আপডেট : ০৩ March ২০২১
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর কারণ তৈরি করেছিল ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জিতে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবস্থান অর্জন করেছিল। অন্যদিকে ‘পশ্চিম পাকিস্তানে’ জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পেয়েছিল ৮৮টি আসন। নির্বাচনের পর ‘দুই প্রদেশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার’ উদ্ভট দাবি জানানোর পাশাপাশি ঢাকায় আসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সঙ্কটের সৃষ্টি করেছিলেন ভুট্টো। তার এ অস্বীকৃতিকে অজুহাত বানিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন ১ মার্চ। প্রতিবাদে ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ প্রচণ্ড বিক্ষোভ শুরু হয়, দাবি ওঠে স্বাধীনতার। ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ মুজিব। অন্যদিকে জনসভার ঠিক আগের দিন ‘খুনি জেনারেল’ নামে কুখ্যাত লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ গভর্নর পদে নিযুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ৬ মার্চ ‘জাতির উদ্দেশে’ প্রচারিত ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পাকিস্তানের সংহতিবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। গভর্নর পদে টিক্কা খানের নিযুক্তি এবং ভাষণে দেওয়া প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হুমকির প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীনতামুখী আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে উঠেছিল। প্রধান নেতা শেখ মুজিবের মুখে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ৭ মার্চের জনসভায় লাখ লাখ মানুষ যোগ দিয়েছিল। শেখ মুজিব তার ভাষণে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন, ভুট্টোর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এবং সবশেষে বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ‘যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে প্রস্তুত’ থাকার জন্যও আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। অসাধারণ বক্তা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, তার ৭ মার্চের অত্যন্ত জ্বালাময়ী ও আবেগপূর্ণ ভাষণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল হয়ে ওঠা ছাত্র-জনতাকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছিল। ভাষণটি আজ পর্যন্ত শোনার দিক থেকে শেখ মুজিবের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইউনেস্কো এ ভাষণটিকেই সম্প্রতি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ও সম্মানিত করেছে। পর্যালোচনায় দেখা যাবে, ‘মুক্তির সংগ্রাম’ এবং ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারণ করলেও ৭ মার্চের ভাষণে যথেষ্ট সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন শেখ মুজিব। পাশাপাশি তিনি ইয়াহিয়া খানের প্রতি ঢাকায় আসার আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। খোলা রেখেছিলেন আলোচনার দরজা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসেছিলেন ১৫ মার্চ, মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক শুরু হয়েছিল ১৬ মার্চ থেকে। ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতামুখী সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি তখন কিন্তু এ ধরনের বৈঠকের অনুকূল ছিল না। তা সত্ত্বেও বৈঠক সম্ভব হয়েছিল প্রধান একটি কারণে— ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব জাতীয় পরিষদকে বাতিল ঘোষণা করেননি বরং বলেছিলেন, অধিবেশনে তিনি বসবেন যদি প্রেসিডেন্ট চারটি দাবি মেনে নেন— (১) অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে; (২) সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে; (৩) সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার করতে হবে; এবং (৪) জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। ১৬ মার্চ থেকে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট হাউজে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বঙ্গবন্ধু এসব দাবিরই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। বিশেষ করে সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেছিলেন, এ দুটির কম কোনো কিছুই পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট হবে না। জবাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, সংবিধান প্রণয়নের আগে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলে আইনগত শূন্যতা ও জটিলতার সৃষ্টি হবে। এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দু’পক্ষের আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া খানও সম্মত হয়েছিলেন। ১৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই মুজিব-ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং ইয়াহিয়া খানের পক্ষে লে. জেনারেল শরীফ উদ্দিন পীরজাদা, বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস ও কর্নেল হাসান বৈঠকগুলোতে অংশ নিয়েছেন। এসব বৈঠকেও আইনগত শূন্যতা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে যুক্তি উপস্থিত করা হয়েছিল। পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা আদেশ জারি করতে পারেন, যা সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং সংবিধান গৃহীত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কে আইনি ভিত্তি দান করবে। