আপডেট : ১৬ April ২০২১
শ্রমিক ও পরিবহন মালিক নেতারা শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করলেও করোনাকালে দেশের ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। চাঁদার টাকায় ফুলেফেঁপে উঠা পরিবহন খাতের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগ শ্রমিকদের পাশে নেই। পরিবহন শ্রমিকদের নামে এত চাঁদা উঠলেও করোনাকালে আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন তারা। জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে বাস ও মিনিবাস চলে আট হাজার। এসব বাস পরিচালনায় যুক্ত কমপক্ষে ৪০ হাজার শ্রমিক। শুধুমাত্র সায়েদাবাদ-দিয়াবাড়ী পথে চলাচলকারী রাইদা পরিবহনের ২০০ বাসের শ্রমিকরা মালিকদের প্রতি গাড়িতে মাসে চাঁদা দিতেন এক হাজার ৭০০ টাকা। এখন মালিকপক্ষ তাদের ফোনও ধরছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাইদা পরিবহনের একজন চালক জানান, অনেকে গাড়ি চালাতে না পেরে, কোনো সহায়তা না পেয়ে সবজি বিক্রি করছেন। আব্দুল্লাহপুর-সদরঘাট পথে চলাচলকারী ভিক্টর ক্লাসিক ও আকাশ পরিবহনের দেড় হাজার শ্রমিক কর্মহীন, সহায়তা পাচ্ছেন না। ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের চালক মো. শামীম বলেন, এ পর্যন্ত মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন বা ফেডারেশন থেকে কোনো সহায়তা পাননি। তিনি জানান, বাস চললে শ্রমিক ইউনিয়নকে দিনে জিপি দিতে হয় ৩২০ টাকা, মালিক সমিতিকে দিতে হয় ৩০০ টাকা। গাড়িপ্রতি ৭০ টাকার নির্ধারণ করা হারের চেয়ে বেশি আদায় করা হয় বিভিন্ন স্থানে। এখন এসব তহবিল শ্রমিকদের জন্য কেউ ব্যবহার করছে না। তিনি বলেন, গাড়ি চললে সবাই খোঁজ রাখে। এখন গাড়ি বন্ধ কেউ খোঁজ রাখছে না। খেয়ে আছি নাকি না খেয়ে আছি ফোন দিয়েও খোঁজ নেয়না। বেতনকাঠামো কার্যকর না থাকায় পরিবহন শ্রমিকদের ৯৮ শতাংশই দৈনিক মজুরি বা ট্রিপভিত্তিক চাকরি করে থাকেন। গতকাল ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরে বাসচালক কবীর হোসেন রাজন বলেন, ত্রাণের কোনো খবর নাই। খবর হবে কি না তা জানিনা। বাসচালক মশিউর রহমান বলেন, ত্রাণের জন্য তালিকা তৈরির কোনো খবর এখনো আসেনি। দেখা যাক কি হয়। জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অধীনে ঢাকাসহ সারা দেশে ২৩১টি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন আছে। এ ফেডারেশনের অধীন বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নও শ্রমিকদের নাম সরকারি সহায়তার তালিকায় তোলার নামে কয়েকটি স্থানে চাঁদাবাজি করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী জানান, আমরা এবারের লকডাউন শ্রমিকদের কল্যাণে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। যেহেতু এটি বলা হচ্ছে একসপ্তাহ, সপ্তাহ শেষে যদি বাড়ানো হয় তবে আমরা শ্রমিকদের জন্য একেবারে ঈদের প্রস্তুতির কিছু সহায়তা আমরা দেবো। এটির প্রস্তুতি আমরা নিতে শুরু করেছি। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাকা ঘুরলেই চাঁদা দিতে হয় পরিবহন শ্রমিকদের। বৈধ-অবৈধ কমপক্ষে ৩০০ পরিবহন মালিক সমিতি ও পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন চাঁদাবাজিতে মত্ত থাকে। সড়ক পরিবহন খাতের বিভিন্ন পক্ষের হিসাবে, সংগঠন পরিচালনা ব্যয় ও শ্রমিক কল্যাণের নামে স্বাভাবিক সময়ে বছরে কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে সড়কে। জানা যায়, ফেডারেশনের জন্যই দিনে কোটি টাকা তোলা হচ্ছে শ্রমিক কল্যাণের নামে। শ্রমিক নেতা ও পরিবহন মালিক নেতারা শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করলেও করোনাকালে দেশের ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক পরিবার নিয়ে অর্ধাহারে পিষ্ট হচ্ছেন। এদিকে পরিবহন খাতের অভিজ্ঞরা জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের কোটি টাকার বেশি ব্যবহার হচ্ছে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের বিপুল অঙ্কের তহবিল পরিবহন শ্রমিকদের জন্য থেকেও ‘নেই’। সড়ক পরিবহন খাতে বেশুমার চাঁদাবাজি এরশাদ সরকারের সময় থেকেই চলছে। ২০০৯ সালে চাঁদার নাম দেওয়া হয় ‘সংগঠন পরিচালনা ব্যয়’। বাণিজ্যিক গাড়ি বাস, মিনিবাস, ট্রাক, পিকআপ, অটোরিকশা, ইজি বাইকসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন থেকে এ চাঁদা তোলা হচ্ছে। দিনে বাস ছাড়ার আগে মালিক সমিতিকে ৪০ টাকা ও শ্রমিক ইউনিয়নকে ৩০ টাকা দিতে হয় শ্রমিকদের। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আবার ৩০ টাকা থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনকে দিয়ে থাকে ১০ টাকা। এই নির্দিষ্ট হারের বাইরেও চাঁদা আদায় করা হয় বিভিন্ন স্থানে। ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্ট্যান্ড থেকে দিনে কমপক্ষে কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় স্বাভাবিক সময়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশে নিবন্ধিত ২০ ধরনের গাড়ি আছে ৪৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় আট লাখ গাড়ি বাণিজ্যিক। পরিবহন নেতাদের অভিজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধনের বাইরেও গাড়ি আছে। বাণিজ্যিক গাড়ি আছে কমপক্ষে ১০ লাখ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ খোকন বলেন, ফেডারেশনের জন্য দিনে ১০ টাকা হারে ১০ লাখ গাড়ি থেকে চাঁদা তোলা হয়। দিনে কল্যাণ তহবিলের নামে তা তোলা হচ্ছে কমপক্ষে এক কোটি টাকা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের কাঠামোগত মজুরির পরিবর্তে গণপরিবহন মালিকরা দৈনিক ইজারার ভিত্তিতে বাস, হিউম্যান হলার, টেম্পো, অটোরিকশার মতো যানবাহন চালকদের হাতে তুলে দেন। চালকরা দিনভিত্তিক মালিকের ইজারা, দৈনন্দিন জ্বালানি ও অন্য আনুষঙ্গিক খরচ, চালকের নিজের ও হেলপারের বেতন উঠাতে গিয়ে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। তাদের জীবন যখন বিপন্ন তখন মালিক, শ্রমিক নেতারা তাদের পাশে নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রমিকদের সহায়তা দেবে শ্রমিক ফেডারেশন। মালিকরা এরপরও যতটুকু পারছেন দিচ্ছেন।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১