বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০১ July ২০২১

করোনা প্রতিরোধ পলিসিতে জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই


আসিফ হাসান রাজু

 

মহামারী করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার গৃহীত যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা প্রশংসার দাবিদার। তবুও কিছু ত্রুটি লক্ষণীয়। পলিসির ক্ষেত্রে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় জটিল ভাষা প্রয়োগের কারণে পলিসি ব্যর্থ হয়ে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতে আমরা কেউই সংক্রমণ ঝুঁকি বা আক্রান্ত ঝুঁকির বাইরে নয়। করোনা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় পলিসিতে যে বিষয়গুলো দেখা গেছে, তার মধ্যে অন্যতম লকডাউন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে জাতীয় কোভিড ব্যবস্থাপনা কমিটি, জেলা ও উপজেলা গঠিত কোভিড ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন। তবে এসব কমিটির দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। বর্তমানে সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাথে সাথে মৃত্যুও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সংক্রমণ বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম অঞ্চলেও বিস্তার লাভ করছে। দেশে করোনা সংক্রমণের যে ধরন দেখা যাচ্ছে আইইডিসিআর-এর গবেষণা মতে তা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের কমিউনিটি সংক্রমণ, যাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সময়ে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও সুসংগঠিত কার্যকরী পরিকল্পনাসহ জনসম্পৃক্ততা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যাপ্ত কর্মসূচির বিকল্প নেই।

আমরা দেখেছি চলতি বছরের গত মার্চ  মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই করোনা সংক্রমণ পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যেটিকে বিশেষজ্ঞরা দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বলে উল্লেখ করেছিলেন।  এপ্রিলে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এরপর মাঝে কিছুদিন কম থাকলেও ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় গত কয়েকদিন আবারো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে করোনা পরিস্থিতি। করোনা পরিস্থিতি রোধে সরকার ৫ এপ্রিল ২০২১ থেকে লকডাউন  ঘোষণা করে। যেটা ছিল অনেকটা প্রস্তুতি ছাড়াই গৃহীত পলিসি। আমরা দেখেছি সেখানে স্বাস্থ্যবিধি সংশ্লিষ্ট ১৮ দফা নির্দেশনা ঘোষণা করে সরকার। লকডাউন রাখা হলেও গার্মেন্ট ও শিল্পকারখানা খোলা রাখা হয়। এছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস জরুরি কাজের বিবেচনায় সীমিত লোকবল নিয়ে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। পক্ষান্তরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে অফিস খোলা রেখে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ রাখার ফলে অফিসগামী মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ষাট পার্সেন্ট ভাড়া বৃদ্ধির শর্তে ও স্বাস্থ্যবিধি  মেনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত সব ধরনের ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট, শপিংমল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। প্রশাসনকেও কঠোর অবস্থানে যেতে দেখা যায়নি। এমতাবস্থায় আবারো লকডাউন বৃদ্ধি করা হয়েছে। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় দেখা যায় সরকার করোনা মোকাবিলায় গৃহীত পলিসিতে শুরু থেকেই সমন্বহীনতার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে।

করোনা পরিস্থিতিতে সরকার যে প্রণোদনা, ত্রাণ, সহায়তা প্রদান করেছেন তার সঠিক বণ্টনও করা সম্ভব হয়নি। লকডাউন দিলেও সেটা কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। লকডাউন চলাকালে ত্রাণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা, প্রণোদনা বিতরণ, সামাজিক প্রতিরোধ, জনসমাগম রোধকল্পের মতো পলিসিতে জনসম্পৃততা নেই বললেই চলে। লকডাউন দিলেও কেন মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে? এর পেছনে অন্যতম কারণ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। করোনায় আয়-রোজগার কমে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। ফলে সরকারের উচিত মানুষের মনের ভাষা বোঝা। সাধারণ জনগণ যাদের জন্য গৃহীত পলিসি, সেই জনগণ কি চায়, সেই বিষয়টাকে সবার আগে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন মানুষের সংস্কৃতি স্টাডি করে সংস্কৃতিবান্ধব পলিসি গ্রহণ করা। কোভিড নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। আর এই সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গৃহীত পলিসি হতে হবে জনসম্পৃক্ত করে।

বর্তমান সময়ে দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করে। অনেকে করোনো সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানে না। ফলে তারা সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের তোয়াক্কা করছে না। এছাড়া করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বেশ কয়েকটি অপরিচিত শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। যে শব্দগুলো আমাদের সংস্কৃতিতে একেবারেই নতুন, যেমন হোম কোয়ারেন্টাইন, সংক্রামক ভাইরাস, নিউ নরমাল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব, আইসোলেশন ইত্যাদি। ফলে যে শব্দগুলোর সঙ্গে আমাদের সাধারণ মানুষের পরিচয় হলো তার অর্থ যদি জনগণ বুঝতে না পারে তাহলে সেটা মানবে কেমন করে? পলিসিতে যদি এই শব্দগুলো আমাদের সংস্কৃতির আদলেও ব্যাখ্যা করা হতো তাহলে হয়তো জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেত। যেমন সংক্রামক ভাইরাসের পাশাপাশি এটাকে ছোঁয়াচে বলা যেত, মাস্ক-এর পাশাপাশি একে মুখোশ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেত। সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। আর এ কাজগুলো করা যেতে পারে ধর্মীয় ব্যক্তি, সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যক্তি, শিক্ষক, শিক্ষিত তরুণ, বিশেষ করে যারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে তাদের মাধ্যমে।

এছাড়া সচেতনতার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেসরকারি এনজিও, গান, পোস্টারিংসহ ভলেন্টার নিয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি চিকিৎসা ও সুরক্ষাসামগ্রীসহ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোপরি, সব পেশার, সব ধরনের মানুষ যাতে সেবা পায় তা নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ভ্যাকসিন প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পরিশেষে বলব, উল্লিখিত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে যথাযথ পলিসি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন বাঞ্ছনীয়। নতুবা বর্তমান শুরু হওয়া শাটডাউনও জীবন ও দেশের অর্থনীতি রক্ষায় কোনো ফল বয়ে আনবে না।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১