আপডেট : ১৯ February ২০২১
সড়ক-মহাসড়ক ঠিক রাখার ব্যয় দেবে সেবাগ্রহীতারা। সে লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে ‘সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বোর্ড আইন-২০১৩’ অনুমোদন হয়। দেশের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন সড়কগুলোর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে এ তহবিলের জন্য সংশ্লিষ্ট সড়ক ব্যবহারকারী যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হবে। বাস্তবে দীর্ঘ আট বছর ধরেই আঁতুড়ঘরেই রয়ে গেলে তহবিল বোর্ড আইন। আইনটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের তিনটি মহাসড়কের থেকে আদায় করা টোলের অর্থ যাচ্ছে রাজস্ব খাতে। এদিকে সড়ক মেরামত ও সংস্কার কাজের অর্থ জোগান দিতে হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ বা সরকারের বরাদ্দ থেকে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সড়ক দ্রুত মেরামতের জন্য আলাদা তহবিল করতে হবে। তাহলে সড়ক মেরামতে ও সংস্কারের জন্য অর্থ পেতে সহজ হবে এবং দ্রুত কাজ হবে। একই সঙ্গে এ খাতে কমবে সরকারের ঋণের বোঝা। সড়ক বিভাগের অধীনস্থ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন ২১ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৩ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক ১৩ হাজার ৬৭৮ কিলোমিটার। এদিকে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সড়ক পথের চলছে নানা কর্মযজ্ঞ। সড়ক, মহাসড়ক কিংবা এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থা বা আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো অর্থ দিলেও রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ ব্যয় করতে হয় সরকারের তহবিল থেকে। সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়ায় ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামতে লাগে দীর্ঘ সময়। অথচ দেশের তিনটি সড়ক-মহাসড়কের কিছু অংশে টোল আদায় করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সেগুলো হলো-৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নাটোরের হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক, ১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ সড়ক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর-শেরপুর অংশ। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে কোন তহবিল গঠন না হওয়ায় এই টোলের অর্থ চলে যাচ্ছে রাজস্ব খাতে। সড়ক তহবিল সৃষ্টি এবং তহবিলে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে সড়ক মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য সময়োচিত ও অব্যাহত অর্থ যোগান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বোর্ড আইনটি পাস হয়েছিল। ২০১৩ সালের ২২ জুলাই প্রকাশিত আইনটির সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন থেকে জানা গেছে, আইনটি বাস্তবায়নের জন্য বোর্ডে সড়ক বিভাগের সচিব হবেন চেয়ারম্যান। এছাড়া ৬ জন পরিচালনা পর্ষদ এবং একজন নির্বাহী কর্মকর্তা থাকবেন। বোর্ডে থাকবেন সেতু বিভাগের সচিব, অর্থ বিভাগ কর্তৃক মনোনীত অন্য যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ কর্তৃক মনোনীত অন্যূন যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিএমটিএ)-এর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)-এর চেয়ারম্যান, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোনীতে পুরকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপক। বিআরটিএ কর্তৃক মনোনীত সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একজন প্রতিনিধি, বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যিনি সদস্যসচিবও হবেন। আইনটি বাস্তবায়নে সরকারের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও কোনো পদের কর্মকর্তা বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। ফলে দীর্ঘ আট বছর ঝুলে আছে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বোর্ড আইন-২০১৩। অন্যদিকে গত বছর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের টাকা ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আদায়ের আরেকটি নীতিমালা তৈরি করে সরকার। এ নীতিমালাও বাস্তবায়নে দেখা যাচ্ছে ধীরগতি। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা-২০২০-এর খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, সড়ক নির্মাণের পর সেটি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করার উদ্দেশ্যেই এমন উদ্যোগ। খসড়া নীতিমালার ১০ নম্বর ধারায় বলা আছে, সরকার পর্যায়ক্রমে সড়ক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আহরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সড়ক ব্যবহারের অনুপাতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নির্বাহের জন্য ‘রোড মেইনটেন্যান্স ফান্ড’-এর মাধ্যমে অর্থ সংস্থান করা হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ জোগানে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে একটি তহবিল গঠনের আইন পাস হয়। নানা কারণে সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। দেশে নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণে