বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৪ March ২০২১

মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে


ইলিয়াছ হোসাইন

 

 

 

বর্তমানে মাদক বাংলাদেশের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনোভাবেই যেন তা নির্মূল করা যাচ্ছে না। সমাজে নিত্যদিনে যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তার পেছনে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কখনো কখনো গুরুতর অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না মাদকসেবীরা। চুরি, ছিনতাই, হত্যা এসব যেন তাদের অর্থ উপার্জনের মূল হাতিয়ার। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তরুণসমাজ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে ভয়ানক এ নেশার সাথে। মদ, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল এসবের তুলনায় বাংলাদেশে ইয়াবা বেশি জনপ্রিয়। কারণ এটি সহজে বহন করা যায় এবং দামও বেশ কম। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে এর বিস্তার। বিশেষ করে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রাম অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এসব কিছুতে জড়িয়ে পড়েছে। হাত বাড়ালে এখন খুব সহজেই পাওয়া যায় মাদক। তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে। এর তিন ভাগের দুই ভাগই তরুণ। তরুণ প্রজন্ম আমাদের আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। সেই তরুণ প্রজন্ম যদি নেশার সাথে এভাবে জড়িয়ে পড়ে তাহলে দেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। সর্বনাশা মাদকের কারণে যুবসমাজ যে শুধু মেধাশূন্য হচ্ছে তা নয়, মাদকাসক্তদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধও লোপ পাচ্ছে। নেশার জন্য বাবা খুন হচ্ছে সন্তানের হাতে। জানা যায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার মাদকাসক্ত চিকিৎসা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় নয় হাজার ইয়াবাসেবী। মাদক গ্রহণের ফলে সর্বদিকে যেমন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে ঠিক তেমনি শারীরিকভাবেও ভেঙে পড়ে। একটানা অনেক দিন মাদক সেবনের ফলে তাদের নার্ভগুলো সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে দেশে ইয়াবা আসক্তির সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একজন মাদকাসক্ত তার নেশার পেছনে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০০ থেকে সর্বনিম্ন ৫০ টাকা খরচ করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দৈনিক খরচ ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। আরো এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অবৈধ মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটির বেশি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ভয়ংকর চিত্র হচ্ছে, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া ইয়াবার শতকরা ৮৫ ভাগই ভেজাল। নকল ইয়াবা তৈরি করে দাম কমিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মাদকাসক্তরা নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। আর হারিয়ে যাচ্ছে এদেশের তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনা। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে মাদক প্রবেশ করছে। মূল পয়েন্ট হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফ হয়ে মিয়ানমার থেকে মাদক আসছে। দেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকার তথ্যমতে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল-চৌফলদণ্ডী ব্রিজের পাশের নোঙর করা একটি নৌকা থেকে ৭ বস্তা ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ৭ বস্তায় ১৪ লাখ ইয়াবা ছিল। এতে বোঝা যায় দেশে কি পরিমাণ মাদক ঢুকছে প্রতিনিয়ত। এ ছাড়া বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক আসছে। সূত্র বলছে, দেশের প্রায় ৫১২ টি পয়েন্টে প্রতিদিন মাদক আসছে। বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ইয়াবা ঢুকছে সীমান্ত দিয়ে। দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। সংঘবদ্ধ চোরাচালানি চক্র দেশে দেশে মাদক ছড়িয়ে দিতে নানা কৌশল অবলম্বন করে। বাস, ট্রাক, ট্রেন ছাড়াও গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে করে মাদক সরবরাহ করে। কিছুদিন আগে আমরা দেখতে পেলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ আড়াল করতে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে মাদক পাচারের সময় তা আটক হয়, যা ছিল একদমই কল্পনাতীত। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে, বিভাগ অনুযায়ী মাদকসেবী সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঢাকা বিভাগে ৩৬ দশমিক ৮০ শতাংশ, এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ১৩ দশমিক ৯০ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ, সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আরো বলা হয়, পুরুষদের মধ্যে মাদকসেবী ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নারীদের মাঝে দশমিক ৬ শতাংশ। পেশা অনুযায়ী মাদকসেবীদের হার শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, এরপর বেকার জনগোষ্ঠী। তাই মাদকের এ ভয়াল থাবা থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে  কর্তৃপক্ষকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাড়াতে হবে আইনশৃঙ্খলার কঠোর নজরদারি। বিশেষ করে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। তরুণ-তরুণীরা যাতে মরণঘাতী মাদকের সাথে জড়িয়ে না পড়ে সেজন্য অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সেইসাথে সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়িত্ব আপনাদেরই। এজন্য সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। অসৎ সঙ্গ ত্যাগ এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পাঠ্য বইয়ে এর কুফল তুলে ধরা যেতে পারে। যারা দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সেসব অপরাধীচক্রকে খুঁজে বের করে আইনের কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। তাহলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার যে ঘোষণা দিয়েছেন তা সফল হবে। অন্যথায় এ ঘোষণা সত্যিই বৃথা যাবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং সোনার বাংলা গড়তে হলে অবশ্যই মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। তাই আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ গড়ে তুলি, আলোকিত ও সৃজনশীল সমাজ গড়ি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১