আপডেট : ২৫ March ২০২১
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে নূহ-উল-আলম লেনিন একটি অতিপরিচিত নাম। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির পথ চলতে শুরু করেছিলেন বামধারার ছাত্র সংগঠনের সদস্য হিসেবে। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)-এর সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হন। অংশ নিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় সদস্য, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি গত এক দশক দলটির মুখপত্র উত্তরণের সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্বও পালন করেছেন। রাজনীতিক নূহ-উল-আলম লেনিন রাজনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে জাতীয় দৈনিকসমূহে নিয়মিত কলাম লেখেন। টেলিভিশন টক শোতে তিনি অত্যন্ত পরিচিত মুখ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দৈনিক বাংলাদেশের খবর মুখোমুখি হয়েছিল তার। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন অনেক কথা। বাংলাদেশের খবরের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন। বাংলাদেশের খবর : আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। আজ সেই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো। আপনার অনুভূতির কথা জানতে চাই। নূহ-উল-আলম লেনিন : প্রথমেই আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার আহ্বানে আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মদানকারী ত্রিশ লাখ শহীদের প্রতি এবং সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোনের প্রতি। এটা আমাদের জন্য পরম গৌরবের বিষয়, আমরা সেই প্রজন্ম, যারা একটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্মযুদ্ধে জড়িত ছিলাম এবং সেই জাতি-রাষ্ট্রের সুবর্ণজয়ন্তী পর্যন্ত বেঁচে আছি। বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের গৌরবের অন্ত নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মনে হতো, সেই বিখ্যাত কবিতা-‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়।’ শৈশব-কৈশোর থেকেই কবিতার এ কথাগুলো আমাদের আন্দোলিত করত। আবেগ তাড়িত করত। ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টি হলো। কিন্তু আমাদের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র আমরা পেলাম না। তা ছিল কেবলই মালিকানা বদল। এক উপনিবেশ থেকে আরেক উপনিবেশের কবলে পতিত হলাম আমরা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা যেমন ভারতবর্ষকে মনে করত তাদের নিজস্ব জমিদারি, নিজস্ব সম্পদ, তেমনি পাকিস্তানিরা আমাদের দেশকে তাদের জমিদারি মনে করত। এক প্রভু বিদায় নিয়ে আরেক প্রভু আমাদের ওপর জেঁকে বসল। এক ঔপনিবেশিক শক্তি বিদায় নিয়ে আরেক ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের ওপর চেপে বসল। তারা আমাদের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন চালাল, তাতে এদেশের রাজনৈতিককর্মী, সাংস্কৃতিককর্মী, বুদ্ধিজীবীসমাজ ও মেহনতি মানুষের ধারণা জন্মাল, আমরা যে রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, এ রাষ্ট্রটি সেটা নয়। ফলে ১৯৪৮ থেকে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এদেশের মানুষ একটি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জীবনপণ লড়াই করেছে। সে লাড়াইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে এদেশের মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে অনেক অমানুষিক নির্যাতন, জেল-জুলুম। দিতে হয়েছে জীবন। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বাঙালি আত্মোৎসর্গ করেছে। দুই লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিশেষত্ব হলো, একটি অসামরিক জাতির বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সামরিক জাতিতে পরিণত হওয়া। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সশস্ত্র লড়াইয়ের শুরু, তা-ই বাঙালি জাতিকে যোদ্ধা জাতিতে পরিণত করে। তারা একটি প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি। সেজন্য আমি অহংবোধ করি। এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন, শ্রেষ্ঠ গৌরব। অনুভূতির কথা এককথায় প্রকাশ করা অসম্ভব। শুধু বলতে চাই, ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদান বিফলে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হলে এদেশ অনেক আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতো। বিলম্বে হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশের খবর : মুক্তিযুদ্ধকালে বিশেষ কোনো স্মৃতির কথা বলুন। নূহ-উল-আলম লেনিন : আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলাম। আমাদের একটি গেরিলা বাহিনী ছিল। