আপডেট : ০১ April ২০২১
সংঘাতে একের পর এক খুনের ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনজীবনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বান্দরবানের বাঘমারায় গত বছরের ৭ জুলাই দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে নিহত হন ছয়জন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দুটি পক্ষের মধ্যে এ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনী ও সেখানে সংঘাতের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় সংঘাতে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন। গত ১৫ মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে রাঙামাটিতে। ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত রাঙামাটিতে সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬ জন। এর মধ্যে ২০২০ সালে প্রাণ হারান ২০ জন। আরেক পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের গত ১৪ মাসে ১১ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। খাগড়াছড়িতে মারা গেছেন পাঁচজন। পাহাড়ের বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী মনে করছে, অনৈতিক কার্যকলাপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত, হানাহানি বেড়েই চলেছে। আঞ্চলিক দলগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্ব, চাঁদা আদায়, ভাগ-বাটোয়ারাকেই সংঘাত-হানাহানির মূল কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটির নানিয়ারচর বাজারের এক বাসিন্দা বলেন, পৃথক চারটি ধারার রাজনীতির কাছে আমরা জিম্মি। একটি দলের পক্ষে অবস্থান নিলে অন্য পক্ষগুলো ক্ষুব্ধ হয়। প্রায়ই আমাদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিবাদ করলে বা নীরব থাকলেও খুন, গুম বা অপহরণ হতে হয়। তবে আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের হতাশা থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) নেতা ত্রিদিব চাকমা বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পার্বত্য এলাকায় সমস্যা সমাধান হবে না। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের জন্যই চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু ২২ বছর হতে চললেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টায় গুলিতে নিহত সংস্কারবাদী জেএসএসের সামরিক কমান্ডার বিশ্বমিত্র চাকমা। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক সুদর্শন চাকমা বলেন, পাহাড়ে কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের দল জড়িত ছিল না। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যাদের বেশি ক্ষতি হবে তারাই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে। আমরাও চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা থাকুক। সবাই নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করুক। ইউপিডিএফের সংগঠক অংগ মারমা বলেন, পাহাড়ে অশান্তির মূল কারণ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া। চুক্তি বাস্তবায়নে যেসব কথা বলা হয়েছে সেগুলো ন্যূনতম বাস্তবায়ন হয়নি। এ জন্য এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতের কারণ জানতে চাইলে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা বলেন, প্রসীত খীসার ইউপিডিএফের জন্য আজ পাহাড়ে এত সংঘাত। তারা তখন চুক্তি বিরোধিতা না করলে হয়তো পাহাড়ে আজ চারটি আঞ্চলিক সংগঠন হতো না। পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক এটা আমরা সব সময় চাই। পাহাড়ে একসময় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নামে একটি মাত্র আঞ্চলিক দল ছিল। এই দলের সঙ্গেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করেছিল সরকার। চুক্তির বিরোধিতা করে প্রথমে একটি অংশ জেএসএস থেকে বেরিয়ে ১৯৯৮ সালে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে নতুন দল করে। পরে জেএসএস ভেঙে জেএসএস (সংস্কারপন্থি) নামে ২০০৭ সালে আরেকটি দল হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক নামে নতুন দল হয়। পার্বত্য চুক্তির এক বছরের মধ্যেই চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে ইউপিডিএফের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি ভেঙে গঠিত হয় জনসংহতি সমিতি (লারমা) বা জেএসএস (লারমা) নামের নতুন দল। ২০১৭ সালে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি হয়। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর তপনজ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামের নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই চারটি গ্রুপের বাইরেও আরো কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি)। এই দলের সদস্যদের অবস্থান বান্দরবানের গহিনে। ২০১৮ সালে এএলপি ভেঙে গঠিত হয় মগ পার্টি। তাদের অবস্থানও বান্দরবানে। তবে এই দুই দলের অবস্থান শুধু বান্দরবানে, রাঙামাটি কিংবা খাগড়াছড়িতে এদের কোনো তৎপরতা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির যে চারটি গ্রুপ রয়েছে সেগুলো একেকটি শক্ত অবস্থান একেক জায়গায়। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের দুটি অংশের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। খাগড়াছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা ও পাহাড়ের নিরাপত্তাবাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের শক্ত অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবানে জেএসএসের দুটি অংশের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। সেখানে জেএসএস শক্তিশালী। বান্দরবানের ইউপিডিএফের তৎপরতা নেই বললে চলে। আর রাঙামাটিতে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের চার পক্ষই শক্তিশালী।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১