বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৬ January ২০২১

ইউরোপের অর্থনীতি ও মানসিকতা


মো. বিল্লাল হোসাইন

 

 

প্রতিনিয়ত এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে বিপুল পরিমাণ জনস্রোত বৈধ ও অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে। অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশ করতে গিয়ে কত মায়ের সন্তানের সলিল সমাধি হচ্ছে ভূমধ্যসাগরের নীল পানিতে। কখনো ইউরোপের সীমান্তবর্তী কোনো দেশের গভীর জঙ্গলে তাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে কিংবা সর্বস্বান্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার হচ্ছে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে কেন তাদের এই যাত্রা? কেন তাদের এই নিরন্তর ছুটে চলা? উদ্দেশ্য হলো বাড়তি কিছু অর্থ উপার্জন করা, একটু উন্নত জীবনযাপন করা, একটি গ্রিনকার্ড পাওয়া। ইউরোপিয়ানরা সম্পদশালী, তাই যে-কোনো মূল্যে ইউরোপীয় যে-কোনো দেশে প্রবেশ করতেই এ অদম্য বাসনা।

ইউরোপীয় অর্থনীতি কেন এত সমৃদ্ধিশালী? কীভাবে তারা এত উন্নত হলো? তাদের এত সম্পদ ও সমৃদ্ধির উৎস কী? অষ্টম শতাব্দীতে ইরাকের বাগদাদ আর স্পেনের কর্ডোভা যখন সভ্যতা, সংস্কৃতি আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে বিকশিত, তখন লন্ডন, প্যারিস এবং মস্কোতে ইতিহাসে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছুই ছিল না। ১৪৫৩ সালে উসমানীয় তুর্কিদের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর ইউরোপীয় দার্শনিক, যাজক এবং বুদ্ধিজীবীরা নড়েচড়ে বসে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ইউরোপে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়। যান্ত্রিক আবিষ্কার তাদের জীবনে গতি এনে দেয়। ইঞ্জিনচালিত জাহাজে চড়ে তারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে ভৌগোলিক আবিষ্কারে।

পোপ বিশ্বকে দুই ভাগ করে পর্তুগিজদের পূর্বে এবং স্পেনীয়দের পশ্চিমের দায়িত্ব দেন। তারাই প্রথম বিশ্ব জয়ে বের হয়। ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন, পর্তুগিজদের জন্মগ্রহণের জন্য স্রষ্টা ছোট একটি দেশ দিয়েছেন’ কিন্তু মরবার জন্য দিয়েছেন গোটা দুনিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপীয় অন্য শক্তিগুলো ভৌগোলিক আবিষ্কারে বের হয়। এ সময় তারা সমরাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করে এবং ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বে এসব অস্ত্রকে তারা দারুণভাবে কাজে লাগায়। রেনেসাঁপ্রসূত সার্বিক অগ্রগতি অবশ্যই ইউরোপিয়ানদের অবদান এবং এজন্য তারা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। যন্ত্রকৌশল, ভৌগোলিক আবিষ্কার, উন্নত সমরাস্ত্র, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকাজুড়ে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা মধ্য এবং আধুনিক যুগের বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।