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মানিকগঞ্জ, ঢাকা দক্ষিণ ও মুন্সীগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা)। আমরা আত্মগোপনে থেকে কাজ করছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে পাক হানাদার বাহিনী গ্রামাঞ্চলের ক্যাম্প গুটিয়ে ঢাকার দিকে পশ্চাদ্পসারণ করতে শুরু করেছিল। ওই সময়ে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থেকে ক্যাম্প গুটিয়ে একটি লঞ্চে করে পাক বাহিনী ইছামতী নদী দিয়ে ঢাকার দিকে আসছিল। আমি তখন শ্রীনগর থানার শিবরামপুরে অবস্থান করছিলাম। জায়গাটি শ্রীনগর, নবাবগঞ্জ ও সিরাজদিখান থানার সঙ্গমস্থল। আমরা জানতে পারলাম পাকবাহিনী ঢাকার দিকে মুভ করবে। মুক্তিবাহিনী এবং আমাদের গেরিলারা অ্যাম্বুশ করল। ওরা আমাদের ফাঁদে পড়ে গেল। মুক্তিবাহিনীর হঠাৎ আক্রমণে ওরা ভড়কে যায় এবং প্রতিরোধের চেষ্টা না করে পালাতে শুরু করে। একদল গুলি করতে করতে লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে, কিছু সংখ্যক হানাদার নদীতে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে পালাবার চেষ্টা করে। সে সময় গ্রামের নারীরা দা, বঁটি, কুড়াল, খুন্তা নিয়ে তীরে ওঠা হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা বেশ কয়েকজন হানাদারকে কুপিয়ে মেরে ফেলে। কয়েকটিকে ধরে মুক্তিবাহিনীর হাতে সোপর্দ করে। সেদিন শিবরামপুরের নারীদের চোখে-মুখে আমি দেশপ্রেম, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রোশ এবং স্বাধীনতা অর্জনের যে প্রত্যয় দেখেছিলাম তা আজো ভুলতে পারিনি। তাদের এ বীরত্বের কথা হয়তো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি, তবে আমরা যারা তার প্রত্যক্ষদর্শী, তারা তা কোনোদিনই বিস্মৃত হতে পারব না। সেদিন আমার মনে ধারণা দৃঢমূল হয়, যে দেশের নারীরা এমন দেশপ্রেম আর বীরত্বের অধিকারী, সে দেশ স্বাধীন না হয়ে পারে না। বাংলাদেশের খবর : বলা হয়ে থাকে, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা সমার্থক । আপনার মূল্যায়ন কী? নূহ-উল-আলম লেনিন : কথাটির মধ্যে একটি কাব্যিক দ্যোতনা আছে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, এবং স্বাধীনতা একটির সাথে আরেকটি নিবিড়ভাবে যুক্ত। একটি ছাড়া আরেকটি সম্পূর্ণ নয়। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। একটি ছাড়া আরেকটি ভাবা যায় না। এখন আসি কীভাবে এটা হলো সে কথায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-তে ৬ দফা ঘোষণা, আগরতলা মামলা, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একসূত্রে গাঁথা। এ ঘটনাগুলোর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যক্ষভাবেই জড়িত ছিলেন। এক সময় তিনি পৌঁছে যান কেন্দ্রবিন্দুতে। মুজিব ভাই থেকে পরিণত হন বঙ্গবন্ধুতে। সবশেষে অভিষিক্ত হন জাতির পিতা অভিধায়। এজন্য তাকে পার হতে হয়েছে অনেক চড়াই-উতরাই। সহ্য করেতে হয়েছে জেল-জুলুম-নির্যাতন। আমাদের এই দেশের স্বাধীনতার কথা আগেও অনেকে বলেছেন। কিন্তু গোটা জাতিকে তারা উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি। বলা যায়, এদেশের মানুষ তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। তা ছাড়া স্বাধীনতা বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো ও শক্তি দরকার সেটাও তাদের ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার কথা বললেন, তখনই এদেশের আপামর জনসাধারণ তাতে বিশ্বাস স্থাপন করল, তার প্রতি আস্থা স্থাপন করল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু কায়দা করে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নামতে হলে তার ক্ষেত্র তৈরি করতে হয়, জনগণকে প্রস্তুত করতে হয়। বঙ্গবন্ধু এটা জানতেন বলেই জাতিকে সে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। জাতি প্রস্তুত হয়েছিল। আমরা ৭ মার্চের পরেই যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে থাকি। আমরা এটা ধরে নিই যে, আমাদের যুদ্ধ করতে হবে, যুদ্ধ ছাড়া ফয়সালা হবে না। