বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৩ January ২০২১

পম্পেওর ভিত্তিহীন বক্তব্যের অন্তরালে


সাইফুল ইসলাম হাফিজ

 

 

সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী আলকায়দার উপস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। পম্পেও উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আলকায়দা হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন’ ও প্রমাণহীন আখ্যা দিয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ, যা ডয়েচে ভেলে, আল-জাজিরাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও তার বক্তব্য মনগড়া ও তথ্যহীন তবু মি. পম্পেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা একটি দেশ সম্পর্কে এমন মন্তব্য কেন করলেন, সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। এ মন্তব্য ঘিরে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমত বক্তব্যটিকে মনগড়া ও স্বার্থবাদী বলা যায়। নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশে সেনা উপস্থিতি বৃদ্ধি কিংবা ঘাঁটি গেড়ে চীনকে তাদের উপস্থিতির জানান দেওয়ার আগাম প্রচেষ্টাও বলা যেতে পারে। আমেরিকা যেকোনো মূল্যে চীনকে রুখতে বদ্ধপরিকর। তাই বাংলাদেশে তাদের আসা-যাওয়া থাকলে চীনকে সতর্ক করা সহজ হবে। গত বছর মার্কিন প্রতিমন্ত্রীর ঢাকা সফর তারই প্রমাণ। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ঢাকার সম্পর্ক বেশ ভালোই কেটেছে। বাইডেন প্রশাসনের সাথেও ভালো কাটবে এমনই প্রত্যাশা বাংলাদেশের। নিরাপত্তার দিক দিয়ে বাংলাদেশকে আরো শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। চীনকে রুখতে তাইওয়ানে আমেরিকার উপস্থিতি লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। শুধু নিরাপত্তার অজুহাতে আমেরিকা ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশে যে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়েছে তা সবারই জানা। দ্বিতীয়ত পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠী আলকায়দা সংগঠন বাড়াচ্ছে এমন মন্তব্য করে ঢের আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। যদিও তার উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন নির্বাচন। কিন্তু কথাটা একেবারে অর্থহীন নয়। কারণ, পাক-ভারত তাদের লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে আলকায়দা সংগঠন বাড়ালে বাংলাদেশ কিন্তু দৃষ্টি এড়াতে পারে না। অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাংলাদেশকে সীমান্তে সতর্ক থাকার বিকল্প নেই। তৃতীয়ত মি. পম্পেও এ কথাটা নিছক বেখেয়ালে বলেননি। কোনো না কোনো ইঙ্গিত তার কাছে অবশ্যই আছে। কয়েকটি দেশকে তার ‘টেরোর হাব’ আখ্যা দিয়ে ইরানের পরেই বাংলাদেশকে নিয়ে মন্তব্য করার কারণ রয়েছে। কোনো একটি মহল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে চলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগের ভিডিও ভাইরাল হলেও তাদের কথা হয়তো কারো কল্পনাতেই নেই। তাদের রটনার জন্যই হয়তো পম্পেও এমন কথা বললেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধিসহ অনুসন্ধানী পদক্ষেপ চাই। অন্যথায় বিশ্ব মানসে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বদ্ধমূল হবে। চতুর্থত গত ডিসেম্বরে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুশোওলু বাংলাদেশে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব করলে ঝড় ওঠে কূটনৈতিক মহলে। বিশ্বখ্যাত অস্ত্র ব্যবসায়ী আমেরিকাও ভাবতে থাকে যথারীতি। তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশ তুরস্ক অস্ত্র বিক্রি করলে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়বে। সে কারণেও বাংলাদেশকে নিয়ে এমন মন্তব্য করতে পারেন। পণ্য ক্রয় করলেই সমর্থন পক্ষে চলে আসে। ইউএসএ’র প্যাট্রিয়ট মিসাইল বাদ দিয়ে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্রয়ে আমেরিকার কূটনৈতিক সমর্থন তুরস্কের বিরুদ্ধে চলে গেছে। আরোপিত হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। রাশিয়ার সমর্থন যথাযথই পেয়েছে তুরস্ক। আর বিশ্বনেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে অস্ত্রের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে। জো বাইডেনের অন্যতম প্রতিজ্ঞা হলো পুনরায় বিশ্বনেতৃত্ব ফিরে পাওয়া। সরকারে যে-ই আসুক না কেন, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না। লক্ষ্য সবার একই। পঞ্চমত, তার এমন মন্তব্য কোন সময় এলো? বাংলাদেশ যখন সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন করে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে। বিদায় মুহূর্তে বাইডেন প্রশাসনের কাছে শান্তিকামী দেশের নামে কলঙ্ক মেখে দিয়ে যাচ্ছে। যেমনটা তারা আমেরিকার গণতন্ত্রের গায়ে দিয়েছে। অর্থাৎ বাইডেন প্রশাসনে বাংলাদেশ যেন বিতর্কের মুখে পড়ে। এবং অভিযোগকারীরা আরো সাহস পেয়ে যায়। বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর সুযোগ খুঁজতেও হতে পারে এমন মন্তব্য। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য বিশ্লেষণে উপরোক্ত বিষয়গুলোর অবতারণা হয়। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে শক্ত পররাষ্ট্রনীতিতে কূটনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ালে ঝুঁকি কমে আসবে। মি. পম্পেওর বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বলেছে-এ ধরনের দাবি যদি প্রমাণিত হয়, তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ সরকার। এ কথার যথার্থ বাস্তবায়ন বাংলাদেশের সম্মান রক্ষায় সহায়ক হবে। বিশেষ করে তাদেরকে নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো সুযোগ দেওয়া মোটেও মঙ্গলজনক হবে না। বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর অনিষ্ট থেকে জনগণকে নিরাপত্তা দিতে সবসময় প্রস্তুত তাই তৃতীয় পক্ষকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অন্য দেশের বাহিনীর নিরাপত্তার বাংলাদেশের কোনো প্রয়োজন নেই। তাই পম্পেওরা যদি নিরাপত্তার অজুহাতে কোনো দিবাস্বপ্ন দেখে থাকে তবে তাদের সেই স্বপ্ন এবং অসৎ মনোভাব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাক।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১