আপডেট : ৩০ January ২০২১
এবার স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত) নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে। বিশেষ করে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস)-এর নেতারা নীতিমালা নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। কেউ সংশোধিত নীতিমালাকে যুগান্তকারী আখ্যা দিয়েছেন। অনেকে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। এজন্য তারা দাবি তুলেছেন নীতিমালা সংশোধনের। সম্প্রতি দেশের অপরিশোধিত স্বর্ণ আমদানি এবং স্বর্ণ পরিশোধনাগার স্থাপনের সুযোগ রেখে ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)’ নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা স্বর্ণবার এবং স্বর্ণালংকার আমদানির পাশাপাশি অপরিশোধিত স্বর্ণ আমদানি করে পরিশোধনের মাধ্যমে রপ্তানি করতে পারবে। বাজুসের সভাপতি ও শারমিন জুয়েলার্সের মালিক এনামুল হক খান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ আমাদের অনেক প্রচেষ্টার ফসল। কিন্তু যেসব নীতিমালা সংশোধনের প্রস্তাবনা দিয়েছি সেখানে তারা কোনো হাত দেয়নি। সেখানেই জোর আপত্তি রয়েছে আমাদের। স্বর্ণ আমদানি এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, স্বর্ণ ইনস্টিটিউট এবং স্বর্ণ কারখানা স্থাপনে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেজন্য আবারো সংশোধনী আনতে হবে। ব্যবসাকে সচল রাখতে সংশোধনী না এনে নতুন ব্যবসা চালুর জন্য সংশোধনী আনা হবে এটা হতে পারে না। সংশোধিত নীতিমালা জুয়েলারি ব্যবসার কোনো উপকারে আসবে না। ব্যবসায়ীদের স্বার্থও রক্ষা হবে না।’ নীতিমালায় অপরিশোধিত স্বর্ণ আমদানির করে পরিশোধনের মাধ্যম রপ্তানির যে বিধান রাখা হয়েছে তা দেশের অর্থনীতিতে তেমন ভূমিকা রাখবে না বলেও মনে করেন বাজুস সভাপতি। তিনি বলেন, ‘অপরিশোধিত স্বর্ণ আমদানি ও পরিশোধিত করে বিদেশে রপ্তানি সংশোধনীতে এনেছে। এতে নতুন ব্যবসায়ী সৃষ্টি হবে, নতুন বিনিয়োগ হবে। তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু এই বিনিয়োগে দেশ কতটুকু উপকৃত হবে সেটি আলোচনার বিষয়। এটি বিশ্লেষণের সময় এখনো আসেনি। কিন্তু চলমান সমস্যা দূর করে তারপর নতুন কিছু করা হোক তাতে আমাদের আপত্তি নেই। অপরিশোধিত স্বর্ণ আমদানি করে সেগুলো পরিশোধিত করে রপ্তানি করা ২৮ লাখ জুয়েলারি পরিবারের কোনো উপকারে আসবে না।’ অন্যদিকে, বাজুস সভাপতির বক্তব্যে সম্পূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘সংশোধিত নীতিমালাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আমরা সাধুবাদ জানাই। স্বর্ণ নীতিমালার বয়স কেবল দুবছর হয়েছে। এত দ্রুত এর সুফল মিলবে সেটা আশা করা ঠিক না। যদি কোনো জুয়েলারি মালিক বলেন যে এই নীতিমালা কোনো উপকারে আসবে না সেটা ঠিক নয়। উপকারে আসবে; কিন্তু আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আমরা এ বিষয়ে সচিবসহ অনেকের সাথে কথা বলেছি। আমার আর সংগঠনের সভাপতির বক্তব্য বিপরীত হতে পারে। কারণ ওনার ডিলারশিপ নেই এবং ডিলারশিপ পাননি। উনি হয়তো এত গভীরে যাননি। আমি গভীরে গিয়ে কাজ করছি।’ সংশোধিত নীতিমালায় স্বর্ণমান ও বিশুদ্ধতা সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএসটিআই অথবা বিএসটিআই কর্তৃক স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেড সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অপরিশোধিত স্বর্ণ আমদানি করতে হলে বিমানবন্দরে স্বর্ণের মান যাচাই করে আনতে হবে। স্বর্ণের মান যাচাইয়ে বিএসটিআইএ’র সেই সক্ষমতা নেই। বিএসটিআই নিজস্ব সক্ষমতা অর্জনের আগ পর্যন্ত ‘বাংলা গোল্ডের’ সাথে চুক্তির মাধ্যমে মান যাচাই সনদ প্রদান করবে। এটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট এবং আমদানিতে জটিলতা এখনো রয়ে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এ ব্যাপারে বাজুসের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান নির্বাহী সদস্য, গ্রামীণ জুয়েলার্সের মালিক দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘টেস্টিং নিয়ে জটিলতা রয়েছে। কারণ বিএসটিআইতে টেস্টিং ফ্যাসিলিটি নেই। টেস্ট করাতে হবে এয়ারপোর্টে। বাংলা গোল্ডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে টেস্টিংয়ের জন্য। ভ্যাট নিয়েও কিছুটা জটিলতা রয়েছে। ১ লাখ টাকার স্বর্ণ আমদানিতে ৫ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হবে। এ ছাড়া আমদানি নিয়ে কিছু জটিলতা ছাড়া আর তেমন কোনো জটিলতা নেই। তবে ভ্যাট বেশি হলেও সেটি হয়তো গ্রাহকের কাছ থেকেই আদায় করতে হবে।’ এনামুল হক খান বলেন, ‘আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক অনেক জটিলতা রয়েছে। অনেক ধাপ অতিক্রম করে স্বর্ণ আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া কারিগরদের জীবন মান উন্নয়নে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই জাতীয় একাধিক সংশোধনী আনা দরকার। সেগুলো না করে নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এটা আমরা মেনে নিতে পারছি না।’ তবে আমদানি প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক সহজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাজুসের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘আমদানিতে বর্তমানের ১৫ দিনের জায়গায় ১০ দিনে অনুমতি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫ শতাংশ জামানত দেওয়ার যে বিধান ছিল সেটি এখন আর লাগবে না।’ তিনি জানান, বিএসটিআইএ’র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে বিএসটিআইকে সুযোগ দিতে হবে। দিলীপ কুমার আগরওয়ালা বলেন, ‘আমিই সর্বপ্রথম স্বর্ণ আমদানি করেছি। বর্তমানে ১৬০ কেজি স্বর্ণ পুরোটাই আমদানি করছি। যদি সমস্যা হতো তাহলে আমিই এর ভুক্তভোগী হতাম। কিছু সমস্যা হয়তো আছে। কিন্তু সেটিও সমাধান হয়ে যাবে।’ তবে আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সবাই একমত প্রকাশ করেছেন। তারা স্বর্ণ আমদানি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দাবি জানিয়েছেন। বাজুস সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যদি আমদানি পুরো ফ্লেক্সিবল হয়, বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে একরত্তি স্বর্ণও চোরাচালান হবে না।’ তিনি জানান, দেশে বছরে ২০-২৫ টন স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে। এনামুল হক খান বলেন, ‘স্বর্ণটা ইয়াবা এবং মাদকের মতো ক্ষতিকর না। আমাদের প্রচুর বৈদেশিক রিজার্ভ রয়েছে। যদি রিজার্ভে প্রভাব না পড়ে তাহলে স্বর্ণ আমদানি অবাধ করে দেওয়া হোক। এতে সরকার ২ হাজার কোটি টাকা বছরে ট্যাক্স পাবে। সরকার যদি লাভবান হয় তাহলে আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়াতে সমস্যা কোথায়?’ গত ২৭ জানুয়ারি অনলাইনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ‘স্বর্ণ নীতিমালা (সংশোধিত) ২০১৮ প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। নীতিমালার সংশোধনীতে কী রয়েছে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সংশোধনীতে আছে পরিশোধিত স্বর্ণ না এনে অনেক দেশই অপরিশোধিত স্বর্ণ এনে পরিশোধিত করে। তাই দেশে স্বর্ণ পরিশোধনের জন্য আমাদের কাছে অনুমোদন চেয়েছে। এজন্য স্বর্ণ পরিশোধে যেসব প্রয়োজনীয় জিনিস লাগবে তা বসানোর জন্য অনুমোদন চেয়েছে। এটা কোনো খারাপ কিছু না, ভালোই। প্রস্তাবিত ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)’ কার্যপত্রে বলা হয়েছে, সংশোধিত নীতিমালায় নতুনভাবে সরকার, স্বর্ণ ও পরিশোধনাগারের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; নীতিমালাটি সংশোধনের ফলে স্বর্ণবার ও স্বর্ণালঙ্কারের পাশাপাশি অপরিশোধিত স্বর্ণ আকরিক/আংশিক পরিশোধিত স্বর্ণ আমদানির করা সম্ভব হবে; অপরিশোধিত স্বর্ণ আকরিক/আংশিক পরিশোধিত স্বর্ণ থেকে বিভিন্ন গ্রেডের স্বর্ণবার ও স্বর্ণ কয়েন উৎপাদনে পরিশোধনাগার স্থাপনের পথ সুগম হবে; স্বর্ণ পরিশোধনাগার স্থাপন ও পরিচালনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণের লক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মানসম্মত পরিচালনা পদ্ধতি প্রণয়ন করবে মর্মে নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে। স্বর্ণবার রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকের অবশ্যই স্বর্ণ পরিশোধনাগার থাকতে হবে মর্মে নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে; বিশেষ প্রয়োজনে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে সরকার (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) কতিপয় ক্ষেত্রে নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন/সংযোজন/পরিববর্তন আনয়ন করতে পারবে মর্মে নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে। নীতিমালায় প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বর্ণবার ও স্বর্ণালংকারের সঙ্গে স্বর্ণকয়েন এবং অপরিশোধিত স্বর্ণ আকরিক/আংশিক পরিশোধিত স্বর্ণ সংযোজন করা হয়েছে; কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করা হয়েছে এবং সংশোধিত নীতিমালায় স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮-এর অন্যান্য সব বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১