আপডেট : ০১ April ২০২১
আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। আমাদের দেশে উৎপাদনের দিক থেকে ধান, গম ও ভুট্টার পরেই চতুর্থ স্থানে রয়েছে আলু। এখন দেশের সর্বত্রই কম-বেশি আলু উৎপাদন হয়। ইতঃপূর্বে আলুর চাষ কিছু কিছু অঞ্চলে হলেও এর চাহিদা ও ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দিনদিন উৎপাদনও বাড়ছে। মূলত সবজি হিসেবে তরকারির তালিকায় আলুর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একজন মানুষ বছরে ২৩ কেজি আলু খায়। শুধু খাওয়াই নয়, আলু প্রক্রিয়াজাত করে নানা পণ্য উৎপাদনেরও সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এখনো দেশে আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ হচ্ছে; কিন্তু এ পরিসর আরো বাড়ানো যেতে পারে। এ জন্য সরকারের সঠিক পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। তরতর করে বাড়ছে আলুর উৎপাদন। মাত্র ৩০ দশক আগেও আলুর উৎপাদন কম ছিল। আর এখন আলুর উৎপাদন প্রতি বছরই ৮০/৯০ লাখ টন করে হলেও এ বছর এক কোাটি টন ছাড়িয়েছে। মূলত কম দামি সবজির মধ্যে আলু অন্যতম। যে কারণে এর ব্যবহারও বেশি। টানা কবছর ধরে চাষিরা আলুর ভালো দাম পেলেও গত বছর কল্পনাতিতভাবে বেশি পেয়েছে। ফলে এ বছর আলুর ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে কোনো ফসলের বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের বিপদের সীমা থাকে না। সংরক্ষণের অভাব, মূল্য সংকটের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা চাষিদের মোকাবিলা করতে হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এখনো আলু তোলা বাকি আছে। এরই মধ্যে গোটা দেশের ৩৯২টি হিমাগার ইতোমধ্যে ভর্তি হয়ে গেছে। আর হিমাগারে মোট আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব ২২ লাখ টন। অর্থাৎ মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ হয়, বাকি চার ভাগ আলু হিমাগারের বাইরে থাকে। এ বছর কুড়িগ্রামে আলুর ব্যাপক চাষ হয়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে কুড়িগ্রামের ৪টি হিমাগারের সবকটিই ভর্তি হয়েছে। এরপরও শত শত ট্রলি, ট্রাক্টরে আলু নিয়ে হিমাগারের গেটে চাষি ও ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করছে। এ সংকট দূর করতে হলে কুড়িগ্রামে আরো হিমাগার স্থাপন করতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে ফসল চাষাবাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না, সে কারণে উদ্যোক্তারা হিমাগার স্থাপনের ঝুঁকি নিতে চান না। ফলন বিপর্যয়ের কারণে যদি হিমাগারের ব্যবসায় মন্দা যায়, এ শঙ্কা থেকেই হিমাগার স্থাপনের আগ্রহ কম। এ জন্য সরকারিভাবে সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার স্থাপন করা জরুরি। আমাদের দেশটি কৃষিনির্ভর। এ দেশের চাষিদের স্বার্থে সরকারি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণও এর বাস্তবায়ন করা উচিত। তাহলে কৃষিতে চাষিরা আরো সফল্য আনতে সক্ষম হবেন। দেশে কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় শুধু আলু নয়, ধান ও অন্যান্য সবজি উৎপাদন করে দেশীয় চাহিদার পুরোটাই পূরণ হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো পণ্য দেদার বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। বিশেষ করে সবজি উৎপাদনে দেশে এক অভাবণীয় সফলতা এসেছে। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চতুর্থ। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে চীন, ভারত, রাশিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি। অথচ গত ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের নাম আলু উৎপাদনকারী ২০ দেশের তালিকায় ছিল না। আর এখন কোটি টনের ওপর আলু উৎপাদন করে বিশ্বের আলু উৎপাদনকারী দেশসমূহের তালিকায় সপ্তম স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। আলুচাষিদের নিরন্তর প্রচেষ্টা, ঐকান্তিকতা, কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হলে নিকট ভবিষ্যতে আলু উৎপাদন কল্পনার সীমাকেও যে অতিক্রম করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জোরদারকরণ প্রকল্পের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতি বছরই আলুর আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় মানসম্মত আলু সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব। আলুর মানকে নিশ্চিত করতে হলে কৃষি বিভাগকে সহযোগিতা করতে হবে বলে আমরা মনে করি। কারণ আমরা জানি, ভালো বীজে ভালো ফলন। বীজ যদি ভালো হয়, আলুও ভালো হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে বীজ একটি বড় সমস্যা। ভালো মানের বীজের অভাবে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন এবং ফলনও বিপর্যয় ঘটে। সেটা যে শুধু আলুর ক্ষেত্রে তা নয়, পাটবীজ থেকে অন্যান্য ফসলের বীজের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। এখনো বিদেশ থেকে সবজির বীজ আমদানি করতে হয়। এই বাস্তবতায় কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষি বিভাগকে উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং ভালো মানের বীজ সংগ্রহ করে চাষি পর্যায়ে সরকারকে তা সরবরাহ করতে হবে। তাহলে মানসম্মত আলু পাওয়া যাবে। তবে সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ আলু প্রতি বছরই নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, মোট উৎপাদনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আলু এখন হিমাগারে সংরক্ষণ করার মতো হিমাগার রয়েছে। বাকি আলু কষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সংরক্ষণ করা হয়। আবার সংরক্ষণ উপযোগী আলুও সংগ্রহ করতে হবে। অপরিপক্ব আলু কোনোভাবেই সংগ্রহ করা যাবে না। কারণ আলু সংরক্ষণ করতে হলে ৭/৮ দিন পূর্বে আলুর গাছ কেটে ফেলতে হবে। পাশাপাশি আবহাওয়া খারাপ থাকলে কিংবা তীব্র রোদেও আলু তোলা যাবে না। তাহলে আলুর মান ঠিক রাখা সম্ভব হবেন। যেহেতু উৎপাদনের প্রায় ৭৫ ভাগ আলু হিমাগারের বাইরে সংরক্ষণ করতে হয়, সেহেতু কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উদ্ভাবিত অহিমায়িত ঘর ব্যবহার করে আলু গুদামজাত করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে খরচও অনেক কম। অথচ হিমাগারে এক বস্তা আলু রাখার খরচ প্রায় বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা। সেখানে অহিমায়িত পদ্ধতিতে মাত্র বস্তাপ্রতি ৩০/৩৫ টাকা খরচে আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ জন্য ছায়াযুক্ত স্থানে খাচার ওপর নির্মিত ঘরে টিনের ছাউনি দিয়ে চারদিকে বাঁশের বেড়া দিতে হবে। এই পদ্ধতিতে এক শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ঘরের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টন। এখন এই পদ্ধতির মাধ্যমে আলু সংরক্ষণ করতে পারলে আলু পচে নষ্ট যেমন হবে না, তেমনি চাষিরা ভালো দামে আলু বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবানও হতে পারবেন। এ জন্য আলুচাষিরা কৃষি বিভাগে যোগাযোগ করে সার্বিক সহযোগিতা নিতে পারবেন। অবশ্য আলু চাষ বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। আলুচাষিদের অনেক অর্থ, মেধা খরচ করেই তবে আলুর ভালো ফলন আনতে হয়। সেখানে সংরক্ষণের অভাবে আলু তোলার সময় জমিতে আলু বিক্রি করে দেওয়ার কারণে অনেক সময়ই আলুচাষিদের লোকসান গুনতে হয়। তবে আগ্রহ এবং কৌশল জানা থাকলে অত্যন্ত সহজ পদ্ধতির অহিমায়িত পদ্ধতিতে ৪ মাস পর্যন্ত আলু ভালভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। আমাদের প্রধান খাদ্য যেমন ভাত, তেমনি বিশ্বের ৪০টি দেশের লোকদের অন্যতম খাদ্য আলু। আমাদেরও খাদ্যাভ্যাস বাড়াতে হবে। অনেকের ধারণা, আলুর কোনো পুষ্টিগুণ নেই এবং আলু খেলে ভুঁড়ি বাড়ে। এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, আলুতে ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-সি রয়েছে। চালে কিন্তু তা মোটেই নেই। এছাড়া আলুতে শর্করা, আমিষ, ক্যালসিয়াম, লৌহ তো আছেই। আবার আলুতে চর্বির পরিমাণও চালের থেকে কম এবং আটার পঞ্চমাংশ। ফলে আলু বেশি পরিমাণ খেলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি হবে না। আর আমাদের ভোগোলিক সীমারেখা