বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৩ March ২০২১

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ


বাংলাদেশ জনসংখ্যায় বিশ্বে অষ্টম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন ২০১৯ সালের উপাত্ত অনুযায়ী এ জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৭ লাখ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৩%। এখানে শহরাঞ্চলে ২০১০-১৫ সালের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩%। ভাবনার বিষয় হলো, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে শহরাঞ্চলে মানবসৃষ্ট বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং সেইসাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার বা ভোগ করার পর অব্যবহারযোগ্য যে আবর্জনা তৈরি হয় সেগুলোকে বর্জ্য পদার্থ বলে। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন-এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সমস্ত জীবকে রোগের হাত থেকে রক্ষা, পরিবেশ দূষণ ও অবনমন রোধের উদ্দেশ্যে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলা হয়। সাধারণত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বর্জ্য বস্তুর উৎপাদন কমানো। সমন্বিত এবং সম্পূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি জ নীতি প্রয়োগ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে—জবফঁপব (কমানো), জব-ঁংব (পুনর্ব্যবহার) এবং জবপুপষব (পুনশ্চক্রীকরণ)।

জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ মহানগরী। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সেইসাথে বাড়ছে মানুষজনের তৈরি আবর্জনাও। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূলত একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় এবং ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট বর্জ্যের শতকরা ৩৭ ভাগ উৎপাদিত হয় রাজধানী ঢাকায়। তাই এ শহরের ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন পরিকল্পিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডোর)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার এক মাস পর উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় প্রায় তিন হাজার ৭৬ টন যেখানে সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং স্যানিটাইজারের বোতল এই বর্জ্যের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এ ছাড়া এখানে ত্রাণ বিতরণে ব্যবহূত প্লাস্টিকের ব্যাগও ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে পলিথিন ব্যাগের বর্জ্য পাঁচ হাজার ৭৯৬ টন, পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস তিন হাজার ৩৯ টন, সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাভস দুই হাজার ৮৩৮ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক এক হাজার ৫৯২ টন এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ৯০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেছে। ঢাকায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৩১৪ টন সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাভসের বর্জ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রাজধানীতে পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস ৬০২ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক ৪৪৭ টন, পলিথিন ব্যাগ ৪৪৩ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ২৭০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি কাঠামো গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে প্রণীত আইন, নিয়মাবলি, উপ-আইন ও বিভিন্ন বিধিমালা নিয়ে এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে থাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।’ এ ছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ২০১১ সালের ৩০ জুন পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৮ (ক) ধারা যোগ করা হয়। নতুন এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যে সকল বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে সেগুলো হলো—(১) চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা ২০০৮, (২) বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজভাঙার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১, (৩) ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক পণ্য হইতে সৃষ্ট বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১৭ (খসড়া)।

বর্তমানে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা)-এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ঈষবধহ উযধশধ গধংঃবৎ চষধহ নামের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সোশ্যাল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ ওয়েস্ট কনসার্ন, বাসাবাড়ি পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। ইউনিসেফ সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে।

‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫’ অনুযায়ী ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’র খসড়া তৈরি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করা বিষয়ে খসড়া নীতিমালায় একটি বিধান রাখা হয়েছে। বিধানে বলা হয়েছে, যদি কেউ জৈব ও অজৈব  বর্জ্য আলাদা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা জরিমানা করা হবে এবং একই কাজ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ ৪০০০ টাকা জরিমানা করা হবে। বর্জ্যকে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করতে নতুন নীতিমালা বিশেষভাবে সহায়তা করবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখবে। দেশে কার্যকর রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে ‘৩-আর প্রকল্প’ ও ‘৬৪ জেলায় কমপোস্টিং’ প্রকল্পসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকার অনেক প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ প্রতি বছর জাতিসংঘ ঘোষিত ‘বিশ্ব বসতি দিবস’ যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করে। ২০১৯ সালে বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ঋৎড়হঃরবৎ ঞবপযহড়ষড়মরবং ধং ধহ ওহহড়াধঃরাব ঞড়ড়ষ ঃড় ঞৎধহংভড়ৎস ডধংঃব ঃড় ডবধষঃয’ অর্থাৎ ‘বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আলোচ্য প্রতিপাদ্যের বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় হতে সব নির্মিতব্য ভবনে সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনার সংস্থান রেখে ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা ২০০৮-কে হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্পসমূহে ‘সুয়েজ টিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ এবং ‘সলিড ওয়েস্ট ডাম্পিং প্ল্যান্ট’ নির্মাণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্মিত ভবনগুলোতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুয়েজ টিটমেন্ট প্ল্যান্টের সংস্থান করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত সব সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, এনজিও’র সাথে সমন্বয় করে নগরের সৃষ্ট বর্জ্য রিসাইক্লিং করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

বর্জ্য নিয়ে প্রচলিত দুটো কথা হলো—‘আজকের বর্জ্য আগামীকালের সম্পদ’ এবং ‘আবর্জনাই নগদ অর্থ’। উন্নত দেশগুলোতে যেমন সুইডেন ও নরওয়েতে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারযোগ্য লাভজনক ভিন্ন বস্তুতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। এজন্য তারা অন্য দেশ থেকে বর্জ্য আমদানিও করছে। বাংলাদেশেরও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে বর্জ্য সংরক্ষণ, নিরপেক্ষায়ণ, নিষ্ক্রীয়করণ অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ব্যবহার উপযোগী বিভিন্ন নতুন জিনিস বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এতে পরিবেশের সাথে সাথে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ ও দেশের মানুষ।

বাংলাদেশ সরকার রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের নিমিত্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ঢাকাসহ দেশের সকল বিভাগীয় শহরে কমিউনিটিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাসাবাড়ি থেকে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ বর্জ্য নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কম্পোস্ট সার তৈরির লক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সকলের সম্মিলিত প্রয়াস ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সমন্বয়ে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে হবে। আর এভাবেই স্বল্প সম্পদের মাধ্যমে অধিক মানুষের চাহিদা পূরণ করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশেও নিশ্চয়ই এগিয়ে যাবে সে পথেই সফল সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে।

গাজী শরীফা ইয়াছমিন

 পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১