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ১৭ মার্চের একান্ত বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু নতুন এক প্রস্তাবে বলেছিলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের’ জাতীয় পরিষদ সদস্যরা প্রথমে পৃথক পৃথক অধিবেশনে দুই অঞ্চলের জন্য দুটি সংবিধান রচনা করবেন এবং পরে এক যৌথ অধিবেশনে ওই দুটির ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হবে। দু’পক্ষের উপদেষ্টাদের বৈঠকে তথ্যটি জানিয়ে জেনারেল পীরজাদা আরো বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছেন— যে ঘোষণাকে সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং নতুন সংবিধান গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ১৭ মার্চের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া তৈরি করার আগে উভয় পক্ষের আইন উপদেষ্টারা শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক যৌথ বৈঠকে মিলিত হবেন। ১৯ মার্চ আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইয়াহিয়া খান নিজেদের উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত ঘোষণায় নিচের তিনটি মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হবে— (১) সামরিক আইন প্রত্যাহার, (২) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, এবং (৩) পূর্বাঞ্চলীয় অংশের (‘পূর্ব পাকিস্তান’) জন্য ব্যাপকভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন। ২১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া আওয়ামী লীগের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই খসড়ায় ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের’ জাতীয় পরিষদ সদস্যদের পৃথক পৃথক অধিবেশনের প্রস্তাব ছিল। খসড়ার অন্য এক প্রস্তাবে বলা হয়, প্রদেশগুলোতে মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার দিন থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। আওয়ামী লীগ খসড়া ঘোষণাটিকে ‘অসম্পূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিল— (১) প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটি অবিলম্বে প্রচার করতে হবে; এবং (২) প্রদেশগুলোতে নতুন গভর্নর নিযুক্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অথবা প্রেসিডেন্টের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার সাতদিনের মধ্যে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে। ২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউজে আগের দিন ঢাকায় আগত ভুট্টোকে তার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। অন্যদিকে কেন্দ্রের আগে প্রদেশগুলোতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সামরিক আইন প্রত্যাহারের প্রশ্নে ভুট্টো বলেছিলেন, তেমন কোনো সমঝোতাকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য হলেও প্রথমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসতে হবে। কথাটার মধ্য দিয়ে ভুট্টো প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেদিনের বৈঠকে ইয়াহিয়ার পক্ষে একের পর এক সংশোধনী আনার ফলে উপদেষ্টাদের সান্ধ্য বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়ে যায়। উল্লেখ্য, ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে গাড়িতে প্রেসিডেন্ট হাউজে গিয়েছিলেন, সে গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা লাগানো ছিল। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান ও তার উপদেষ্টারা। ২৪ মার্চের সর্বশেষ বৈঠকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টারা প্রেসিডেন্টের ঘোষণা চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দেন। কিন্তু সান্ধ্য বৈঠকে জানানো হয়, ইয়াহিয়ার প্রতিনিধিরা আগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরে আওয়ামী লীগকে অবহিত করবেন। জেনারেল পীরজাদা জানিয়েছিলেন, তিনি পরদিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ কোনো এক সময়ে ড. কামাল হোসেনকে টেলিফোনে জানাবেন, কখন তারা আবার বসবেন এবং প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটি কবে প্রচার করা হবে। এভাবেই মুজিব-ইয়াহিয়ার এবং দুজনের উপদেষ্টাদের মধ্যকার আলোচনার সমাপ্তি ঘটেছিল। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতারা ২৫ মার্চ সারাদিন অপেক্ষায় কাটিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল পীরজাদা যেমন কোনো টেলিফোন করেননি, তেমনি প্রচারিত হয়নি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সেই ঘোষণাটিও— যার জন্য এত সময় নষ্ট করা হয়েছিল। অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে ড. কামাল হোসেন লিখেছেন, ‘আমি যখন (২৫ মার্চ) রাত ১০টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিই, তখনও তিনি জানতে চেয়েছিলেন তেমন কোনো টেলিফোন আমি পেয়েছি কি না। আমি তাকে জানিয়েছি যে, আমি কোনো টেলিফোন পাইনি (দেখুন ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’, ১৫শ খণ্ড)।’ উপরের বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনার ভিত্তিতে বলা যায়, পাকিস্তানিদের সর্বাত্মক উসকানির মুখেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মতান্ত্রিক পথের বাইরে পা রাখেননি। ছিলেন ধীর-স্থির। অন্যদিকে ভুট্টো এবং রক্তপিপাসু জেনারেলদের উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে প্রতিহত করা। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। এদেশের জনগণই বিজয়ী হয়েছে। লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১