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বঙ্গবন্ধু অ্যারেস্ট হলেন। মুক্তিযুদ্ধের গোটা সময় তিনি অনুপস্থিত থাকলেন। তিনি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত ছিলেন এটা সত্যি, তবে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সহকর্মীরা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন তারই নামে। একাত্তরে ‘শেখ মুজিব’ শব্দ দুটি ছিল এদেশের মানুষের মনে সাহসসঞ্চারী মন্ত্রসম। বাংলাদেশের খবর : আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি শোষণহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? নূহ-উল-আলম লেনিন : সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছে কি হয়নি, তারচেয়ে বড় প্রশ্ন সে লক্ষ্যে আমরা কতটুকু কাজ করেছি। অতিসম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত আমার একটি নিবন্ধের অংশ বিশেষ পড়ে শোনালেই আপনি এ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন আশা করি-‘গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের গৌরব করার মতো অনেক অর্জন আছে। দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। নারীর ক্ষমতায়ন অগ্রসর হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। কিন্তু সব ম্লান করে দিচ্ছে ধন-বৈষম্য। ধনী-গরিবের বৈষম্য আমাদের স্বাধীনতাকে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারকে অর্থহীন করে তুলছে। সম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। মুক্তির সংগ্রাম একটি অব্যাহত চলমান প্রক্রিয়া।’ বাংলাদেশের খবর : সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। এ ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় কী বলে আপনি মনে করেন? নূহ-উল-আলম লেনিন : দুর্নীতির করালগ্রাসে আমরা নিপতিত সন্দেহ নেই। এর প্রকোপে আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গীকার, মানে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সামাজিক মুক্তির পথে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। সম্পদ বাড়ার সাথে সাথে রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নও প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমাদের সকল কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি এখন অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আমরা যে পথে অগ্রসর হচ্ছিলাম, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড তাকে থামিয়ে দেয়। এখন আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশ। মুক্তবাজার কাঠামোর মধ্যেই আমরা উন্নতি করেছি। প্রাথমিক পুঁজি সঞ্চয়ের নামে নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজিবাজার দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের জন্ম দেয়। কারণ ব্যবসায়ীরা যে-কোনো আইনি বা বেআইনি উপায়ে অর্থ উপার্জনের দিকে ধাবিত হয়। রাজনীতিও তার মর্মবাণী থেকে সরে গেছে। এখন রাজনীতি মানেই হলো আয়ের পথ-‘এ ওয়ে অব আর্নিং।’ আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা না হলে এ সর্বনাশা প্রবণতা রোধ অসম্ভব। কারণ এ মুহূর্তে নতুন কোনো কাঠামোতে প্রবেশ করে বাজার বা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। যা করতে হবে তা বিদ্যমান কাঠামোতেই করতে হবে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার অর্থনীতিকে আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তা সম্ভব হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে, বিশেষত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কান্ট্রিগুলোতে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তারা সাফল্য অর্জন করেছে। বাণিজ্যিক অর্থনীতির বদলে শিল্পনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। কারণ একজন শিল্পমালিক তার শিল্প রেখে কখনোই দেশ ছেড়ে চলে যাবেন না। উদাহরণ হিসেবে ওয়ান-ইলেভেন সময়কার কথা বলতে পারি। সে সময় অনেক ব্যবসায়ী বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বসুন্ধরা গ্রুপের মতো আরো অনেক শিল্পমালিক দেশত্যাগ করেননি। কেননা তারা যে সম্পদ অর্জন করেছেন, তা দেশেই বিনিয়োগ করেছেন। তারা শোষক না সাধু সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এটুকু অবশ্যই বলব, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেমিক