বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০২ June ২০২১

বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা


বদলে যাচ্ছে পারিবারিক কলহের ধরন। বাড়ছে হিংস্রতা ও নৃশংসতা। পাশাপাশি শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ছাড়াও একের পর এক খুনের ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞদের। পরিবারের সদস্যদের খুন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়াটে খুনী বা তৃতীয়পক্ষকে। এমনকি স্বামী বা স্ত্রী খুনের পর খণ্ড-বিখণ্ড করছে মৃতদেহ। এমন হিংস্র ও নৃশংস হত্যা শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, দরিদ্র সব শ্রেণিতেই দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরকীয়ার প্রেমের মাত্রা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ সামাজিক নানা অবক্ষয় এবং নারী বা পুরুষের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়াই এসব ঘটনা বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি স্বামী বা স্ত্রী কতৃক ভাড়াটে খুনী ব্যবহার করে খুনের কয়েকটি ঘটনা জনমনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনা পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

গত ২৫ মে রাজাধানীর দক্ষিণখান এলাকার একটি মসজিদের সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে আজহার নামে এক যুবকের খণ্ডিত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে জানতে পারে, আজহারের স্ত্রী আসমার পরিকল্পনাতে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুর রহমান খুন করেন আজহারকে। শুধু খুন নয়, তিনি আজহারের মরদেহ ৬ টুকরা করেন। আর এসব কিছুই তিনি করেন এক সন্তানের জননী আজহারের স্ত্রীর নির্দেশে। কারণ ৬৪ বছর বয়সী আব্দুর রহমানের সাথে আজহারের স্ত্রী আসমার ছিল পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক।

এদিকে গত সোমবার রাজধানীর মহাখালী থেকে আটক করা হয় ফাতেমা খাতুন নামে এক নারীকে। এর আগে রাজধানীর একাধিক স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় ময়না মিয়ার খণ্ডিত মরদেহ। আটক ফাতেমা ময়না মিয়ার প্রথম স্ত্রী। পুলিশের কাছে ফাতেমা স্বীকার করেন তিনি একাই তার স্বামীকে হত্যা করেন। স্বামীর একাধিক বিয়ে, টাকা পয়সার বণ্টন ও পারিবারিক কলহের কারণে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে পুলিশকে জানান ফাতেমা। তিনি আরো জানান, অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে তিনি যে টাকা পেতেন ময়না মিয়া সেই গচ্ছিত টাকা নিয়ে অনৈতিক কাজে ব্যয় করতেন। এসব কারণে স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর শ্বাসরোধে খুন করেন। পরে তার দেহকে কয়েক টুকরো করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আকতার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করেন পেশাদার ভাড়াট খুনীদের দিয়ে। ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের নিজাম রোডে মিতু তাদের একমাত্র সন্তানকে স্কুল বাসে তুলে দিতে গেলে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা খুনীরা নৃশংসভাকে হত্যা করে মিতুকে। ব্যাপক তদন্তে জানা যায়, স্বামী বাবুল আকতারই ভাড়াটে খুনীদের দিয়ে স্ত্রীকে খুন করেন। আর এর নেপথ্যে ছিল পরকীয়া প্রেম। বাবুলের পরকীয়াসহ নানান অপকর্ম একসময় জেনে যায় স্ত্রী মিতু। বাবুল তার দীর্ঘদিনে অর্জিত পেশাগত ও সামাজিক সুনামসহ পরকীয়া প্রেম অব্যাহত রাখতে খুন করেন স্ত্রীকে। গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর হাতিরঝিল আমবাগানের রাস্তায় সড়কে পড়ে থাকা একটি গাড়ি থেকে ঝিলিক নামে এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গড়িতে থাকা ওই নারীর স্বামী মিশু জানায়, অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তুু পরবর্তীতে জানা যায়, দুর্ঘটনাটি ছিল সাজানো। এর বেশ কয়েক ঘণ্টা আগেই স্বামী মিশু ও তার পরিবারের লোকজন শ্বাসরোধে নির্মমভাবে হত্যা করে ঝিলিককে। ধন্যাঢ্য পরিবারের সন্তান মিশু প্রেম করে ২০১৮ সালে বিয়ে করে ঝিলিককে। যা মেনে নিতে পারছিল না মিশুর পরিবার। তাদের ৮ মাস বয়সি একটি শিশু সন্তান আছে।

একশন এইড পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতার কারণে। জরিপে বলা হয়, নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক দায়ের করা মামলায় প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে দুই জনই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. মো: আবুল হোসেন বলেন, বিভিন্ন দিকে সামাজিক অবক্ষয়, নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা কারণে নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত চেষ্টা করতে হবে। এককভাবে এসব করা সম্ভব না। তার মতে এজন্য ৫টি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে-সরকারের সকল পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সহযোগিতা, জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে তথ্য ও সহযোগিতা প্রদান করা, সমাজের কথাগুলো তুলে ধরবেন এমন ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অর্ন্তভুক্তিকরণ এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা।

এদিকে করোনাকালে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থাও নারী-শিশু নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠািন সিপিডির তথ্যানুযায়ী, করোনার কারণে নতুন করে দারিদ্রসীমায় পৌঁছেছে প্রায় দেড় কোটি মানুষ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্যদের ওপর। গবেষণার প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক বছরে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও নারী-শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে বাল্যবিবাহও।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারী প্রতি সহিংসতা আগেও ছিল এখনো আছে। তবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, সহিংসতার ধরন বদলেছে। নারীর প্রতি হিংস্র আচরণ করা হচ্ছে পরিবারের ভেতরে। করোনাকালীন সময়ে এরকম ঘটনা আরো বেড়েছে। পরিবারে উপার্জনক্ষম পুরুষ সদস্যটি বেকার হয়ে পড়ায় তিনি স্ত্রীকে চাপ দিচ্ছেন তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসতে। আবার অর্থিক অনটনের কারণে সৃষ্ট হতাশারও বহিঃপ্রকাশ ঘটছে পরিবারের নারী-শিশু সদস্যদের সাথে আচরণে। স্ত্রী কতৃক স্বামীকে হত্যার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবার সুযোগ নেই। নারীরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। অতাচারের সীমা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। তবে অবশ্যই তা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেনে তিনি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১