কিন্তু শত শত বছর ধরে উপনিবেশগুলোতে তাদের চলমান কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে বর্তমান ইউরোপের সমৃদ্ধির পেছনে তাদের এক কুৎসিত চেহারা প্রকাশিত হয়। ইউরোপিয়ানদের মধ্যে সর্বাধিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছে ব্রিটেন। নৌশক্তির শ্রেষ্ঠত্বের জন্য ব্রিটেনকে বলা হতো সমুদ্রের রানি। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমেরিকা পর্যন্ত প্রায় ৩.৫ কোটি বর্গকিলোমিটারের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা যা পৃথিবীর মোট ভূ-ভাগের এক-চতুর্থাংশ। সেজন্যই বলা হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কখনো সূর্যাস্ত যায় না। ফ্রান্স ১.২৫ কোটি, স্পেন ১.৩৭ কোটি, রাশিয়া ২.২৮ কোটি, ডাচ ৩০ লক্ষ, পর্তুগাল ৫৫ লক্ষ, বেলজিয়াম ২৩ লক্ষ, জার্মান ৩১ লক্ষ, ইতালি ৩৮ লক্ষ এবং ডেনমার্ক ৩০ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোপের মোট আয়তন প্রায় ১.০২ কোটি বর্গকিলোমিটার যা পৃথিবীর মোট ভূভাগের মাত্র ৬.৮%। অথচ শত শত বছর ধরে তাদের দখলে ছিল গোটা বিশ্বের প্রায় ৭২% ভূখণ্ড। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত চীনের মূল ভূখণ্ড, মঙ্গোলিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, ইথিওপিয়া, লাইবেরিয়া এবং তুরস্কের মূল ভূখণ্ড ব্যতীত গোটা বিশ্ব কোনো না কোনো সময়ে ইউরোপীয়দের দখলে ছিল। ইউরোপীয় শক্তিবর্গ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ছল, বল, কৌশল, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতা সবকিছুরই ব্যবহার করেছে।

দুনিয়ার তিন-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড যদি ইউরোপিয়ানদের দখলে থাকে, সেখানে রাজনৈতিক কতর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সাথে উচ্চ হারে কর আদায় করে, তারা সেখানে একচেটিয়া বাণিজ্য করে, বৈধ-অবৈধভাবে উপনিবেশগুলোর সম্পদ ইউরোপে পাচার করে, শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য স্থানীয়দের বিশেষ কিছু পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করে, উৎপাদিত পণ্য/কাঁচামাল কম মূল্যে ক্রয় করে ইউরোপে শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদন করে সেসব পণ্য গোটা সাম্রাজ্যে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে মনোপলি বাজার প্রতিষ্ঠা করে, সমুদ্রে নিয়ন্ত্রণ এবং জলদস্যুতা করে, দাস ব্যবসার মাধ্যমে এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে স্থানীয় বিপুল পারিমাণ জনগোষ্ঠীকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় দাস হিসেবে বিক্রি কয়ে দেয়, স্থানীয় শিল্পগুলোকে ধ্বংস করে দেয় এবং খনিজসম্পদে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এতে তাদের উন্নতির চিত্র কল্পনা করা যায়? শত শত বছর ধরে গোটা দুনিয়া থেকে কী পরিমাণ সম্পদ ইউরোপে জড়ো করা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিটি দেশ উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণে এই একই নীতি অনুসরণ করেছে। সারা বিশ্বের সেই সম্পদকে পুিঁজ করেই সমৃদ্ধ হয়েছে আজকের ইউরোপ। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের ঘাম আর রক্ত মিশে আছে বর্তমান ইউরোপের আভিজাত্যে এবং সভ্যতায়। পরের ধনে ধনী হয়েছে ইউরোপিয়ানরা।

দুনিয়াব্যাপী ইউরোপের এই সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা যে পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন তা হলো- God, Gold & Glor। এর সঝল কথা হলো খ্রিস্টধর্ম প্রচার, সম্পদ সংগ্রহ এবং গৌরব অর্জন। আজুিকানদের সভ্য করার তথাকথিত পরিকল্পনা নিয়ে ১৮৮৪ সালের দিকে বার্লিন সম্মেলন করে সরাসরি ঘোষণা দিয়েই আফ্রিকা দখল শুরু করেছিল ইউরোপিয়ানরা। এখানে ফ্রান্স সর্বাধিক ভূখণ্ড দখল করেছিল। বর্তমান ইউরোপে প্রায় ৫০টির মতো দেশ থাকলেও এগুলোর অধিকাংশ দেশই এক সময় পরাশক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। অর্থাৎ ইউরোপের ৭-৮টি বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থ এবং বাণিজ্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এসব দেশ। তাদের নিয়ে আসা পণ্যগুলো ইউরোপের বাজারে, বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেছিল অন্য দেশগুলো। সেইসাথে ছিল শিল্প বিপ্লবের প্রভাব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো স্বাধীন হতে শুরু করে। বর্তমান এই পোস্ট মডার্ন যুগেও ইউরোপের পাঁচটি দেশের উপনিবেশ রয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে ইউরোপের বাইরে ব্রিটেনের ১৫টি এবং ফ্রান্সের রয়েছে ১৬ কলোনি। এ ছাড়া মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, টোগো, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, গিনি বিসাউ, আইভরিকোস্ট, মালি, নাইজার, চাদ, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, নিরক্ষীয় গিনি এবং গ্যাবন এই ১৪টি দেশে এখনো ফরাসি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠিত আছে। স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রতি দিয়ে ১৯৪৫ সালে দেশগুলোর সাথে ফ্রান্স CFA Franc নামে একটি চুক্তি করিয়ে এসব দেশে একক মুদ্রা ফ্রাংক চালু করে। এই চুক্তি মোতাবেক দেশগুলোর মোট জিডিপির ৫০%-৬৫% ফরাসি কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা রাখতে হয়।