অর্থ ব্যয়ে মন্ত্রণালয়গুলো যতটা আগ্রহী, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ততটা আগ্রহ দেখা যায় না। যদিও সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে টাকা চাওয়া হয়, তা পাওয়া যায় না। যেমন: ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সড়ক সংস্কার ও অবকাঠামো সংরক্ষণে ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও পাওয়া গেছে দুই হাজার ২২৮ কোটি টাকা। একটি সড়ক নির্মাণের পর বছর না ঘুরতেই সেটি বেহাল হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় সরকার নীতিমালা করতে যাচ্ছে, যেখানে ব্যবহারকারীদের টাকা দিয়েই সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, নতুন বিনিয়োগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করবে, নির্মাণ-পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওই প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে আর্থিক সমস্যা দূর করতে সরকার প্রয়োজনে দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে বিকল্প উপায়ে অর্থায়নের চেষ্টা করবে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার একটি বার্ষিক বরাদ্দ কর্মসূচি প্রণয়ন করবে। তা ছাড়া নিয়মিত সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ে যন্ত্রপাতি ইজারা ও ভাড়া দিতে পারবে সরকার। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বোর্ড আইনের আওতায়ই ‘সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা-২০২০’ তৈরি হয়েছে। এতে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে টাকা খরচ হবে, তা ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এখন যে সব সড়ক-মহাসড়ক থেকে টোল আদায় হচ্ছে তার সব অর্থই রাজস্ব খাতে যুক্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান। রক্ষণাবেক্ষনের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এটা তাদের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক হবে। তবে ঠিকাদারকে কত সময়ের জন্য সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা প্রকল্প কাজের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে ঠিক করা হবে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব দীপাঙ্কর মণ্ডল বলেন, দেশে এখন ২২ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক রয়েছে। এ সড়ক মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। সব পক্ষের মতামত নিয়ে দ্রুতই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে। অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, যানবাহন নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, অন্যান্য চার্জ এবং সেতু থেকে টোল আদায় করে কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকা আয় করে। তার সাথে যোগ হবে সড়ক থেকে আদায় করা টোল। এই অর্থ একটি পৃথক তহবিলে জমা করে রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করলে দীর্ঘ সুফল পাওয়া যাবে। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দীন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খাতে চাহিদার ১৩ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশের বেশি অর্থের যোগান দেয়া সম্ভব হয়নি, এজন্য সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খাতে পুঞ্জীভূত দায় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ যোগান ও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ তহবিল গঠন এখন সময়ের দাবি। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক রক্ষাণবেক্ষণে অর্থ সংশ্লিষ্ট সড়কে চলাচল করা যানবাহন থেকে নেয়া হবে, সেটা ভালো উদ্যোগ। তবে এদেশে জনকল্যাণমূলক অনেক আইন পাস হয়; কিন্তু তা কার্যকর হয় না। আমি আশা করব দ্রুত সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বোর্ড আইন ও নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। এছাড়া টোলের টাকা দেয়ার নামে যাতে যাত্রীদের কাছ থেকে পরিবহন মালিকরা বাড়তি ভাড়া আদায় না করতে পারে সেদিকে কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়াতে হবে। নীতিমালার উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতীয় মহাসড়ক ব্যবহার করলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও টোল দিতে হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর পাশাপাশি জাতীয় মহাসড়ক থেকে টোল আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল বোর্ড আইন-২০১৩-এর আওতায় ‘সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা-২০২০’ তৈরি হয়েছে। আর বিলম্ব নয়, চলতি বছরই এটি বাস্তবায়ন হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও বড় বড় মহাসড়ক যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা রংপুর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ এসব মহাসড়কে টোলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কেবল তা-ই নয়, টোলের মাধ্যমে আদায় করা টাকার জন্য একটি আলাদা ব্যাংক হিসাব করতে হবে। সেই টাকা দিয়ে মহাসড়কগুলো সংস্কার করা যাবে বলে তিনি জানান।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১