বুর্জোয়া শ্রেণি সৃষ্টি করাই হবে সঠিক কাজ। পুঁজির বিকাশের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থানে নিতে পারলে এবং আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে পারলে লাগামহীন দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা সম্ভব হতে পারে। কেবল জেলে পুরে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই তারা সম্পদ বৃদ্ধির জন্য দুর্নীতি বা বেআইনি কাজ থেকে সরে আসবেন। তারা যাতে দেশে অধিক বিনিয়োগে আগ্রহী হন সে সুযোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, যেমন ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল একাত্তরে। বাংলাদেশের খবর : দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সামনের দিকে এগোতে পারছে না। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? নূহ-উল-আলম লেনিন : বিএনপি তাদের কর্মসূচির দ্বারা মানুষকে মোবিলাইজ করতে পারছে না। মানুষ তাদের প্রতি আস্থা স্থাপন করতে পারছে বলে মনে হয় না। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি কথা বলছে। জনগণ নিশ্চয়ই ভাববে খালেদাকে মুক্ত করে আমার কী লাভ? তারা কি এর চেয়ে কিছু ভালো কিছু দিতে পারবে? আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের সামনে বেটার কিছু দেখাতে না পারবেন, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমানকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে। আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে জনগণ তখনই বেছে নেবে, যখন তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রমাণ দিতে পারবে। বাংলাদেশের খবর : বিএনপি তো এবার বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালন করেছে। তারা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীও উদ্যাপন করছে। এতে কি আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্যমান দূরত্ব কমে আসবে বলে আপনি মনে করেন? নূহ-উল-আলম লেনিন : ৭ মার্চ পালন করতে গিয়ে তারা দূরত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। লক্ষ্য করুন, তাদের ৭ মার্চ পালনের ঘোষণাকে আওয়ামী লীগ স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু আপনার কর্মকাণ্ডে যদি ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে যে দিবসই পালন করুন না কেন, সেখানে আন্তরিকতার প্রশ্নটি থেকে যায়। বিএনপি ৭ মার্চ পালনের আলোচনা সভায় এমন সব কথা বলেছে, যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করছে। তারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিবস পালন করতে গিয়ে তার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলল। এরপর কি আওয়ামী লীগের সাথে তাদের দূরত্ব হ্রাস পাওয়ার আশা করা যায়? বিএনপি ৭ মার্চের বিপরীতে আ স ম রবের পতাকা উত্তোলন আর শাজাহান সিরাজের ইশতেহার পাঠকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যের কারণেই কি এটা সম্ভব? পতাকা উত্তোলন, ইশতেহার পাঠও ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু ৭ মার্চের পাশে ওগুলোকে বসানোর চেষ্টা ধৃষ্টতারই নামান্তর নয় কি? বিএনপির আরেকটি অভিযোগ—আওয়ামী লীগ নাকি মওলানা ভাসানীকে মূল্যায়ন করে না। অথচ আওয়ামী লীগের প্রতিটি কাউন্সিলের মঞ্চে যে ব্যানার সাজানো হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকে। তাহলে মওলানা ভাসানীকে আওয়ামী লীগ মূল্যায়ন না করল কীভাবে? আসলে ইতিহাস বিকৃতি বিএনপির একটি পুরোনো অভ্যাস। এখনো তারা সে অভ্যাস থেকে সরে আসতে পারেনি। বাংলাদেশের খবর : সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির প্রতি আমাদের দেশের মানুষের নেতিবাচক মনোভাব লক্ষ করা যায়। এ প্রবণতা জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন? নূহ-উল-আলম লেনিন : এর প্রধান কারণ হলো রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। আগে রাজনৈতিক নেতাদের যে জনঘনিষ্ঠতা ছিল তাও আর নেই। ফলে জনমনে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতি থেকে তাদের কোনো কিছু পাওয়ার আশা নেই। তারা মনে করে, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দাবা খেলা। তাই ওই খেলায় তারা আর ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহূত হতে চায় না। তা ছাড়া জনগণ এটাও প্রত্যক্ষ করছে যে, রাজনীতিকগণ যেসব নীতিকথা মঞ্চে-টেলিভিশনে বলেন, তাদের নিজেদের জীবনে তার প্রয়োগ নেই। এর ফলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ধারা প্রবল হচ্ছে। আর জনগণও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের খবর : রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, তাই এ সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাই। নূহ-উল-আলম লেনিন : এ বিষয়ে আগে কিছুটা আলোকপাত করেছি। আজ সমাজে যে দুর্বৃত্তায়ন চলছে, রাজনীতিতে তারই প্রতিফলন ঘটছে। এখন রাজনীতিকরা রাজনীতি করেন না। জাতীয় সংসদে তিয়াত্তর শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। তাদের কাছে কোনটা বড়? দেশ, জনগণ নাকি তাদের ব্যবসা? এসব অরাজনৈতিক ব্যক্তি রাজনীতিতে জায়গা দখল করায় দুর্বৃত্তরাও ঠাঁই পাচ্ছে। দুর্বৃত্তায়নের এই থাবা থেকে আমাদের রাজনীতি মুক্ত হতে পারবে কি না সন্দেহ। বাংলাদেশের খবর : এর কবল থেকে রাজনীতিকে উদ্ধার করার কি কোনো উপায় নেই? নূহ-উল-আলম লেনিন : আদর্শবান ও সৎ রাজনৈতিক কর্মীদের সঠিক মূল্যায়নই পারে এ সর্বনাশা প্রবণতা থেকে রাজনীতিকে রক্ষা করতে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি দল ভারী করার জন্য টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি করবেন, অসাধু ব্যক্তিদের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেবেন, আবার রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কথা বলবেন, তা হাস্যকর নয় কি? বাংলাদেশের খবর : আপনি দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ছাত্রনেতা ছিলেন। বর্তমান ছাত্র রাজনীতি সম্বন্ধে আপনার মূল্যায়ন কী? নূহ-উল-আলম লেনিন: যে জিনিসটাই নাই, তার মূল্যায়ন করব কীভাবে? দেশে বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি বা ছাত্র আন্দোলন বলতে কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। আমি বাম ছাত্র সংগঠনে ছিলাম। আমরা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করি নাই। অনুসরণ করেছি হয়তো। রাজনৈতিক দল যে স্লোগান দিত, আমরা হুবহু সে স্লোগান দিতাম না। অতীতে ছাত্র সংগঠনগুলোর নিজস্ব স্বকীয়তা ছিল। তারা রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হতো না। এখন প্রত্যকটি দলের ছাত্র সংগঠন রয়েছে। এখানে জিয়াউর রহমান সফল। তিনি ছাত্র সংগঠনকে দলের অঙ্গ সংগঠন বানিয়ে দিয়ে গেছেন। অন্যরা তা অনুসরণ করে চলেছে। আগে আমরা ছাত্র রাজনীতি করতাম আদর্শগত কারণে। এখন ছাত্র রাজনীতি চলছে রাজনৈতিক দলের তল্পিবাহক হয়ে অর্থ-বিত্ত কামাইয়ের পন্থা হিসেবে। বাংলাদেশের খবর : আপনি এক সময় বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? নূহ-উল-আলম লেনিন : প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি কেন বাম রাজনীতি থেকে সরে এলাম। এটা ঠিক, এদেশের বামপন্থি রাজনীতিকরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জেল-জুলম সহ্য করেছেন। কিন্তু তারা জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করতে পারেননি। আসলে তারা বাংলাদেশকে সঠিকভাবে বোঝেননি। তত্ত্বের খাঁচায় বন্দি থেকে তারা সময় পার করেছেন। জনগণের মধ্যে সাড়া ফেলতে পারেননি। তারা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, মানুষও শোষণহীন সমাজ চায়। অথচ তারা ভোট দেন আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে। এদেশে একটি বাম দল পাওয়া যাবে না, যারা আওয়ামী লীগ-বিএনপির ছত্রছায়ায় না থেকে ভোট করতে পারে। তা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, সে যে ধর্মেরই হোক। সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের কথা শুনলেই তারা মনে করে এটা নাস্তিক্যবাদী তৎপরতা। তাই জনগণ বাম ধারার সাথে সম্পৃক্ত হতে চায় না। এখানেই বাম রাজনীতির দুর্ভাগ্য। বাংলাদেশের খবর : নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে কিছু বলুন। নূহ-উল-আলম লেনিন : যেহেতু তারাই ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দেবে, তাই তাদের দেশের ইতিহাস জানতে হবে। আর সেজন্য দরকার প্রচুর পড়াশোনা। মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী পাঠে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে। ভালোবাসতে হবে দেশকে। বাংলাদেশের খবর : আপনাকে ধন্যবাদ। নূহ-উল-আলম লেনিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১