বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১০ June ২০২১

ঢাকার আতঙ্ক ‘টানাপার্টি’

সদস্য সংখ্যা দুইশ’র বেশি


করোনাকালে গত এক বছরে রাজধানীতে চুরি-ছিনতাই কমলেও সম্প্রতি নতুন আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে ‘টানাপার্টি’। তাদের হাত থেকে বাঁচতে সবসময় সতর্ক হয়ে চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। একটু অসতর্ক হলেই গণপরিবহন, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল থেকে মুহূর্তের মধ্যে হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় মোবাইল ফোন সেট। শুধু তাই নয়, রিকশার নারীযাত্রীদের কাছ থেকেও হরহামেশা ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ দু-একজনকে আটক করলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবারো একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা।

সম্প্রতি নিরাপত্তায় ঘেরা গাড়িতে বসে কথা বলার সময় খোদ পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের হাত থেকেও মোবাইল ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায় টানাপার্টির সদস্যরা। এ ঘটনা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কিন্তু এখনো ফোন সেটটি উদ্ধার বা ওই ছিনতাইকারীকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, টানাপার্টির উৎপাত বেশি শাহবাগ থেকে ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, বিজয় সরণি ও পান্থপথে। আর যেসব রাস্তায় যানজট বেশি, সেসব রাস্তায় গাড়িতে থাকা যাত্রীদের মোবাইল ফোনের দিকেই টার্গেট থাকে এ দলের ছিনতাইকারীদের। গাড়িতে থাকা কোনো নারী বা পুরুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তেই ফোন, ভ্যানিটি ব্যাগ বা কানের দুল টান দিয়ে জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির ফাঁকফোকর গলে পালিয়ে যায় তারা। জানা যায়, রাজধানী কারওয়ানবাজার ও আশপাশের এলাকায় টানাপার্টির সদস্যরা বেশি সক্রিয়। এদের সবাই মাদকাসক্ত। বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে তাদের উৎপাত। তবে করোনা মহামারী শুরু হওয়ায় গত এক বছর তাদের বেশ খানিকটা কমেছিল। সম্প্রতি মন্ত্রীর গাড়ি থেকে ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনার পর আবারো আলোচনায় আসে ‘টানাপার্টি’খ্যাত চক্রটির। পুলিশ আগে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী ও টানাপার্টির সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে তারা আবারো একই কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের তেজগাঁও জোনের এক কর্মকর্তা বলেন, কারওয়ানবাজার এলাকার গাড়িচোর চক্রের সদস্য আল হাদিস ওরফে মামুন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে ছিল। কিন্তু মুক্তি পেয়ে গাড়ি চুরি ছেড়ে দিয়ে ছিনতাই আর টানাপার্টির কাজ শুরু করে। প্রতিদিন ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে টানাপার্টির সদস্যরা নারীদের ব্যাগ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী বাসে ওঠার মুহূর্তে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় সিএনজি অটোরিকশায় থাকা যাত্রীদের মুঠোফোন ছিনিয়ে নিচ্ছে অভিনব কায়দায়। অটোরিকশার ছাদের প্লাস্টিকের ছাদ কেটে মুহূর্তেই ছোঁ মেরে মোবাইল ফোন নিয়ে যায় তারা। ছিনতাই এড়াতে রাজধানীর অধিকাংশ সিএনজি অটোরিকশার ছাদেই এখন লোহার গ্রিল দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে টানাপার্টির সদস্যের সংখ্যা দুই শতাধিক। এ তালিকায় রয়েছে-যাত্রাবাড়ীর এনায়েত, মান্নান, সবুজ, খালেক, সুমন, আল আমীন, কট বাবু, ফর্সা মনির; দনিয়ার স্বপন, আবুল, ছোট আক্তার; সিদ্ধিরগঞ্জের রহিম, নাসির, আব্বাস, আক্তার; জুরাইনের কালাম, আলম, আসাদ, সাগর, মাইনুসহ ধলপুর সিটিপল্লীর কাসেম, জসীম ওরফে নুরা পাগলা; জালকুঁড়ি এলাকার লতিফ; সানারপাড়ের কালা সিরাজ, মকবুল, মনির, জহির, বাদশা, সোহরাব; কেরানীগঞ্জের হোসেন, সেলিম, আনোয়ার; হাসনাবাদের কালা শাজাহান; যাত্রাবাড়ী রায়েরবাগের হাসমত, শামীম, সিদ্দিক; শনির আখড়ার করিম, কবির, মাসুম; কাজলার বেলাল, নাসির, আমজাদ, কাশেম; রামপুরার এমদাদ; শ্যামপুরের ইব্রাহীম, ইউসুফ; মাতুয়াইলের মান্নান খালাসী; মীর হাজিরবাগের স্বপন, সবুজ, সুমন, ইমরান, নাসির, শাহীন, রাসেল; কালিয়াকৈরের আক্কাছ মোল্লা গ্রুপ; দোলাইপাড়ের দুলাল, রহিম, লিটন, টেম্পু শাহীন; সায়েদাবাদের কিরণসহ প্রায় দুইশ ব্যক্তির নাম। 

