বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০১ April ২০২১

সংক্রমণে বিস্ফোরণের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের


টানা তিন দিন ধরে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাঁচ হাজারের ওপরে। গত এক দিনে মৃত্যুর সংখ্যাও পেরিয়েছে অর্ধশত। এরপরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে অনীহা দেখা যাচ্ছে। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণে বিস্ফোরণের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত এক দিনে করোনা শনাক্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৩৫৮ জন, যা করোনাকালে বাংলাদেশে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড। এদিন মারা গেছেন ৫২ জন। আগের দিন মঙ্গলবার শনাক্ত পাঁচ হাজার ৪২ এবং ৪৫ জন মৃত্যুরে খবর জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর গত সোমবার পাঁচ হাজার ১৮১ জন শনাক্ত ও ৪৫ জন মৃত্যু খবর জানানো হয়।

করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু টানা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল থেকেই এই নির্দেশনা কার্যকর শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়া, মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব মানায় অনীহা দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যেই। এছাড়া আনন্দ-বিনোদনের জন্য বেড়াতে যাওয়া চলছে আগের মতোই।

দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার পর জনমনে ভীতি ছিল অনেক। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতাও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেই সচেতনতা নেই। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়লেও গা-ছাড়া ভাব নিয়েই চলাফেরা করছেন নগরবাসী।

গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ মাস্ক ছাড়া চলাচল করছেন। গণপরিবহন, খাবার হোটেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রেতা-বিক্রেতাসহ বেশিরভাগ মানুষের মাস্ক পরা চোখে পড়েনি। অনেকের মাস্ক থাকলেও সেটা থুতনিতে নামিয়ে রাখা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টিও খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। করোনা প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা বার বার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহারের পরামর্শও  বেশিরভাগ মানুষের কাছে উপেক্ষিত।

রাজধানীর নবাবপুরের বিসিসি রোডে ক্রেতা-বিক্রেতদের মধ্যে করোনা রোধে কোনো সচেতনতা দেখা যায়নি। কারো মাস্ক নেই। স্যানিটাইজারও ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। সচেতনহীনভাবে বিক্রেতা পণ্য দিচ্ছেন ক্রেতা সেটা গ্রহণ করছেন।

ইলেকট্রিক ব্যবসায়ী শামীম জানান,  বার বার হাত ধোয়ার বিষয়টি মনে থাকে না। ক্রেতারা এলে মাস্ক খুলে কথা বলতে হয়, তাই মাস্ক থুতনিতে পড়ে থাকেন।

গুলিস্তানের সুন্দরবন মার্কেটের নিচে ফুটপাতের দোকানি আলমগীর নামে বলেন, মাস্ক পরে থাকলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তাই তিনি মাস্ক থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখেন। স্যানিটাইজার তো ব্যবহারই করেন না তিনি। হাত না ধুয়েই ঝালমুড়িও খেতে দেখা গেল তাকে।

পল্টন মোড়ের চা বিক্রেতা বাশার মিয়া বলেন, মাস্ক ব্যবহার করতে মনে থাকে না। দোকানে অনেক কাস্টমার আসে, তাদেরও মাস্ক থাকে না।  সংক্রমণ বাড়লে কি আর করা। কপালে যা আছে তা তো হবেই।

স্বাস্থ্যবিধি মানায় সাধারণ মানুষের এমন উদাসীনতায় সংক্রমণে বড়সড় বিস্ফোরণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে করোনার সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি চলছে। এ অবস্থায় কঠোর ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত।

মহামারী বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনার সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি চলছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইসোলেশন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর কড়াকড়ি আরোপসহ অফিস-শপিংমলে ভিড় কমাতে হবে। এখন যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তাদের উপসর্গ দেখা দিতেও দুই সপ্তাহ লাগবে।

স্বাস্থ্যবিধির প্রতি অবহেলার কারণে দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ বিভাগের পরিচালক ও মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের মাস্ক অবশ্যই পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে, সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। গত বছর যে চর্চাগুলো আমরা করেছি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যে শিষ্টাচারগুলো আমরা শিখেছি, গত দুই থেকে তিন মাসে আমরা চরম আত্মতুষ্টিতে ভুগে এসব বিষয়ে অবহেলা করেছি। এ কারণেই আজ সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক বছর ধরেই মাস্ক ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি বেশিরভাগ মানুষই মানছেন না। নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিতে ভলেন্টিয়ার টিম প্রয়োজন। সরকারের এত বেশি পুলিশ নেই যে সেটি বাস্তবায়ন করবে। মাস্ক ব্যবহারের জন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সেটি ইতোমধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু আমাদের ভয় দেখাতে পারছে না। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভিড়। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে করোনার উচ্চ সংক্রমণ দেখা দিয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ ৩১ জেলায়। উচ্চ সংক্রমণযুক্ত জেলাগুলো হচ্ছে-মৌলভীবাজার, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকা, সিলেট, নরসিংদী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, বগুড়া, নড়াইল, নীলফামারী, গাজীপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, মাদারীপুর, নওগাঁ, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল ও কক্সবাজার।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১