১৯৬০ সালে দেশগুলোকে স্বাধীনতা দেওয়া হলেও মুদ্রানীতি সম্পূর্ণ ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কার্যত এসব দেশের প্রযুক্তি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, টেলিফোন, ব্যাংক, সরকার ব্যবস্থা এমনকি সামরিক বাহিনীর ওপর রয়েছ ফরাসি আধিপত্য। রয়েছে পুতুল সরকার। এসব দেশে একটি ফরাসি দালাল শ্রেণি তৈরি করে রেখেছে ফ্রান্স, যারা দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতাদের প্রতিরোধ বা হত্যা করে এবং ফরাসি সেনাবাহিনী প্রায়ই সরকার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে থাকে। ১৯৬৩ সালের পর থেকে এখানে ২২ জন সরকারপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। আইভরিকোস্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট লরা বেগবোর নির্বাচনে হেরে যাওয়া এবং ক্ষমতা হারানোর মূল কারণ হলো তিনি শুধু একটি ব্রিজ নির্মাণে চীনা বিনিয়োগকে সমর্থন দিয়ে ফ্রান্সের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত অবকাঠামোর ঋণ ও ভাড়া এসব দেশ এখনো ফ্রান্সকে পরিশোধ করে থাকে। ফ্রান্সের পরমাণু জ্বালানির কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের বড় জোগানদাতা হচ্ছে আফ্রিকার এই দেশগুলা। এভাবে মানবতার ধ্বজাধারী ফ্রান্স এই যুগেও আফ্রিকার স্বাধীন এই দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ টিকিয়ে রেখেছে।

বর্তমান ইউরোপ প্রযুক্তি রপ্তানি করে প্রচুর অর্থ আয় করলেও পরাশক্তিগুলোর অন্যতম আয়ের মাধ্যম হলো অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামের ব্যবসা। উপনিবেশগুলোকে স্বাধীনতা দিলেও সেখানে তারা ইচ্ছাপূর্বক বহু অমীমাংসিত ইস্যু রেখে এসেছে এবং বর্তমানেও বিশ্বরাজনীতির নানাবিধ মেরূকরণে এশিয়া এবং আফ্রিকাতে সংঘাত জিইয়ে রেখেছে। ফলে তাদের অস্ত্রের ব্যবসা রমরমা। বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টি এবং বিবদমান দেশগুলোর মাঝে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পেছনে পরাশক্তিগুলোর অস্ত্র ব্যবসার গোপন লবি জড়িত। বর্তমানে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক খুবই চমৎকার হলেও শত শত বছরব্যাপী পারস্পারিক যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে তারা এই অবস্থায় এসেছে এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাতও করেছে ইউরাপিয়ানরাই। রেনেসাঁপ্রসূত ইউরোপিয়ানদের সমৃদ্ধিশীল হওয়ার যোগ্যতা অবশ্যই ছিল এবং আছে। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, গোটা বিশ্ব থেকে নিয়ে আসা সম্পদের অধিকাংশই তারা অর্জন করেছে অন্যায় ও অবৈধ পন্থায়, জুলুমের মাধ্যমে। ইতিহাসের পরতে পরতে রয়েছে যার স্পষ্ট প্রমাণ।

 

লেখক : প্রভাষক, চাঁদপুর সরকারি কলেজ, চাঁদপুর


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১