আপডেট : ২১ April ২০২১
গত ১৭ এপ্রিল ২০২১ সকালে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালীর গন্ডামারায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিক নিহত হয়েছে। পাঁচ শ্রমিকের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার বিষয়টি বড়ই উদ্বেগের বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য। কারণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রদান করার বিষয়টি এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে। কেননা বাংলাদেশে এ বছর ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) জানিয়েছে। এছাড়া এর আগে গত ৩১ মার্চ বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়, যা তাদের গত অক্টোবরের প্রাক্কলনে ছিল ১ দশমিক ৭ শতাংশ আর জানুয়ারির প্রাক্কলনে ছিল ২ শতাংশ। সুতরাং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাতেও শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। শ্রমিক ছাড়া বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। বাংলাদেশ তার চূড়ান্ত নির্ধারিত অর্থনীতি সূচকে পৌঁছাতে পারবে না। এজন্য শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। তবে যেদিন (১৭ এপ্রিল ২০২১) বাঁশখালীতে এ ঘটনা ঘটে, সেদিনই রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সৌদি এয়ারলাইনসের কাউন্টারের সামনে বিক্ষোভ করছেন শতাধিক যাত্রী। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগই সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। সৌদিতে ফেরার জন্য তারা বিভিন্ন তারিখে টিকিট কেটে রেখেছিলেন। ফ্লাইটের দিন পার হয়ে যাওয়ায় ও ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসার কারণে তারা বিক্ষোভ করছেন। এছাড়া গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ঢাকার সাভারে বকেয়া বেতনের দাবিতে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন। ২ জানুয়ারি ২০২১ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে রংপুর চিনিকলের ৯০জন শ্রমিক-কর্মচারীকে সম্প্রতি ছাঁটাই করা হয়। এতে তারা বিক্ষোভ করেন (সূত্র : প্রথম আলো)। পরন্তু সমগ্র ঘটনাগুলো আমাদের জন্য প্রচণ্ড আতঙ্কের বার্তা দিচ্ছে। যে শ্রমিক কিংবা নিরীহ মানুষের রক্তের বিনিময়ে, ঘামের বিনিময়ে আমাদের দেশের আজকের এই অর্থনীতি তাদেরকেই যদি এভাবে অবহেলা করা হয়, হত্যা করা হয় তাহলে আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি সেই প্রশ্ন যেন রয়েই যায়? তদুপরি, এর মধ্যে যদি বাঁশখালীর শ্রমিকদের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার কারণ? কিংবা সংঘর্ষের অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্ন করা যায়, তবে উত্তর আসবে খুবই বিস্ময়কর! কারণ এখানে সাধারণ শ্রমিকদের অপরাধ হচ্ছে, তারা বকেয়া বেতনের জন্য আন্দোলন করছিলেন। তারা এই রমজান মাসে রোজার ফলপ্রসূ কর্মের সময়সূচি পরিবর্তন করার দাবি তুলেছিলেন। তবে কি এই দাবিগুলো অযৌক্তিক ছিল? এগুলো কি চরম পর্যায়ের অপরাধ ছিল? যার ফলে পুলিশ বাহিনী নির্মমভাবে গুলি ছোড়ে সাধারণ শ্রমিকদের বুকে? এটিই কি এই লকডাউনে সাধারণ শ্রমিকদের জন্য স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে উপহার? যাহোক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এর ক্ষণে গরিব দুঃখী শ্রমিকদের নানাভাবে আর্থিক অনুদান দিয়ে, ঘরবাড়ি দিয়ে সাহায্য করছেন। যা নিতান্তই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী দ্বারা যে নির্মম হত্যাকাণ্ড সাধিত হলো বাঁশখালীতে এর দায়ভার কে নেবে? রাষ্ট্র নেবে? পুলিশ বাহিনী নেবে? সরকারপ্রধান নেবে? শ্রমিকরা নেবে নাকি মালিকপক্ষ? এর সুষ্ঠু বিচার করবে কে? তবু এক্ষেতে সরকারের কঠোর লকডাউনে অধিকাংশ শ্রমিক কর্ম হারিয়েছে। বকেয়া বেতন পাওনা রয়েছে। দু মুঠো খাবার জোটাতে পারছে না। তার ওপর যদি এভাবে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে নৃশংসভাবে গুলি চালোনো হয় তা নিতান্তই অতীব দুঃখের বিষয়। বস্তুত সংকোচ ছাড়াই বলা যেতে পারে বাঁশখালীর যে ঘটনা তা ১৮৮৬ সালের পহেলা মে শ্রমিকদের পুলিশ বাহিনী দ্বারা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘ম্যাককরনিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির’ শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিলেন। কীসের জন্য? ভালো বেতন, জীবিকা, আট ঘণ্টা কর্মদিবসের জন্য। কিন্তু কী হলো? অতঃপর পুলিশ গুলিবিদ্ধ করল শ্রমিকদের। তাদের হত্যা কলে। সেই থেকে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দিনটি স্মরণীয় রাখতে পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। কিন্তু সেই একই ধরনের করুণ অবস্থা আজ আমাদের বাঁশখালীতে দেখতে হলো। বস্তুত সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, আজ নানাভাবে বাংলাদেশের শ্রমিকরা অবহেলিত হচ্ছে। কার্যত দেশে একদিকে লকডাউন, অপরদিকে শ্রমিকদের ক্ষুধার কষ্ট, ছোট শিল্প কারখানা ও দোকানপাট বন্ধ, অপরদিকে তাদের বিক্ষোভ এবং পরিশেষে মালিকপক্ষ থেকে তিরস্কার বা লাঞ্ছিত। সর্বোপরি এক কোণঠাসা অবস্থায় বিরাজ করছে এসব শ্রমিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহান স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে চাকরিজীবীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনি চাকরি করেন আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়, আমি গাড়িতে চলি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলুন, ওরাই মালিক।’ কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো। সুতরাং সরকারের উচিত এই শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া পূরণ করা। তাদের নিরাপত্তা দেওয়া। কারণ একটি দেশ তখনই সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন সাধন করবে যখন সে দেশের সামগ্রিক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নতি হবে। কারণ তারাই দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। সবশেষে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আগামী পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের আগে বাঁশখালীর ঘটনাই কি শ্রমিকদের জন্য উপহার ছিল? পরন্তু আর কত শ্রমিকের দেহ থেকে তাজা রক্ত ঝরলে রাষ্ট্রের টনক নড়বে? বাঁশখালীতে শ্রমিকদের নিহতের যে ঘটনা ঘটেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। বিচার হোক অপরাধীদের। এটিই প্রত্যাশা। কেননা শ্রমিকদের গুলিবিদ্ধ করা মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। লেখক : আল আমিন ইসলাম নাসিম শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১