিদও দিয়েছেন তারা। বারবার বলা হয়েছে, আমাদের বৈধ কাগজপত্র করে দেওয়া হবে। কিন্তু সেসব কিছুই দেওয়া হয়নি। ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, ডিএসসিসির বিভিন্ন মার্কেটের নকশাবহির্ভূত অনেক অবৈধ দোকান তৈরি করা হয়েছে। এতে মার্কেটের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অবৈধ সব দোকানপাট উচ্ছেদ করে মার্কেটগুলোর ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আবার ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় দুই দশক ধরে সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি এবং রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের সহায়তায় ফুলবাড়িয়া মার্কেটের নকশা উপেক্ষা করে অবৈধ দোকান তৈরি করে বিক্রি করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বিভিন্ন সময় বিষয়গুলো আলোচনায় এলেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং সময়ের ব্যবধানে দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এর এ, বি এবং সি ব্লকে ৮১০টি অবৈধ দোকান রয়েছে।

আইনের বাইরে আমরা কেউ নই। আইন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আইন বা নিয়মকানুন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র চলতে পারে না। শুধু রাষ্ট্র নয়, শাসন-আইন বা নিয়মকানুন ছাড়া কোনো পরিবারও চলতে পারে না। আইন বা শাসন ছাড়া সবকিছুই কেমন এলোমেলোভাবে ধাবিত হয়। সমাজে বিরাজ করে অন্ধকার। আর তাই সমাজ বা রাষ্ট্র সুশৃঙ্খল বিন্যাসে আইনের যথাযথ প্রয়োগ অতীব জরুরি। তবে আংশিক প্রয়োগ সব সময়ের জন্যই খারাপ। রাজধানীর ফুলবাড়ীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রয়েছে আইনের প্রয়োগ; কিন্তু যেসব ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, সবকিছু বিবেচনায় তাদের প্রতিও তো অবিচার করা হচ্ছে কেননা তারা তো তাদের দোকানের পজিশন নেওয়ার জন্য এবং তাদের দোকানকে বৈধ করার জন্য এর আগে দফায় দফায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে খাজনা বা টাকা দিয়ে আসছে। তাহলে এখন তাদের কোনো সমাধান না দিয়েই কেন উচ্ছেদ? তাহলে তাদের এতদিনের দেওয়া টাকার কী হবে? তাদের প্রতি এমন অবিচার করার আগে এর মূলহোতাদের খুঁজে বের করতে হবে। যারা তাদের থেকে টাকা নিয়েছে ব্যবসায়িক বৈধতা দেওয়ার জন্য, এখন তাদের কোনো হদিস নেই। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুধু খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পেটে কেন লাথি মারা হচ্ছে? যেসব ব্যবসায়ী ব্যবসা করার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে টাকার বিনিময়ে দোকানের পজিশন নিয়েছিল, লাখ লাখ টাকা খরচ করে ব্যবসা পরিচালনা করছিল, তারা যে এখন সবকিছু হারিয়ে পথে বসতে চলেছে তাদের কী হবে?

একদিকে লাখ লাখ টাকা খরচ করেও গেল, আবার তাদের দোকানও হারাতে হলো। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা ও শহরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। কিন্তু যেসব ব্যক্তির কারণে ব্যবসায়ীদের এমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে হলো, তাদের কী হবে? যারা দিনের পর দিন মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার করা হোক। শুধু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িত অবৈধ ব্যক্তিদেরকেও শাস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের কথাও চিন্তা করতে হবে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে পাওয়া দোকানগুলো যখন ভেঙে চুরমার করা হলো, তখন এই সর্বহারা নিঃস্ব মানুষদের কথাও ভাবতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১