বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২০ February ২০২১

কাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস  

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলপনা আঁকছেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা    ছবি -পিবিএ


মহান ‘শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ আগামীকাল ২১ ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর পূর্ণ হবে এদিন। ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আজিমপুর কবরস্থানসহ একুশের প্রভাতফেরি প্রদক্ষিণ এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, প্রণয়ন করা হয়েছে শহীদ মিনারে প্রবেশের রোডম্যাপ।

জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ভাষাশহীদদের স্মরণে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হবে। রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ একুশের প্রথম প্রহরে ১২টা ১ মিনিটে সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর পরপরই শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

ঢাকা থাকবে নিরাপত্তার চাদরে : একদিকে যেমন ধোয়ামোছা করে প্রস্তুত করা হয়েছে তেমনি নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন কমিশনার শফিকুল ইসলাম নিরাপত্তার বিষয়টি তদারকি করেন। আজ শনিবার নিরাপত্তার বিষয়টি তদারকি করবেন র্যাবের মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, করোনাকালীন সময়ে মাস্ক ছাড়া শহীদ মিনারে আসা যাবে না। পাশাপাশি এক ইঞ্চিও সিসি ক্যামেরার বাইরে থাকবে না।

তিনি বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে আমরা এবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে যাচ্ছি। চারদিকে করোনা পরিস্থিতি, ভ্যাকসিনেশন চলছে তাতে ভীতি রয়েছে। যে কারণে রাজনৈতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ পাঁচজন এবং ব্যক্তি পর্যায়ে দুজনের বেশি একসঙ্গে শহীদ মিনারে না আসার অনুরোধ করা হচ্ছে। এর বেশি অ্যালাউ করা হবে না, আর মাস্ক ছাড়া তো নয়ই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ মিনার এলাকায় যান চলাচল বরাবরের মতো নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার তিন স্তরের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও থাকবেন।

শফিকুল ইসলাম বলেন, শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার প্রতিটি ইঞ্চি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। ডিএমপি কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। এর পাশাপাশি বোম ডিজপোজাল ইউনিট, সোয়াটসহ অন্যান্য ইউনিটগুলো সক্রিয় থাকবে।

২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম নজরদারি রাখা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বলেন, সাধারণত এ ধরনের দিবসগুলো উপলক্ষে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ছোট ঘটনা ঘটিয়ে হলেও দৃষ্টি আকর্ষণের চেয়ে একটা চেষ্টা থাকে। শহীদ দিবস বাঙালির আবেগের একটি বড় জায়গা। এখানে ছোট্ট একটি ঘটনা ঘটাতে পারলেও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। জঙ্গি কার্যক্রম বা গতিবিধি নজরদারির জন্য আমাদের সাইবার ইউনিটগুলো সক্রিয় রয়েছে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি আছে। আমরা মনে করি এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানোর সাহস তারা পাবে না।

বাঙালি জাতির জন্য এই দিবসটি হচ্ছে চরম শোক ও বেদনার, অনদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। যে কোনো জাতির জন্য সবচেয়ে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার হচ্ছে মৃত্যুর উত্তরাধিকার-মরতে জানা ও মরতে পারার উত্তরাধিকার। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদরা জাতিকে সে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন।

রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের এদিনে ‘বাংলা’কে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ-রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে।

মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

তাদের এই আত্মদান নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম তার ‘বায়ান্নর আগে’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বরকত-সালামকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বরকত-সালাম আমাদের ভালোবাসে। ওরা আমাদের ভালোবাসে বলেই ওদের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। ওরা আমাদের জীবনে অমৃতরসের স্পর্শ দিয়ে গেছে। সে রসে আমরা জনে জনে, প্রতিজনে এবং সমগ্রজনে সিক্ত।’

এদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে আমরা অমরতা পেয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা বলতে পারি দস্যুকে, বর্বরকে এবং দাম্ভিককে : তোমরা আর আমাদের মারতে পারবে না। কেননা, বরকত-সালাম রক্তের সমুদ্র মন্থন করে আমাদের জীবনে অমরতার স্পর্শ দিয়ে গেছেন।’

বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে লিখেছেন : ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি- এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদরা প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোনো আপস চলে না, চলে না কোনো গোঁজামিল। জীবন-মৃত্যুর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন।

মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠীর প্রভুসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং ভাষার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ।

ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন ‘মায়ের ভাষার’ মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নব প্রেরণা। এরই পথ বেয়ে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

পরবর্তী নয় মাস পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে সংযোজিত হয় নতুন এক স্বাধীন সার্বভৌম দেশ- ‘বাংলাদেশ’।

একুশে ফেব্রুয়ারি শোকাবহ হলেও এর যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় তা পৃথিবীর বুকে অনন্য। কারণ, বিশ্বে এ যাবতকালে একমাত্র বাঙালি জাতিই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গত কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১