আপডেট : ১২ March ২০২১
বরগুনার আমতলী পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল বিপণি বিতান। মালিক মেয়র মতিয়ার রহমান। চুক্তিপত্র বলছে, ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮ হাজার ৫৪০ টাকায় ৩ বছরের জন্য এই জমি লিজে নেন মেয়র মতিয়ার রহমান। শর্ত ছিল এই জমিতে তিনি মৎস্য চাষ করবেন। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি কিংবা গরু-ছাগল লালন-পালন করবেন। তবে কোনো স্থায়ী স্থাপনা করা যাবে না। লিজের সময় শেষ হয়েছে আরো ৫ বছর আগেই, তবে জমির দখল ছাড়ছে না মেয়র। বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মাদ কাইছার আলম বলেন, ৫ বছর আগেই এর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু মেয়র তার দখলদারিত্ব ছাড়ছেন না। বারবার নোটিশ দিয়ে তাকে উচ্ছেদ করে আমাদের দখলে নিতে পারছি না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেয়র মতিয়ারের নিজের বাড়িটিও দখল করা জমির ওপর। আমতলী পৌরভবনের পাশের জমিটিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ২৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে মেয়র দখল করেছেন তিন একর জমি। মোহাম্মাদ কাইছার আলম বলছিলেন, একাধিকবার আমরা নোটিশ করেছি। নোটিশের জবাব তো পাইনি উল্টো তার হুমকির ওপর আমাদের তটস্থ থাকতে হয়। শুধু কি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা। পুরো পৌর এলাকায় ফাঁকা জায়গা দেখলেই তিনি দখল করে নিয়েছেন। তার দখদারিত্বে এলাকার শতশত মানুষ নিঃস্ব। বরগুনার তালতলির এই মেয়রের বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনুসন্ধানও শুরু করেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যক্তি মালিকানার জায়গা কোনো রকম নোটিশ বা টাকা না দিয়েই পার্ক তৈরির নামে দখল করা হয়েছে। যদিও সেখানে পার্ক করা হয়নি, উল্টো কৃষি জমির মালিকরা এখন নিঃস্ব। জমির মালিকদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ ও মোহাম্মদ সাইদুর রহমান নিজেদের অসহায়ত্তের কথা জানান। তারা বলেন, এই জায়গা তাদের নিজেদের সম্পত্তি ছিল। অথচ মেয়র রাতারাতি পার্ক করার নামে দখল করে নিয়েছেন। অথচ এখানে কোনো পার্ক নির্মাণ করা হয়নি। এটি এখন মেয়র তার নিজের কব্জায় রেখেছেন। তারা বলেন, সরকার যদি কোনো কিছু করতে চায় তবে জমি অধিগ্রহণ করে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা টাকা পায়। কিন্তু মেয়র আমাদের সহায় সম্বল শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছে। সাংবাদিকদের তথ্য দেওয়ার কারণে মেয়রের বাহিনীর নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন তারা। অনুসন্ধানে জানা যায়, কবরস্থান নিয়েও মিথ্যাচার আর লুটপাট করতেও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। কেন্দ্রীয় করবস্থানের নামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে কয়েকবার লাখ লাখ টাকা তুলে নেন মেয়র মতিউর রহমান। যদিও পৌরসভার নিজস্ব কোনো করবস্থান নেই। আবার কবরস্থান না থাকলেও, কয়েকবার কবরস্থান নির্মাণ এবং সংস্কারের জন্য লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মোয়াজ্জেম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, পৌরসভাতে কেন্দ্রীয় কোনো গোরস্থান নেই। অথচ কবরস্থান স্থাপনের নামে হাতিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। আবার ভুয়া সেই কবরস্থানের সংস্কারের নামেও উঠেয়েছেন টাকা। স্থানীয় লোকজন বলছেন, এ যেন ইচ্ছা পূরণের রাজত্ব চলছে বরগুনা জেলার আমতলীর পৌরসভা এলাকায়। কারণ আমতলী পৌর মেয়রের দখলদারিত্ব আর দুর্নীতির কারণে নাভিশ্বাস বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ নিরীহ জনগণের। যেখানেই ফাঁকা জায়গা সেটির দিকে নজর মেয়র মতিয়ার রহমানের। তার দখলদারিত্বের বিচার পাচ্ছে না সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ মানুষ। কথা হয় আফজাল মিয়ার সাথে। তিনি জানান, জীবন সায়াহ্নে এসে আজ দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নিজের ধানিজমি ফিরে পাবার আশায়। অভিযোগ করেন তার জমিতে হঠাৎই একদিনে বালি ভরাট করেন পৌর মেয়র মতিয়ার। এমন ভাবেই জমি হারিয়েছেন ওই এলাকার আর ১২ টি পরিবার। স্থানীয়রা বলছেন, আমতলী পৌরসভার গরুর হাটের অংশ বাড়াতেই এই কাজ করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা নয়, দখল হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গাও। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ একর জমি অবৈধ ভাবে দখলে নিয়ে হাটের অংশ করা হয়েছে। এমন অবস্থায় ভুক্তভুগীদের পাশে দাঁড়ায় আদালত। ২০২০ সালে দখল কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ দিলেও তা তোয়াক্কা করেনি পৌর মেয়র। এ বিষয়ে মেয়রের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাড়া নেনি। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মাদ কাইছার আলম আরো বলেন, একজন পৌর মেয়রের সাথে আইনি লড়াইয়ে আমরা অনেকটা ক্লান্ত। ২০১৬ সালের ১ মার্চ মেয়র মতিয়ার রহমানকে সরকারি জায়গা থেকে উচ্ছেদের নোটিশ দিলেও পাত্তা দেননি। সেই থেকে একের এক আইনি নোটিশ দিলেও কাজ হয়নি। একজন জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও তার যে দখলবাজি ও লুটপাট মেয়র মতিয়ার তার জলন্ত উদাহরণ। কোনো আইনি ব্যবস্থা আমরা তার বিরুদ্ধে নিতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। জানা যায়, মেয়রের এমন দখল বাণিজ্য আর লুটপাটের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন ঢাকায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন গত ৭ ডিসেম্বর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকে মেয়রের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে হচ্ছে এমন খবরে এলাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস এসেছে। তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ ভুক্তভোগীরা পরিত্রাণের আশায় বারবার ধর্ণা দিচ্ছেন নানা মহলে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই এলাকায় সরেজমিনে যাওয়াও হয়েছে। কিছু ভুক্তভোগীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। দ্রুতই এ অনুসন্ধানের প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। পরবর্তীতি পর্যালোচনা করে মামলার অনুমোদন দিলে মামলা দায়ের করা হবে। মেয়র মতিয়ারের এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, আমরা বিষয়টি খোঁজখবর রাখছি। যদি তার বিরুদ্ধে এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হয় তবে আইনগতভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১