আপডেট : ১৪ February ২০২১
আতিকুর রহমান আতিক একটি শান্তিপূর্ণ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নিয়েছে। ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে এক বছরের জরুরি অবস্থা। গ্রেপ্তার করা হয়েছে দেশটির একসময়ের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী ও স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিসহ প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের। তাই দেশটির বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ কেন এই অভ্যুত্থান ঘটল বা এর ভবিষ্যৎই-বা কী এবং নতুন সামরিক জান্তার চ্যালেঞ্জই-বা কী? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে আমাদের মিয়ানমারের সামরিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। মিয়ানমার ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় ১৯৪৮ সালে। তারপর সে-দেশে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাশাসন চলে ২০১১ সাল পর্যন্ত। যদিও এরই মধ্যে ২৭ মে ১৯৯০ সালে সামরিক জান্তার অধীনে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে অং সান সু চি’র দল ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি’ ৪৯২টি আসনের মধ্যে ৩৯২টি আসন দখল করে। কিন্তু সামরিক জান্তা সরকার নির্বাচনী আইনের মাধ্যমে সেই নির্বাচনের ফলাফলকে বাতিল করে। নব্বইয়ের নির্বাচনের পর দীর্ঘ ২০ বছর পর পুনরায় ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত দল জয়লাভ করে। পরবর্তীকালে ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বাধীন বিরোধী এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় পায় এবং সরকার গঠন করে। এনএলডির পাঁচ বছরের শাসনের পর ২০২০ সালের নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতা লাভের আগেই নতুন করে এ সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং পুনরায় মিয়ানমার চলে সামরিক জান্তার অধীনে। দীর্ঘ ৫০ বছরের সামরিক শাসনের পর মিয়ানমারে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনটি ছিল কার্যত দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন। নভেম্বরের ওই নির্বাচনে এনএলডি ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট পায়। কিন্তু ভোটের পরপরই জালিয়াতির অভিযোগ তোলে সামরিক বাহিনী। কেননা সেই নির্বাচনে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভোটের খুব সামান্য অংশই পেয়েছে। নির্বাচনের এই ফলাফল সেনাবাহিনীকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া মিয়ানমার সেনাবাহিনী সংবিধান পরিবর্তন হওয়ার আশংকায় ভীতসন্ত্রস্ত। তাদের হাত ধরেই ২০০৮ সালে মিয়ানমারের নতুন সংবিধান গ্রহণ করা হয়। নতুন এই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে শুধু ৭৫ শতাংশ আসন রাখা হয় সাধারণ জনগণের জন্য, আর বাকি ২৫ শতাংশ সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত করা ছিল। এনএলডি বা যেকোনো রাজনৈতিক দল যাতে বৈচিত্র্যময়, বহু জাতিগত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্যই এমন একটি সংবিধান প্রস্তুত করেছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এক্ষেত্রে এবার তাদের ভয় ছিল যদি সু চি’র নেতৃত্বাধীন এনএলডি সংবিধানটি যদি বাতিল করে দেয়, তাহলে সামরিক বাহিনী ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য হারাবে। সে কারণে তারা নির্বাচনকেই জালিয়াতিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে সেটাকেই হাতিয়ার করেছে সু চিকে হটানোর জন্য। যদিও বাস্তবিকপক্ষে সু চি’র এটি করা প্রায় অসম্ভব ছিল। অপরদিকে বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধানের আর কয়েকমাস পরে অবসরে যাওয়ার কথা। অবসরের পর তার পদবি কী হবে বা তিনি কোনো প্রশাসনিক সেক্টরে থাকতে পারবেন কিনা! এছাড়া রোহিঙ্গা নিধনের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে যদি মিয়ানমার দণ্ডিত হয় তাহলে প্রথম সাজা হতো সেনাপ্রধানের। এসব বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলেন সেনাপ্রধান। এজন্য এটিও হয়তো অভ্যুত্থানের অন্যতম আরো একটি কারণ। ইতোমধ্যে মিয়ানমারে মোবাইল ফোন ও আংশিক ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে বন্ধ রয়েছে যাত্রীবাহী বিমান চলাচলও। দেশের অনেক জায়গায় টেলিফোন সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। যদিও কিছু কিছু এলাকার মানুষ ধীরগতিতে হলেও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন। দেশের বৃহৎ বৃহৎ শহরগুলোর রাস্তায় কাঁটাতার দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি ভবনগুলোতে সামরিক বাহিনীর সৈন্যরা অবস্থান করছেন। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে মিয়ানমারের সাধারণ জনগণ বেশ কয়েকটি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভবিষ্যতে হয়তো আরো বেশি কড়াকড়ি আরোপ হতে পারে। এছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ও সংগঠন মিয়ানমারের অভ্যুত্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ, জি-সেভেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়া অনতিবিলম্বে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা স্থানান্তর করতে আহ্বান জানিয়েছে। নতুন বাইডেন প্রশাসন মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে শপথ করেছিলেন তা বাস্তবায়নের জন্য বাইডেন হয়তো খুব দ্রুতই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিকসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পর্যায়ের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান। নিউজিল্যান্ডের পথ ধরে হয়তো আরো কয়েকটি দেশ এরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৫ সালে অং সান সু চি’র জন্ম। সু চি’র বাবা জেনারেল অং সান মিয়ানমারের জাতির পিতা হিসেবে বিবেচিত। তৎকালীন বার্মাকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করতে গিয়ে ১৯৪৭ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। তাই মানবিকভাবেই মিয়ানমারের বিশাল অংশই সু চি’র পক্ষে থাকবেন। সু চি’র মুক্তি ও সেনাশাসনের অবসানের দাবিতে নেপিডো, ইয়াঙ্গুনসহ বেশ কয়েকটি শহরে গত কয়েক দিন ধরে ব্যাপক বিক্ষোভ করছে মানুষ। কিন্তু কোনো বিক্ষোভেই কাজ হচ্ছে না। ইতোমধ্যে সু চিকে রপ্তানি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ দিয়ে করা একটি মামলায় রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনায় গণতন্ত্রপন্থি এই নেত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তা বলাই বাহুল্য। তবে আর যা-ই হোক, অং সান সু চি’র মুক্তি পাওয়ার সুযোগ এবং ক্ষমতায় ফিরে আসা নির্ভর করছে পরাশক্তিগুলো কী করে, তার ওপর। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সু চির ইমেজ হয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারের কোটি কোটি মানুষ এখনো তাকে ভালোবাসেন। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। মিয়ানমারে এই সেনা অভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষমতা দখল করার প্রতিযোগিতা কি না তা ভাবার বিষয়। মিয়ানমারের এই সামরিক অভ্যুত্থান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকা এবং চীন এই ইস্যুতে বিপরীত পক্ষ নিলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি আরো উগ্র হয়ে উঠবে। প্রভাব ফেলতে পারে চলমান মার্কিন-চীন শীতল যুদ্ধে। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা মূলত ভারতকে চাপে ফেলতে এ অভ্যুত্থানে পরোক্ষ সহায়তা রয়েছে চীনের। কেননা মিয়ানমারে ভারত ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরগুলোতে দশ লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। প্রত্যাবাসন নিয়ে কয়েকটি নীতিগত চুক্তি হলেও সেগুলো কার্যকর হয়নি। তাই এনএলডি সরকার যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে পারত এটা ভাবা ভুল। কারণ চরম জাতীয়তাবাদী এনএলডি জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ বর্মীদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। সেনাবাহিনীর মতোই তারাও রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও অনেকে এবার চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা নিয়ে আশাবাদী ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি দুরাশা। তবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের জন্য বেশকিছু বিষয় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বিশেষত রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যে মামলা চলছে সেখানে সু চি’র নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার যেভাবে ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল সেভাবে পারবে না সামরিক জান্তা সরকার। এটিকে হয়তো একটি চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে পশ্চিমা দেশগুলো। অপরদিকে আরসার মতো মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে যা সামরিক সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। এছাড়া মিয়ানমার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিশ্বের। যদিও নিষেধাজ্ঞা মিয়ানমারকে খুব বেশি চাপে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। কেননা ভারত, চীন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের জোট আসিয়ানের অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ তাদের সদস্য মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানকে ‘অভ্যন্তরীণ’ ব্যাপার বলেই বিবেচনা করছে। তারপরও মিয়ানমার সংকটের সংঘাতমুখর পরিণতি শুধু এই দেশটির জন্যই নয়, একই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের ওপর অস্থির প্রভাব ফেলবে নিঃসন্দেহে। গত দশ বছর ধরে মিয়ানমারে যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেছিল তা পুনরায় আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর উচিত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একই আলোচনার টেবিলে বসানো এবং এর একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা। তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান সেনাপ্রধান দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসছেন। ফলে খুব সহসাই যে মিয়ানমার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১