আপডেট : ০৪ June ২০২১
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। করোনায় সৃষ্ট মহামারী সামলাতে আয়ের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে সরকার। বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এই মোট আয়ের মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি (অনুদানসহ) ২ লাখ ১১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ৬ দশমিক এক শতাংশ। এর মধ্যে কর খাত থেকে আসবে ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, কর ব্যতীত প্রাপ্তি হচ্ছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। তবে করের টাকা দুটি খাত থেকে আদায় করা হবে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআরবহির্ভূত কর ১৬ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া আগামী বছর বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। বেশি সম্পদে বেশি কর : আয়কর আদায় বাড়াতে নতুন বাজেটে ধনীদের ওপর নজর সরকারের। করোনাকালে সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে সমাজে যারা বিত্তবান, তাদের কাছ থেকেই বেশি কর আহরণের জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এজন্য ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সম্পদশালীদের ওপর সারচার্জ বাড়ানো হয়েছে। সেইসঙ্গে সারচার্জ আদায় প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন নিট সম্পদ মূল্য ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত সারচার্জমুক্ত এবং ন্যূনতম সারচার্জ বছরে ৩ হাজার টাকা। সাতটি স্তরে প্রযোজ্য হারে সারচার্জ আদায় করা হয়। নতুন বাজেটে নিট সম্পদমূল্য সীমা ৩ কোটি টাকাই বহাল রেখে ন্যূনতম সারচার্জ বাতিল করা হয়েছে। স্তর সাতটির পরিবর্তে করা হয়েছে পাঁচটি। সারচার্জ হচ্ছে এক ধরনের ‘অতিরিক্ত’ কর। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রে কারো নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদ থাকলে নিয়মিত কর দেওয়ার সঙ্গে বাড়তি সারচার্জও পরিশোধ করতে হয়। নিট সম্পদের ওপর ভিত্তি করে এটি ধার্য করা হয়। একে সম্পদজনিত করও বলা হয়। যেমন একজন করদাতার নিট সম্পদের মূল্য ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর বাইরে চাকরি থেকে বছরে আয় পাঁচ লাখ টাকা। এখানে চাকরি থেকে যে আয় আসছে, তার জন্য কর দিতে হবে। সঙ্গে সম্পদের জন্যও পৃথক সারচার্জ দিতে হবে। বর্তমান আইনে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ টাকা। ফলে নিয়ম মোতাবেক, অবশিষ্ট দুই লাখ টাকার বিপরীতে প্রযোজ্য অর্থাৎ ৫ শতাংশ হারে কর আসবে ১০ হাজার টাকা। পাশাপাশি ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার নিট সম্পদের জন্য ওই করদাতাকে উল্লিখিত আয়করের ১০ শতাংশ সারচার্জ বাবদ অতিরক্তি আরও ১ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। ফলে তাকে মোট কর দিতে হচ্ছে ১১ হাজার টাকা। এখানে ১০ হাজার টাকা নিয়মিত কর এবং ১০০০ টাকা অতিরিক্ত সরাচার্জ হিসেবে সরকার আদায় করবে। এভাবে যার যত বেশি আয় আছে এবং যত বেশি নিট সম্পদ আছে, তিনি তত বেশি কর দেবেন সরকারেক। কোনো ব্যক্তির আয় না থাকলে তাকে সারচার্জ দিতে হবে না। আগে সারচার্জ আরোপের পর তা বাতিল করা হয়। পরে ২০১১ -১২ অর্থবছরে তা আবার প্রবর্তন করা হয় এবং তাতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। নিট সম্পদের সঙ্গে একাধিক গাড়ি বা সিটি করপোরেশন এলাকায় আট হাজার বর্গফুটের গৃহসম্পত্তি থাকলে তাকেও সারচার্জ দিতে হবে। করপোরেট কর কমছে : ব্যবসায়ীদের দাবিতে সাড়া দিয়ে এবারো করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের কোম্পানির কর হার ২ দশমিক ৫০% শতাংশ পয়েন্ট কমানোর প্রস্তাব করেছেন। গতকাল বাজেট প্রস্তাবে আগামী অর্থবছরে তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এবং তালিকাভুক্ত নয়-উভয় ধরনের কোম্পানির কর হার কমানোর কথা বলেছেন। চলতি অর্থবছরেও একই পরিমাণ করপোরেট কর কমানো হয়, তবে তা ছিল শুধু পুঁজিবাজরে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য। অর্থমন্ত্রীর নতুন প্রস্তাবের ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির জন্য কর হার সাড়ে ৩২% থেকে কমে ৩০% হবে। অন্যদিকে পুঁজিবাজরে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২৫% থেকে কমে সাড়ে ২২% হবে। বর্তমানে কোম্পানির কর কাঠামোতে আটটি স্তর রয়েছে। ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক, মোবাইল ফোন কোম্পানি, সিগারেট কোম্পানিসহ বাকি ছয় স্তরের করপোরেট করে কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে এক ব্যক্তির করপোরেট কর হার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন মুস্তফা কামাল। অন্যদিকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানির (এমএফএস) কর হার তালিকাভুক্ত বা তালিকাভুক্ত নয় উভয়ের ক্ষেত্রে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে সাড়ে ৩২ থেকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত না হলে সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যক্তি-সংঘের কর হার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। ছয় স্তরের করকাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে অর্থাৎ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নতুন ব্যাংক (৩৭.৫%), তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক (৪০%), মার্চেন্ট ব্যাংক (৩৭.৫০%), সিগারেট, জর্দা ও গুলসহ তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারী কোম্পানি (৪৫%), তালিকাভুক্ত মোবাইল ফোন কোম্পানি (৪০%) ও তালিকাবহির্ভূত মোবাইল ফোন কোম্পানির (৪৫%) কর একই থাকছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে করপোরেট কর থেকে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসে। দেশে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার টিআইএন বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরধারী কোম্পানি রয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগের মতোই : করোনায় সৃষ্ট মহামারীতে দেওয়া দ্বিতীয় বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা আগের মতোই থাকছে। অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকার কম, তাদের কোনো কর দিতে হবে না। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের যে বাজেট উপস্থাপন করেন, তাতে এই প্রস্তাব রয়েছে। করোনা মহামারী শুরুর পর প্রথম বাজেটে (২০২০-২১) করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছিল। তারপর চার বছর করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকাই ছিল। সাধারণত চার-পাঁচ বছর পরপর জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এই সীমা বাড়ানো হয়। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজটে নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এবারো সেটাই রেখেছেন তিনি। বিদায়ী বাজেট অনুযায়ী, ৩ লাখ টাকায় আয়কর দিতে হয় না। পরবর্তী ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ে কর দিতে হয় ৫ শতাংশ হারে, তার পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ে কর দিতে হয় ১০ শতাংশ হারে, পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর দিতে হয় ১৫ শতাংশ হারে, তার পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে কর দিতে হয় ২০ শতাংশ হারে। এর চেয়ে বেশি আয়ের জন্য ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হচ্ছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১