কার্যত স্থির। অথচ প্রতিনিয়তই মানুষ বাড়ছে। মানুষ বাড়ার অর্থ হলো, খাদ্য চাহিদাও বাড়ছে। ফলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। তাহলে চালের ওপর যেমন চাপ কমবে, তেমনি আলু উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। অবশ্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গত ১৬ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, ভাতের পর আলু এখন দেশের প্রধান খাদ্য। উক্ত প্রতিবেদনে খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহারের এক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টন আলুর ব্যবহার হলেও ২০২০ সালে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টনে। পশু খাদ্যে ২০২০ সালে ১১ লাখ ৪৯ হাজার টন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ২ লাখ ৫৩০ টন ও রপ্তানি হয়েছে ৪৫ হাজার টন। অবশ্যই আলু উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহার ও রপ্তানি দুটোর পরিমাণ কম। এ ক্ষেত্রে জরুরি হচ্ছে, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে এবং বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ দিনদিন যে হারে আলু উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে হারে ব্যবহার ও রপ্তানিমুখী করতে হবে। তাহলে আলু উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে বেলে ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে আলুর ভালো চাষ হয়। এখন নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে সংকুচিত হয়ে গেছে। আবার খাল-বিল, বলতে আর তেমন কিছুই নেই। নদীগুলো সংকুচিত হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে সুবিশাল চরাঞ্চলের। যেখানে এখন অল্প সেচে আলুর ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে। অর্থাৎ আলু চাষের জমির পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত এ কারণে আলুর চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন দরকার সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনে সমন্বিত উদ্যোগ। যেন আলু চাষ করে চাষিরা উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করতে পারে। তাহলে আলু চাষ করে কৃষকও স্বাবলম্বী হতে পারবে। তবে আলুর দাম কমলে রপ্তানিকারকদের খুঁজে পাওয়া যায় না, আবার দাম বাড়লে পণ্য পাওয়া যায় না। শুধু আলু উৎপাদন করলেই হবে না, কোন দেশ কি চায়, তাই দিতে হবে । এ বছর এক লাখ টন আলু রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে আলু রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবতা হচ্ছে, চাষিরা ফসল ফলাবেন। আর সংরক্ষণ, বিপণনের মতো নীতিনির্ধারণী কাজ তো সরকারকেই করতে হবে। কোন দেশ কি মানের আলু চায়, তা তো আলুচাষিরা জানে না। তা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নিশ্চিত করে চাষি পর্যায়ে সেই মানের বীজ সরবরাহ করে চাষাবাদ করতে হবে। বিশ্বে ৫শটি আলুর জাত মূল্যায়ন করে বাংলাদেশে ৫৭টি জাত উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবে কৃষিবিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কৃষিতে অনেক সাফল্য এসেছে। শুধু সরকারের যথোপযুক্ত সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে অনেক সময়ই এ দেশের কৃষকের সাফল্যের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। ফলে বাড়তি ফলন উৎপাদন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। এমনকি কৃষি পণ্য চাষের যে ধারাবাহিকতা তা রক্ষা করাও সম্ভব হয় না। ফলে কোনো বছর উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে, সে আবাদ থেকে কৃষক মুখ ফিরিয়ে নেয়। যে কারণে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। যেন ফলন বাড়তি হলেই তা বিদেশে রপ্তানি করে চাষিদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তাহলে কৃষিতে আরোপ সফলতা যেমন আসবে, তেমনি কৃষি অর্থনীতির টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করাও সম্ভব হবে। লেখক : সমাজকর্মী
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১