আপডেট : ১১ June ২০২১
৫ মে ২০২১, আনুমানিক সকাল ছয়টা। প্রতিদিনের মতো রাজধানীর মানিকনগর থেকে সবুজবাগের বৌদ্ধমন্দিরে রিকশা নিয়ে যাচ্ছিলেন মন্দিরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুনিতা রানী দাস। কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে দিয়ে অতিক্রমের সময় সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকার রিকশার বাম পাশ দিয়ে সুনিতা রানী দাসের কাছে থাকা খয়েরি রঙের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এ সময় রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন সুনিতা রানী দাস। ছিনতাইকারীরা প্রাইভেটকারটি দ্রুতগতিতে চালিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুনিতা রানী দাসের মৃত্যু হয়। সুনিতা দাসের মতো প্রাণ না গেলেও প্রতিদিন ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। হঠাৎ রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইকারীরা। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। আর ভোরকে টার্গেট করে একটি চক্র বিভিন্ন ফ্লাইওভার, টার্মিনালে অবস্থান নিয়ে ঢাকায় আসা লোকজনকে আহত করে তাদের টাকাপয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনতাই করছে। অনেক সময় তাদের হত্যাও করতে দ্বিধাবোধ করছে না। শুধু গামছাপার্টির দৌরাত্ম্যে গত দেড় বছরে ১৬ জন লোককে প্রাণ দিতে হয়েছে। সম্প্রতি ছিনতাইয়ের বেশ কিছু স্পট নির্ধারণ করে সিসি ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। জানা যায়, গত এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি নিহত সেই সুনিতা রানী দাসের (৫০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে সুনিতাকে হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারীদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি গোয়েন্দা পুলিশ। ঘটনার পরপরই গত ৫ মে মতিঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন সুনিতা রানী দাসের স্বামী সুজন দাস। দায়েরকৃত মামলাটি তদন্ত করছে মতিঝিল গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ভোরের দিকে হলেও মতিঝিলের এই রাস্তাটিতে গাড়ির চাপ বেশি থাকে, তাই গাড়িটি শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগছে। ঘটনার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংগ্রহ করেছে। এরই মধ্যে এই ঘটনায় সন্দেহভাজন পেশাদার দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উজ্জ্বল খান (৩৭) ও মোহাম্মদ সোহরাব ওরফে সোরাব মিয়া (২৮) নামে দুজনকে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করে মতিঝিল গোয়েন্দা পুলিশ। সুনিতা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দুই ছিনতাইকারীকে রিমান্ডেও নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে এখনও তাদের সংশ্লিষ্টতা পায়নি গোয়েন্দা পুলিশ। জানা গেছে, প্রাইভেটকারটিতে দুজন ব্যক্তি ছিল। অপরাধীরা এখনো আইনের আওতায় না আসায় কিছুটা হতাশ নিহত সুনিতা রানী দাসের ছোট ছেলে রাজু দাস। তিনি বলেন, এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। থানা পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা পুলিশ এখনো ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে আমরা অপেক্ষায় রয়েছি, তারা দ্রুত গ্রেপ্তার হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। মতিঝিল গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আতিকুল ইসলাম বলেন, মতিঝিলের ছিনতাইয়ের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পেশাদার দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে, মতিঝিলে ছিনতাইয়ের ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছে। মতিঝিল গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ায় আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ছিনতাইয়ের সময় গাড়িটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গাড়িটি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করার জন্য গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে রাজধানীতে ভোর ও সন্ধ্যার দিকে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো ঘটছে। আমরা গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করেছি। ঘটনার পরপরই মতিঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে নিহতের স্বামী সুজন দাস। পরে অধিকতর তদন্তের জন্য গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর করা হয় মামলাটি। ঘটনা তদন্তে নেমে গোয়েন্দা পুলিশ ভুক্তভোগী সুনিতা রানী দাসের ছিনতাই হওয়া ভ্যানিটি ব্যাগটি রাজধানীর ৩০০ ফুট এলাকার রেললাইনের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় এক মাদকসেবীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করে মতিঝিল গোয়েন্দা পুলিশ। এদিকে রাজধানীর সড়কে সড়কে যেন যমদূত হয়ে ঘুরছে গামছাপার্টি। গত দেড় বছরে এই ভয়ঙ্কর গামছাপার্টি কেড়ে নিয়েছে অন্তত ১৬ জনের প্রাণ। বিভিন্ন সময়ে গামছা পার্টির ৬ সদস্য পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গ্রেপ্তার কিংবা ক্রসফায়ারেও থামছে না তাদের দস্যুতা। এই অপরাধচক্র প্রায় প্রতিরাতেই বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সিএনজি অটোরিকশাচালক ও যাত্রী সেজে রাতে মানুষকে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নিয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে নির্জন স্থানে ফেলে দেয় উক্ত চক্রের সদস্যরা। এছাড়া রয়েছে মাইক্রোবাস কিংবা গাড়ি ছিনতাই পার্টি, যারা রাতের আঁধারে গাড়ি ছিনতাই করে চালককে ফেলে দেয় সড়কে। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে প্রকাশ্যে ছিনতাই না হলেও ‘টানাপার্টি’র অত্যাচার বেড়েছে। প্রতিদিন বাসের জন্য অপেক্ষমাণ অফিসফেরত মানুষকে টার্গেট করে ব্যাগ কেটে নেওয়া হচ্ছে। আবার কখনো বাসে ওঠার সময় আলগোছে পকেট থেকে নেওয়া হচ্ছে ফোন বা মানিব্যাগ। কারওয়ানবাজার থেকে ফার্মগেট মোড়ে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বেশ কটি ‘টানাগ্রুপ’ সক্রিয়। এর আগে ফার্মগেটকেন্দ্রিক কয়েকজনের একটি গ্রুপ সক্রিয় ছিল, যারা বোরকা পরে এ কাজ করত। এছাড়া আগারগাঁও থেকে মিরপুর-১০ যাওয়ার পথটা ফের ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আইডিবি ভবন থেকে তালতলা ও শেওড়াপাড়ার রাস্তায় মেট্রোরেলের কাজ চলমান থাকায় অনেক স্থানে সড়কবাতি কম রয়েছে। ওইসব এলাকায় পুলিশের টহল অব্যাহত থাকলেও ছিনতাই থেমে নেই। তাছাড়া মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, গোপীবাগসহ ওই এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে মানুষ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (উত্তর)-এর যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, এই জুনের মধ্যেই পুরো ঢাকা শহরের প্রতিটি জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে কোনো অপরাধ ঘটার পর যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নিতে পারব। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ডিআইজি এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, এমন কয়েকটি চক্র রাজধানীর ও আশপাশ এলাকায় রয়েছে। গামছাপার্টিসহ সব ছিনতাইকারী-অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে সহযাত্রী হয়ে না উঠতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১