আপডেট : ০৫ April ২০২১
বেসরকারি মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারে ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি সাপ্লাই দেওয়া জয়নাল আবেদিন গতবারের লকডাউনে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছিলেন। নিজের বোনের জামাইসহ কয়েক বন্ধুর কাছ থেকে লোনে টাকা নিয়ে আবারো ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন। কয়েক মাস ভালোই চলছিল। কিন্তু আবারো লকডাউন দেওয়ায় তার মাথায় হাত পড়েছে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মার্কেটে তার ২৮ লাখ টাকা পড়ে আছে। এমন সময় লকডাউন দিলে কী হবে তিনি চিন্তাই করতে পারছেন না। একদিকে বোনের জামাইয়ের নিকট থেকে ধারের টাকা, অন্যদিকে বন্ধুবান্ধবের টাকা-সবই এখন মার্কেটে। প্রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, যদি দীর্ঘস্থায়ী কিছু হয় তবে থালা নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। পুরো ব্যবসা ধসে যাবে। আমার জীবনের যা অর্জন সব চলে যাবে। আমার দাঁড়ানোর আর কোনো জায়গা থাকবে না। শুধ জয়নাল আবেদিন নন, লকডাউনে তার মতো হাজারো ব্যবসায়ীর মাথায় হাত উঠেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের যারা ব্যবসায়ী লকডাউনে তাদের হাহাকার অবস্থার মতো। প্রথমবার দীর্ঘস্থায়ী লকডাউনে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব। অনেকে আবার গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। এসব ব্যবসায়ী বলছেন, লকডাউন তাদের জন্য অভিশাপ। কোনোমতে তারা দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এমন অবস্থায় আবারো লকডাউনে তারা বড় ধরনের ক্ষতির দিকে চলে যাচ্ছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি হোটেলে কাজ করেন সেলিম হোসেন। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে ঢাকায় এসে এখানে কাজ নিয়েছি। সামনে রমজান ও ঈদ। কিছু টাকা উপার্জন করে পরিবারের কাছে ফিরতে চেয়েছিলাম। লকডাউনের কারণে এখন কিছুই মাথায় আসছে না। সংসার চালাব কীভাবে? গাবতলী বাস টার্মিনালের ব্যবসায়ী মকবুল বলেন, গত বছর লকডাউনের কারণে ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। বছর পার না হতেই আবার লকডাউন। এবার পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তবে সরকারের উচিত রমজানের আগে লকডাউন শেষ করা। রায়েরবাজার এলাকার রিকশাচালক জাহেরুল ইসলাম বলেন, লকডাউন দিলে তো আমাদের কিছুই করার নেই। তবে সরকারের উচিত আমাদের কথা ভেবে বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। নয়তো বাড়িতে ছেলেমেয়ে না খেয়ে থাকবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তোহিদ রহমান নামে একজন বলেন, লকডাউন দেওয়ার দরকার ছিল আরো ১৫ দিন আগে। করোনা তো এখন বাড়েনি এটা অনেক আগেই বেড়েছে। তখন দিলে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকত। সামনে রমজান ও ঈদ। করোনার পরিস্থিতি থেকেও ভয়াবহ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে না খেয়ে থাকা। লকডাউনের খবরে জীবিকা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালকরা। তারা বলছেন, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে গত ৩১ মার্চ সরকার ১৮টি নতুন নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনার পরপরই সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ করে দেয় দুই সপ্তাহের জন্য। রাইড শেয়ারিং বন্ধ করে দিলেও খ্যাপ (যাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে) মারতেন তারা। এতে ট্রাফিক পুলিশ বাধা দিলেও কোনোমতে দিন চলে যাচ্ছিল তাদের। কিন্তু এখন লকডাউন ঘোষণার পর এ ব্যবস্থাও বন্ধ হওয়ার পথে। আগামী দিনগুলোতে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে চিন্তিত তারা। সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা ১৮ দফায় সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে রাজধানীর অনেক এলাকায় তা উপেক্ষিত হচ্ছে। হাট-বাজার, মার্কেট ও শপিংমলে যেন স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। অনেকে মাস্ক ব্যবহার করছেন না। সামাজিক দূরত্ব, সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যায়নি। গণজমায়েত নিষিদ্ধ থাকলেও সেটাও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে উপেক্ষিত হচ্ছে। রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম। কিছু সময় পরপর মাইকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু তোয়াক্কা করছেন না কেউ। অনেকের মাস্ক নেমে এসেছে থুতনির নিচে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছেন না কেউই। নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকের মুখে মাস্ক থাকলেও বিক্রেতাদের মুখে ছিল না মাস্ক। মুখে মাস্ক না থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সবজি বিক্রেতা শাহিন আলম বলেন, মাস্ক পরে গরমের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ক্রেতাদের সঙ্গে সবজির দরদাম করতে হয়। বাধ্য হয়ে মাস্ক খুলে বসতে হয়েছে। জানা গেছে, মহামারী করোনা নিয়ন্ত্রণে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এরপরও প্রাদুর্ভাব থামাতে ৭ দিনের লকডাউনে যাচ্ছে দেশ। কিন্তু দেশের একটি বড় অংশ দিন আনে দিন খায়। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস বিপজ্জনক; কিন্তু লকডাউনের কারণে জীবন-জীবিকার শঙ্কায় ভুগছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। গত শনিবার সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে ৫ এপ্রিল, সোমবার থেকে সাত দিনের জন্য লকডাউনের ঘোষণা দেন। লকডাউনে কী হবে, কী কী খোলা থাকবে আর কী কী বন্ধ থাকবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত গতকাল জানানো হয়। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এক ভিডিও বার্তায় লকডাউন প্রসঙ্গে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধের স্বার্থে সরকার দু-তিন দিনের মধ্যে সারা দেশে এক সপ্তাহের লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান, কাঁচাবাজার, ওষুধ ও খাবারের দোকানের পাশাপাশি পোশাক এবং অন্যান্য শিল্পকারখানা লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, আমরা চাচ্ছি লকডাউনে মানুষের চলাচল যতটা সম্ভব বন্ধ করার। কারণ যেভাবে করোনা ছড়াচ্ছে তাতে মানুষের ঘরে থাকা জরুরি। তবে জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান, কাঁচাবাজার, খাবার ও ওষুধের দোকান লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। এ ছাড়া পোশাক ও শিল্পকারখানাগুলো খোলা থাকবে। কারণ কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের বাড়িতে ফেরার তাড়া থাকে। এতে করোনার ঝুঁকি আরো বাড়ে। কারখানায় শ্রমিকদের একাধিক শিফটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করতে বলা হবে। লকডাউনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ১২ দিনের সম্পূর্ণ লকডাউনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার বলেছে প্রথম এক সপ্তাহ হবে। পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, লকডাউনকালে অত্যাবশ্যকীয় সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এ ছাড়া গণপরিবহন, দূরপাল্লার বাস, অভ্যন্তরীণ বিমান ও ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। লকডাউনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক ও নার্সের ছুটি আপাতত স্থগিত থাকবে। লকডাউন ঘোষণার পরপরই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। গত শনিবার লকডাউনের সিদ্ধান্ত আসার পর দুপুর ২টার পর থেকে বাজারে ভিড় বাড়তে থাকে। বেশির ভাগ মানুষ সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও আলু কিনছিলেন। কেউ কেউ আবার একসঙ্গে বাড়তি পরিমাণ পণ্য কিনে ঘরে ফিরছেন। অনেকেই আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মজুত শুরু করেছেন। নগরীর শপিংমলগুলোতেও লোকজনের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ করা গেছে। লকডাউনের খবরে ঈদের কেনাকাটাও সেরেছেন কেউ কেউ। ব্যবসায়ীরা জানান, এই দুপুরে সাধারণত এমন ভিড় দেখা যায় না। লকডাউনের খবর শুনেই হয়তো ক্রেতারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বাজারে আসছেন। ক্রেতারা বলছেন, লকডাউনের খবর শোনার পর রোজার বাজার করতে এসেছি। লকডাউন কত দিন থাকবে, সে তো আর বলা যাচ্ছে না। এ ছাড়া করোনার মাঝে বাজারে যত কম আসতে হয় ততই ভালো। তাই রমজানের বাজারসহ যতটুকু সম্ভব বাজার করলাম।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১