তবে বিভিন্ন সময় টানাপার্টির থাবায় ব্যাগ, মোবাইল ফোন সেট ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটলেও এসব বিষয়ে পুলিশের কাছে খুব একটা অভিযোগ করেন না ভুক্তোভোগীরা। টানাপার্টির খপ্পরে পড়ে ফোন হারানো সোহেল মোল্লা নামে বরিশালের এক রাজনৈতিক কর্মী তার ব্লগে নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমিসহ দুজন সিনিয়র নেতার সাথে রাতে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউয়ের সংসদ সদস্য ভবন (ন্যামভবন)  থেকে প্রাইভেট কারে হোটেলে ফিরছিলাম। কারওয়ানবাজার গাড়িটি আসার পর জানালা দিয়ে ‘টানাপার্টি’ (ছিনতাইচক্র) চিলের মতো ছোঁ মেরে আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। মোবাইলে আমি মনোযোগ দিয়ে নিউজ করছিলাম।’ তিনি আরো লেখেন, ‘ঢাকায় ভ্রমণের সময় অনেক সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গাড়িতে কখনো গ্লাস খোলা রাখা উচিত না। গ্লাস খোলা রাখা মোটেই নিরাপদ না।’

গত ৩০ মে রোববার রাতে বিজয় সরণি মোড়ে গাড়িতে বসে কথা বলার সময় কেউ একজন টান দিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর আইফোন এক্স মডেলের ফোনটি নিয়ে যান। এ ঘটনায় মন্ত্রীর পিএস কাফরুল থানায় একটি মামলা করেন। ঘটনাটি নিয়ে কাফরুল থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগও (সিআইডি) কাজ করছে বলে জানা যায়। দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করার দাবি করলেও এখনো ফোনটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

ঘটনার পাঁচ দিন পর গত শুক্রবার পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেন, তারা এ ঘটনায় দায়ীকে চিহ্নিত করেছেন। সেই ব্যক্তি ঘটনাস্থল বিজয় সরণির মুখে স্থাপিত উড়োজাহাজের ভাস্কর্যের নিচে ঘুমাতেন। ঘটনার দিন থেকে তিনি সেখানে নেই। তার নাম, ঠিকানা সবই পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে ওই ব্যাক্তির পরিচয় জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আ স ম মাহতাব উদ্দিন।

অন্যদিকে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেলিমুজ্জামান জানিয়েছেন, ছিনতাইয়ের পর থেকে মন্ত্রীর ফোনটি বন্ধ। তাই ছিনতাইকারীর অবস্থান শনাক্ত করা কিছুটা কঠিন হয়ে গেছে। তবে বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে নিয়ে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১