বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৭ February ২০২১

একটি শহীদ মিনারের গল্প


সাঈদ চৌধুরী

 

 

 

নিঃসঙ্গ গ্রামের পাতাঝরা গজারির বনের ভেতর দিয়ে সরু রাস্তার শেষ প্রান্তে কে জানতো একটা অসাধারণ ভাষার স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে! পাকা রাস্তা ধরে গজারির বনে হলুদ লাল নীল রঙের সমাবেশের পত্রঝরা ভরা বসন্তে গাজীপুরের শ্রীপুরের সিমলাপাড়া হয়ে আকতাপাড়া গ্রামে ঢোকার রাস্তা। লাল মাটির আঠালো লালচে মধুবনের ঠিক ছোট্ট চৌকোনা রাস্তার ধানক্ষেত ঘেঁষা প্রান্তেই দাঁড়িয়ে আছে সবুজ রঙের একটি অসাধারণ কীর্তি ভাষার স্বীকৃতির শ্রদ্ধার অর্ঘ্য একটি শহীদ মিনার।

খুব অবাক হলাম দেখে। ভাবলাম হয়তো এখানে একটি স্কুল আছে আশপাশে। কিন্তু স্কুল খুঁজতে গিয়ে স্কুল তো দূরের কথা, পাইনি কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানও। ফাগুনের সামান্য শীতল, তপ্ত দুপুরে যখন পুরোপুরি নিস্তব্ধ গ্রামে কোনো মানুষের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না, ঠিক সে সময়ই শহীদ মিনারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম পুরো পরিবার। আমার ছোট ছেলেটি জিজ্ঞেস করছিল এটি কী বাবা?

তাকে উত্তর দিতে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে পড়ে গেল, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই ফাগুনের দিনদুপুরের কথাই। ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রদের বুক চিতিয়ে দেওয়া সাহসের বিনিময়ে মুখে আমরা যে ভাষাটি পেয়েছি সে ভাষাতেই সন্তানকে এখন বলতে পারছি- বাবা এটি হচ্ছে শহীদ মিনার। আমাদের ভাষাকে, আমাদের কথা বলাকে, মাকে মা বলে ডাকাকে সহজ করার জন্য কিছু বাচ্চা (আমার ছোট ছেলেটিকে বাচ্চারা বললে সে বুঝতে পারে তার মতোই কেউ হয়তো এ কাজটি করেছে) তাদের জীবন দিয়ে দিয়েছে! ইচ্ছে করে এমন মরণ আর কেউ ভাষার জন্য মরেনি। তাই তারা আমাদের কাছে সম্মানিত, আমাদের কাছে শ্রদ্ধার এবং আমাদের কাছে গর্বের। তাদেরকে মনে করতেই এখানে আসতে হয়। এই ছোট বয়সে ও বুঝতে পারেনি হয়তো আমার কথা কিন্তু ও ঠিকই আমি বলার পর খালি পায়ে দাঁড়িয়েছে শহীদ মিনারের প্রথম সিঁড়িতে।

এর মধ্যে দুই যুবক এলো। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা তো গ্রামেরই ছেলে তাই না? তারা বলল, হ্যাঁ। তারপর বললাম, এই শহীদ মিনারটি দেখে আমি দাঁড়ালাম। শহীদ মিনারটি কে বানিয়েছে বলো তো? ওরা আমাকে জানালো, শহীদ মিনারটি আমরাই বানিয়েছি। আমি বললাম, কেন? ওরা বলল, এখানে আগে আমরা সবাই ছোট্ট ছিলাম। যখন তখন কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়ে ফুল দিতাম। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। কত ফুল দিয়েছি কলাগাছ দিয়ে বানানো সেসব দিনগুলোতে শহীদ মিনারে। অনেক সময় অন্যের বাড়ি থেকে ফুল এনেও শহীদ মিনারে দিতাম!

তারা আরো জানালো, মূলত কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানাতে দেখেই আমাদের চাচারা বলল, দাঁড়া তোদের আমরা শহীদ মিনার বানিয়ে দেব। আকতাপাড়া গ্রামের সিকদার বাড়ির ভাইয়েরা কেউ সিমেন্ট দিলেন, কেউ ইট দিলেন এবং কেউ দিলেন শ্রম। এভাবেই শহীদ মিনারটি তৈরি হয়ে গেল। এ কথাগুলো শুনছিলাম সিকদার বাড়ির যারা এখানে লগ্নি করেছেন, তাদের একজনের মুখ থেকেই।

খুব অন্যরকম অনুভূতি হলো। রাস্তার পাশে কত স্থাপনাই তো থাকে কিন্তু নিজস্ব উদ্যোগে এমন শহীদ মিনার তৈরি করা কতগুলো উদ্যোগ আছে এ দেশে? ভাষা দিবসের ঠিক দুদিন আগে এ বিষয়টি নজরে আসায় অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিল। এই শহীদ মিনারটি সত্যিই শ্রদ্ধার এক অসাধারণ সাক্ষী বলা যেতে পারে। আমাদের চারপাশে যখন আমরা আমাদের অসহ্য বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করি, সেই চিন্তাগুলোর বিপরীতে এই শহীদ মিনারটি একটি আশার প্রতিচ্ছবি হতে পারে। এখানে শহীদদের নামফলক দেওয়া প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেই এখানে প্রয়োজন একটি স্মৃতি স্মারক।

এখানে জমে উঠুক ভাষা আর বর্ণের ঢেউলাগা তারুণ্যের মেলা। এখানে এসে জানুক শিশুরা তাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের আকুতির দায়। আমাদের ভাষাশহীদদের আমরা মনে রেখেছি, তাদের বীরত্বরচিত কর্মের জন্য শ্রদ্ধা জানাচ্ছি এটাই আমাদের জন্য গর্বের ও নিজেদের দায়িত্ব পালনের আনন্দের। এমন কর্ম যারা সম্পাদন করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। রাষ্ট্রীয়ভাবেও ভাষা দিবসের এমন আরো নিদর্শন রক্ষা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে তা-ই প্রত্যাশা। ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা।

 

 

লেখক : রসায়নবিদ ও কলাম লেখক


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১