বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৮ June ২০২১

অবৈধ বিদ্যুৎ-গ্যাসে অগ্নিকাণ্ড


তিন ঘণ্টার আগুনে পুড়েছে রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তির কয়েকশ ঘর। গতকাল সোমবার ভোরে এ আগুনের সূত্রপাত। আগুনের লেলিহান শিখায় নিম্ন-আয়ের হাজারখানেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮ ইউনিট কাজ করে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে সকাল ৭টার দিকে। গত ৭ মাসের ব্যবধানে এ বস্তিতে এটি দ্বিতীয় আগুনের ঘটনা। গত বছরের ২৩ নভেম্বর ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় ৩ শতাধিক ঘর। এর আগে ২০১২ সালে এই বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর ২০১৫, ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২০ সালেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস তদন্তে করে প্রতিবারই আগুনের কারণ হিসেবে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগকে দায়ী করেছে।

এবারো অবৈধ গ্যাস বা বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন। সকাল ৭টায় ঘটনাস্থলে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন জানান, ‘আমরা অগ্নিকাণ্ডের খবর পাই ভোর ৩টা ৫৯ মিনিটে। আমাদের প্রথম ইউনিট ৪টা ১২ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং তখন থেকে আমরা কাজ করছি। পরে ভোর ৬টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।’ সাততলা বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ সবাই শ্রমজীবী। রিকশাচালক, শ্রমিক, দিনমজুর, পোশাকশ্রমিকসহ অসংখ্য নিম্ন-আয়ের মানুষ বসবাস করেন। আগুনের ঘটনার সময় সবাই ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ চিৎকার ও পোড়াগন্ধে ঘুম ভাঙে সবার। এদের একজন পোশাকশ্রমিক আকলিমা। তিনি তার খালার সঙ্গে বস্তিতে থাকেন। আকলিমা বলেন, ‘হঠাৎ আগুন। এত তাপ আগুনের, দুইশ গজ দূরেও দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। কোনোরকমে জান নিয়ে বের হয়ে এসেছি।  ঘরের সব দামি জিনিস পুড়েছে। কিছু নিয়ে বের হতে পারিনি। আগুনের কারণে কিছু নিতে যে আর যাব তাও সাহস করিনি। চোখের সামনে দেখেছি, সব পুড়েছে। মনে হলো কোনো কিছু দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কেউ।’

ফায়ার সার্ভিস প্রথমে বেশি পানির গাড়ি নিয়ে এলে এত ঘর পুড়ত না বলেও অভিযোগ করেছেন বস্তিবাসীর কেউ কেউ। শাহ আলম নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার ৯ বছরের সংসারের জিনিসপত্র সব পুড়েছে। কিছু বের করতে পারিনি। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রথমে কম ছিল। পরে বেড়েছে। আগেই যদি বেশি পানির গাড়ি নিয়ে আসত, তাহলে এত ঘর পুড়ত না।’ তবে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বস্তিবাসীর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন,  ‘বস্তিতে টিনের ঘর, সেপারেশন বেশি হওয়াতে আমাদের আগুন নেভাতে সমস্যা হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের ১৮টি ইউনিট কাজ করেছে। আগুনে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এখন পর্যন্ত যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বলা চলে একশর ওপরে ঘর পুড়ে গেছে।’

এদিকে অনেকে ঘর থেকে কিছু জিনিসপত্র বের করতে পারলেও তারা ভোর থেকে সড়কে বসে আছেন। কোনো ত্রাণ বা সহায়তা কেউ পাননি। বিপুল নামে এক তরুণ জানান, তিনি বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে বের হয়েছেন। ঘরে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিল, তা বের করতে পারেননি। তাদের ঘরের কাছেই আগুনের সূত্রপাত হয়।

আগুন কীভাবে লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ঘুমে ছিলাম, হঠাৎ দেখি আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। কোনোরকমে জান নিয়ে, বাবা-মাকে নিয়ে বের হয়েছি। মনে হলো আগুনে কোনো কিছু ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই জ্বলছে।’ তিনিও বুঝছেন না, কীভাবে আগুন হঠাৎ বেড়ে গেল। তার সন্দেহ বস্তি উচ্ছেদের জন্য কেউ আগুন দিয়েছে কি না।

আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস কী মনে করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে প্রচুর অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এই দুইটার যে-কোনো একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।’

তদন্ত কমিটি : মহাখালীর সাততলা বস্তির আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নুর হাসানকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর আগুন লাগার সঠিক কারণ বেরিয়ে আসবে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের ডিজি।

মেয়রের ঘটনাস্থল পরিদর্শন : আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও ঘর তৈরির টিন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। গতকাল সোমবার দুপুরে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাততলা বস্তি পরিদর্শনে এসে তিনি এ কথা বলেন।

মেয়র আতিকুল বলেন, বস্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে নগদ ৫ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা এবং ঘর তৈরির জন্য টিন দেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পরিবারকে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেইসঙ্গে শুকনা খাবার দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও অন্যদের সঙ্গে কথা হয়। আগুন নেভানোর পর আমাদের করণীয় কী? এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তা সম্ভব নয়। কীভাবে আমাদের এখন ধাপে ধাপে কাজগুলো করতে হবে সেটিই এখন আমাদের দায়িত্ব। উত্তরা একটি খালের কাজ চলছিল এবং অনেক জটলা ছিল এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাততলা বস্তিতে আসতে দেরি হয়েছে। তবে সার্বক্ষণিক দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে।

তিনি বলেন, বস্তিবাসীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আপাতত ঘরের জন্য টিন দিতে হবে এবং এই মুহূর্তে খাবার লাগবে। ইতোমধ্যে কাউন্সিলর খাবার রান্নার কাজ শুরু করেছেন। প্রতিটি পরিবারের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আজ দুপুর থেকে খাবার চালু হবে এবং রাতেও বস্তিবাসীদের খাওয়ানো হবে। যতক্ষণ ত্রাণ না এসে পৌঁছাবে ততক্ষণ খাবার বিতরণ করব। এছাড়া শুকনা খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হবে। বস্তিবাসীর একটি মানুষও অভুক্ত থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন মেয়র আতিকুল ইসলাম।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, কড়াইল বস্তিতে বহুতলা ভবন নির্মাণ করে সেখানকার বস্তিবাসীদের থাকার উপযোগী করা হবে। ক্রমান্বয়ে রাজধানীর সব বস্তিতে এইভাবে ভবন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া আগুনসহ অন্যান্য দুর্যোগ থেকে বস্তিবাসীদের স্থায়ীভাবে বাঁচানো যাবে না। বস্তির বাসিন্দারা এখনো ভাড়া দিয়ে থাকে, তারা যদি একই টাকায় একটি বহুতলা বাসার ফ্ল্যাটে থাকতে পারে তাহলে তাদের জীবনমান আরো উন্নত হবে। বস্তিবাসী আমাদের এই শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনিও নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী বুধবার আমি আইসিটি মন্ত্রণালয়সহ তিনটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসব। ভবনগুলো কেমন হবে, পরিবেশ কেমন হবে, এসব নিয়ে কথা বলব। আশা করছি শিগগিরই একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১