বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২০ March ২০২১

হারিয়ে যাওয়ার আগে নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে


সুমনা আক্তার

 

 

 

‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখ মাসে বাংলার নদীর যে চিরন্তন রূপ বর্ণনা করেছেন, সে রূপ যেন এখন প্রমত্ত পদ্মা, মেঘনা, যমুনাতেও দেখা যায় না। নদী যাতে তার নিজস্ব রূপ, সৌন্দর্য ও শোভা নিয়ে সগৌরবে ধরণীর বুকে বেঁচে থাকতে পারে, সেই লক্ষ্যেই প্রতি বছর ১৪ মার্চ নদী রক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিচালনার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া নদীকে আবারো সজীব করে তোলা এবং প্রাণবন্ত নদীগুলোকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করাই যেন নদী রক্ষা দিবসের মূল অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের শোভা বাড়িয়ে তোলা প্রবহমান নদীগুলো যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। নদীর বুকে ভাসানো রঙিন সাম্পান নৌকা, পালতোলা নৌকায় বৈঠা হাতে মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান, নদীতে লঞ্চ বা ট্রলারের পিছনে জলের বুকে ভেসে ওঠা শত শত শিকারি পাখির ছোটাছুটি সবই যেন আশ্রয় নিতে চলেছে সোনালি অতীতের খাতার পাতায়। নদী গবেষকদের মতে, একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। শিশু একাডেমি প্রকাশিত বিশ্বকোষে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা বলা হয়েছে সাতশ’র অধিক। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই নদীগুলোর মধ্যে বর্তমানে ১৭টি নদী তার চরিত্র সম্পূর্ণ হারিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরো ২৫টি নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ষাটের দশকে সাড়ে সাতশ নদী থাকলেও বাংলাদেশে বর্তমানে এ সংখ্যা কমে মাত্র ২৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। ৫০ বছরে ধ্বংস হয়েছে ৫২০টি নদী।

বিভিন্ন কারণে নদী হারিয়ে যাচ্ছে। একেকটি নদী যেন কালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসে আশ্রয় নিতে চলেছে। নদী ও বাংলাদেশ একই সুতোয় বাঁধা দুটি নাম। এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই এই নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে। আমরা লক্ষ করলেই দেখতে পাব কলকারখানা, গৃহস্থালির বর্জ্য অপসারণের জন্য আমরা নদীকেই বেছে নিয়েছি, যে নদী হতে পারতো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। নদীতে কারখানার ৬০ ভাগ বর্জ্য, ঢাকা ওয়াসা এবং সিটি করপোরেশনের ৩০ ভাগ বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে ১৩ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর জমা হয়েছে। এগুলো অপসারণের জন্য জোরালো ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

হিমালয় থেকে ছুটে আসা অসংখ্য নদনদীর প্রবাহের সঙ্গে বহমান বিন্দু বিন্দু পলিমাটি হাজার বছরের পরিক্রমায় গড়ে তুলেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ, যার নাম বাংলাদেশ। নদীর বয়ে আসা পলিমাটিতেই বাংলাদেশের কৃষি জমি অত্যন্ত উর্বর হয়। সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে দেশে ৯৯% মানুষের মাঝে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আর এতে নদীর অবদান ব্যাপক। কিন্তু মানবসৃষ্ট দূষণের কবলে পরে গত তিন যুগে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বিলীন হয়েছে। এমতাবস্থায় দেশের নদী খনন অত্যন্ত জরুরি। কারণ ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথের মধ্যে এখন মাত্র ৫ হাজার কিলোমিটার নদীপথ আছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আদিমকাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি যাতে নদী নানাভাবে সহায়তা করে আসছে।  বর্তমানে অধিকাংশ নদীই গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে যাওয়ার কারণে অনাবাদি রয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণেই নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা পানি ধারণ করতে পারে না। যার ফলাফল হচ্ছে ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪, ২০০৭ সালের মতো প্রলয়ংকরী বন্যা।

নদী একটি দেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু এর সঠিক পরিচর্যা না করলে জনজীবনে তা অভিশাপ হয়ে দেখা দিতে পারে। যেমন : সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে গোমতী নদী কুমিল্লার দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ না থাকায় দেশের উত্তর জনপদের বিভিন্ন জায়গায় শত শত একর জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। তিস্তার আশপাশ এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে গোটা উত্তর অঞ্চলে মরুময়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা, সুখ-দুঃখ, আবেগ-ভালোবাসা, ইতিহাস, ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীপথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের বাংলাদেশে যানজটের সমস্যা প্রবল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় তো এখন রীতিমতো যান্ত্রিকতার বাতাস বয়। ‘নাম্বিও’ নামের একটি গ্লোবাল ডেটাবেসের সমীক্ষায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে বিশ্বের সর্বাধিক যানজটের শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এমতাবস্থায়, নদীপথকে কাজে লাগিয়ে আমরা যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারি। তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা ও যুগোপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে অগ্রসর হতে হবে।

দেশের বহু নদীর পাড় দখল করে প্রভাবশালীরা তাদের ব্যবসা, বহুতল ভবন বানিয়ে রেখেছে। ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নিরক্ষর, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ অবৈধভাবে নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ৪৮ জেলার অবৈধ দখলদারের ৪৯ হাজার ১৬২ জনের একটি তালিকা করেছে। সেসব দখলকারীর তৈরি করা স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে হবে। মানুষের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও নদী ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল রয়েছে নদীতে। নদী হারিয়ে গেলে নদীর আপন সৌন্দর্যের সাথে সাথে এসব প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থলও হারিয়ে যাবে, যা আমাদের পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

উদ্যম জলের কল্লোলে মাতোয়ারা এই নদী দেশের সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও যাত্রী পরিবহন, প্রত্যন্ত স্থানগুলোর সাথে যোগাযোগ, নির্মল পানি সরবরাহ, কৃষিজমিতে পলি সরবরাহ, কৃষিজমিতে পানি সেচ, মাছের সরবরাহ বৃদ্ধি, পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সামুদ্রিক বন্দরে পণ্য জোগান এবং আমদানি পণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন প্রভৃতি উন্নয়ন কাজে এদেশের নদীগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তাই দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থেই নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের গতিপথ ও নাব্যতা। নদী তার অপরূপ সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। তাই আমাদেরও নদী রক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। প্রচলিত আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। নদী রক্ষার জন্য সবার মাঝে তৈরি করতে হবে সচেতনতা।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১